মেঘের বাড়ি জাফলং

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২০ এএম

ঋতুবদলের সঙ্গে জাফলংও তার রূপ বদলায়। বর্ষায় গেলে এখানে দেখা যায় ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা অগণিত ঝরনা। সবুজের বুকে নেমে আসা ঝরনাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক। শরতে পাহাড়ে ভেসে বেড়ায় মেঘমালা। শীতে অন্য রূপে চারদিকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড় চূড়ায় গহিন অরণ্য।

সিলেট-জাফলং রোডে হরিপুরের কাছে যেতেই মনে হবে ‘পাহাড় ঘুমিয়ে ওই...। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়শ্রেণির কোলে জৈন্তা, লালাখাল আর জাফলং। খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়শ্রেণির কিছু অংশ পড়েছে বাংলাদেশের জৈন্তা-জাফলং রোডের যাওয়ার পথে ডানদিকে। সিলেট শহর থেকে জাফলং রোডে হরিপুর পার হলে দেখা যায় দূরের পাহাড়। মেঘ-পাহাড়ে লুকোচুরি। আর ফেনিল ঝরনার লাফালাফি। দরবস্ত পার হতেই সারিঘাটের কাছাকাছি এলে ক্রমেই কাছাকাছি হতে থাকে সবুজ সবুজ পাহাড়।

পিয়াইন নদীতে পাথর-স্বচ্ছ জল, জাফলং

ওপারে মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় আর এপারে জাফলং; মাঝে পিয়াইন নদী। জাফলংয়ের বুক চিরে বয়ে গেছে দুই নদী। ধলাই ও পিয়াইন। পাহাড়ের বুক চিরে ফেনিল ঝরনার লাফালাফি। পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি-পাথর ও উত্তোলনের দৃশ্য। নদীর তীরেই খাসিয়াপুঞ্জি। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। আর পাহাড় বেয়ে ভারতের জিপ চলাচল ও সীমান্তসংলগ্ন ছোট্ট বাজার। আর পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য।

প্রকৃতি যেন নিজ হাতেই সৌন্দর্য দিয়েছে জাফলংয়ের।

স্তরে স্তরে সাজানো পাথর

পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলে স্তূপে স্তূপে পাথর ছড়ানো। যেন পাথরের খনি। স্বচ্ছ জলে নিচের দিকে তাকালে এ দৃশ্য পুলকিত করবে। ডিঙি নৌকায় করে নারী-পুরুষ আর শিশুদের পাথর উত্তোলন আর পাথর ভাঙার দৃশ্য মনোরম। জাফলংয়ের চারপাশ পাথরে ভরপুর। তাই স্থানীয়রা জাফলংকে ‘পাথরের স্বর্গ’ বলে থাকেন। সবুজের বুকে নেমে আসা ধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও ভেসে বেড়ানো মেঘমালা বেশ উপভোগ করেন পর্যটকরা। আর সবুজ পাহাড়ের ওপরে ক্ষুব্ধ মেঘদের চোখ রাঙানি, যেন এখনই প্রকৃতিকে ভাসিয়ে নেবে। নদীতে জেগে ওঠা পাথুরে বালির চর, যেখানে স্তরে স্তরে রয়েছে নুড়ি-পাথর, চালনি দিয়ে সে পাথর তুলে সরু নৌকায় নারী-পুরুষের এগিয়ে যাওয়াও যে কাউকে মুগ্ধ করে।

পিয়াইনে নৌবিহার

খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে স্বচ্ছ জলের নদী পিয়াইন। খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে জন্ম নিয়ে এ নদী মিশেছে সুরমার সঙ্গে। পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে নৌবিহার কিন্তু মন্দ হবে না। স্বচ্ছ নীল জল আর পাথর বিছানার ওপর দিয়ে নৌবিহারের মজাই আলাদা। নৌকায় করে ঝরনা দেখা আর ভারত সীমান্তের খুব কাছাকাছি গিয়ে ঝুলন্ত ব্রিজ, ভারতীয় বাজার-স্থাপনা দেখা কিন্তু স্মরণীয় হয়েই থাকবে। রোমাঞ্চ লাগবে এই ভেবে যে জৈন্তা-খাসিয়া বা মেঘালয়ের পাদদেশে ঘুরছি, উপভোগ করছি যতদূর দৃষ্টি যায় ততদূর! ইঞ্জিন ছাড়া নৌকা ঘণ্টা পাওয়া যায়। এছাড়া এখানে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য বিশেষ কিছু ইঞ্জিন নৌকাও আছে।

সংগ্রামপুঞ্জি ঘুরতে হলে

সংগ্রামপুঞ্জি, চা বাগান, রাজার বাড়ি, পান-সুপারির বাগান বা ঝরনার রোমাঞ্চ উপভোগ করতে হলে নদীর ওপারে ছোট্ট বাজার পেরিয়েই অটো রিজার্ভ করে নিতে হবে। এখান থেকে শেয়ারে অটো, শ্যালোচালিত যানবাহন পাওয়া যায়।

সতর্কতা

জাফলং ঘিয়ে পাথর ব্যবসা জমজমাট। ক্রাশারের শব্দ বিরক্তিকর লাগতে পারে। আর নুড়ি-পাথরের ডাস্ট পরিবেশ দূষণ করছে। শাস-প্রশ^াসের কষ্ট হতে পারে। এসব এলাকায় তাই মাস্ক পরা উত্তম হবে। তবে সংগ্রামপুঞ্জি, চা বাগান, খাসিয়াপল্লীতে বা ঝরনা যাওয়ার পথে নির্মল বাতাস ও নিরিবিলি পরিবেশ মুগ্ধ করবে।

কীভাবে যেতে হবে

সিলেট শহর থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরে পাথরের স্বর্গ জাফলং অবস্থিত। প্রথমে সিলেটে আসতে হবে। বাস-ট্রেন বা বিমানপথে সিলেটে যাওয়া যায়। সড়ক, রেল ও আকাশপথে ঢাকা থেকে সরাসরি সিলেট যেতে পারেন। চট্টগ্রাম থেকেও সিলেটে যাওয়া যায়। ঢাকার ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস স্টেশন থেকে সিলেটের বাসগুলো ছাড়ে। সিলেট নগরী থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জাফলংয়ে বাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা বা লেগুনায় যাওয়া যায়। এ জন্য লোকাল বাসও রয়েছে। আর রিজার্ভ মাইক্রোবাস ভাড়া হয়।

কেনাকাটা

খাসিয়াদের উৎপাদিত পান-সুপারি ও কারুশিল্পের ও ভারতীয় অনেক জিনিসপত্র দরদাম করা সাপেক্ষে অনেক সস্তায় পাওয়া যায় এখানে।

থাকা ও খাওয়া

সিলেটজুড়ে ও জাফলংয়ে বিভিন্ন দাম-মানের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত