শারদ সাজের মায়া

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২২ এএম

ষষ্ঠীর হালকা রঙের স্নিগ্ধতা থেকে দশমীর লাল-সাদায় ফুটে ওঠে পূজার আমেজ। পূজার প্রতিটি দিনেই থাকুক পোশাক, প্রসাধন ও চুলের সাজে নতুনত্ব। ট্রেন্ড অনুসরণের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্য, আবহাওয়া আর নিজের ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দিয়েই সাজিয়ে তুলুন উৎসবের দিনগুলো। পূজার সাজের আদ্যোপান্ত জানালেন বিউটি ব্লগার মাধুরী সঞ্চিতা। লিখলেন মোহসীনা লাইজু

শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই কেবল মন্ডপে মন্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখা নয়, বরং নিজের মতো করে উৎসবকে উদ্যাপন করা। নতুন পোশাকের ভাঁজ খোলা, পছন্দের গয়না বেছে নেওয়া, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে আইলাইনার পরা কিংবা চুলে ফুল গুঁজে নেওয়া সব মিলিয়ে পূজার প্রস্তুতিতেও থাকে আলাদা আনন্দ। আর সেই আনন্দের বড় অংশজুড়ে থাকে সাজপোশাক।

তবে পূজার সাজ মানেই প্রতিদিন ভারী মেকআপ, জমকালো পোশাক কিংবা একরকমের ফ্যাশন নয়। বরং এবারের সাজে গুরুত্ব পাচ্ছে নিজের পছন্দকে ফুটিয়ে তোলা, ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন এবং দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার উপযোগী সাজ। শাড়ির সঙ্গে স্নিকার্স, ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সঙ্গে আধুনিক গয়না কিংবা সাধারণ পোশাকে চোখে পড়ার মতো একটি অনুষঙ্গ সবই হতে পারে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। তার আগে জানা দরকার পূজার কোন দিনে কেমন সাজ মানাবেন? দিনের আলোয় কীভাবে মেকআপ করবেন, রাতের সাজে কী আনবেন নতুনত্ব? আর মন্ডপে ঘোরার সময় ব্যাগে কী কী রাখা জরুরি।

সাজে এবার স্বাচ্ছন্দ্যই প্রধান্য

পূজার ফ্যাশনে রঙের বৈচিত্র্য চিরকালই গুরুত্বপূর্ণ। লাল-সাদা, মেরুন, হলুদ, কমলা, সবুজ কিংবা নীল উৎসবের চেনা রঙের পাশাপাশি প্যাস্টেল গোলাপি, মিন্ট সবুজ, ল্যাভেন্ডার ও অফ-হোয়াইটের মতো কোমল রঙেও তৈরি করতে পারে স্নিগ্ধ সাজ। তবে রঙ বেছে নেওয়ার সময় নিজের গায়ের রং, পোশাকের নকশা এবং কোথায় যাচ্ছেন, বিবেচনায় রাখা ভালো।

যারা শাড়ি পরবেন তাদের জন্য সুতি, লিনেন, হালকা সিল্ক কিংবা জামদানি হতে পারে আরামদায়ক ও রুচিশীল পছন্দ। অন্যদিকে সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, পালাজ্জো, লং টপস কিংবা কো-অর্ড সেটেও আসতে পারে উৎসবের ছোঁয়া। পোশাকের নকশায় সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি, হাতের কাজ, কনট্রাস্ট বর্ডার ও ঐতিহ্যবাহী মোটিফ সাজকে দিতে পারে স্বাতন্ত্র্য। গয়নাতেও থাকুক ভারসাম্য। পোশাক ভারী হলে গয়না হালকা রাখা যায়। আবার একরঙা সাধারণ পোশাকের সঙ্গে বড় কানের দুল, অক্সিডাইজড গয়না কিংবা আকর্ষণীয় নেকপিস সাজে আনতে পারে ভিন্নতা।  বেণী বা খোলা চুলে ফুলও পরতে পারেন।

ষষ্ঠীর দিনে হালকা সাজ

পূজার প্রথম দিনটিতে সাজে রাখা যেতে পারে স্নিগ্ধতা। নতুন পোশাকের আনুষ্ঠানিক সূচনা করতে বেছে নিন হালকা রঙের শাড়ি, কুর্তি কিংবা সালোয়ার-কামিজ। অফ-হোয়াইটের সঙ্গে লাল, হলুদের সঙ্গে সবুজ অথবা প্যাস্টেল রঙের পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না ভালো লাগবে।

মেকআপে ভারী ফাউন্ডেশনের বদলে হালকা বেস, সামান্য ব্লাশ, কাজল, মাশকারা ও ন্যুড বা গোলাপি লিপস্টিকেই তৈরি হতে পারে পরিপাটি সাজ। চুল খোলা রাখতে পারেন, আবার মেসি খোঁপা কিংবা সাধারণ পনিটেলও করা যায়। গরমে চুলের এই সাজে আরাম পাবেন।

সপ্তমীর সাজ হোক ট্রেন্ড মিলিয়ে

সপ্তমীর সাজে একটু বেশি রঙিন হওয়া ভালো। উজ্জ্বল রঙের শাড়ি, ব্লকপ্রিন্টের পোশাক, ফ্লোরাল মোটিফ কিংবা কনট্রাস্ট ব্লাউজ উৎসবের আমেজ বাড়াবে। শাড়ির সঙ্গে অক্সিডাইজড কানের দুল, চুড়ি বা ছোট্ট টিপে ফুটে উঠতে পারে বাঙালিয়ানা সাজ। যারা শাড়ি পরতে স্বচ্ছন্দ নন, তারা বেছে নিতে পারেন লং কুর্তির সঙ্গে পালাজ্জো, সালোয়ার-কামিজ কিংবা নকশাদার টপস স্কাট। মেকআপে চোখে সাজ একটু গাঢ় হলেই ভালো। তবে পোশাক ও চোখের সাজ দুটিই যদি বেশ জমকালো হয়, ঠোঁটের লিপস্টিক ন্যুড রাখলে ভারসাম্য থাকবে সাজে।

অষ্টমীতে থাকুক ট্র্যাডিশনাল লুক

অষ্টমী মানেই অনেকের কাছে শাড়ির দিন। লাল-সাদা, লাল-হলুদ কিংবা গাঢ় রঙের শাড়ির সঙ্গে মানানসই ব্লাউজ, টিপ ও চুড়ি চেনা এই সাজেও তৈরি হতে পারে নতুনত্ব। যারা সচরাচর শাড়ি পরেন না তারাও এই দিনে শাড়ি পরতে পারেন। তাঁত, জামদানি কিংবা সুতি শাড়ির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী গয়না বেছে নিলে সাজে আসবে আভিজাত্য।

মেকআপে চোখের সাজকে গুরুত্ব দিতে পারেন। কালো আইলাইনার, কাজল, মাশকারা ও লাল কিংবা গাঢ় গোলাপি লিপস্টিক উৎসবের সাজে মানানসই। চুল ব্লো-ড্রাই বা কার্ল করে ছেড়ে রাখতে পারেন। কপালে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে টিপ পরা যায়। তবে দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ মন্ডপে ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে অতিরিক্ত ভারী মেকআপ এড়িয়ে চলুন। মিনিম্যালস্টিক মেকআপই ভালো হবে। অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে হলে শাড়ি বা স্কার্টও পছন্দের তালিকায় রাখা যেতে পারে।

নবমীর সাজে একটু জমকালো

নবমীর সন্ধ্যা অনেকের কাছে পূজার সবচেয়ে জমকালো সময়গুলোর একটি। এদিন গাঢ় রঙের শাড়ি, এমব্রয়ডারি করা সালোয়ার-কামিজ কিংবা সিøভের ব্লাউজ বেছে নেওয়া যায়। পোশাকে সিকুইন বা ঝলমলে কাজ থাকলে গয়না তুলনামূলক কম রাখুন। রাতের সাজে চোখে স্মোকি আই, সূক্ষ্ম উইংড আইলাইনার কিংবা  ব্রোঞ্জ আইশ্যাডো ব্যবহার করতে পারেন। ঠোঁটে লাল, বেরি বা মেরুন রং আনতে পারে পরিপূর্ণতা। তবে সব উপকরণ একসঙ্গে ব্যবহার না করে একটি অংশকে সাজের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলুন। কখনো চোখ, কখনো ঠোঁট, আবার কখনো পোশাকের নকশা একটি বিষয়কে প্রাধান্য দিলেই সাজে পরিমিত আভিজাত্য আসবে। মোট কথা পূজার সাজ হবে জমজমাট।

দশমীতে লাল-সাদায় বিদায়ের আবেগ

দশমীর সাজে লাল-সাদা শাড়ির আবেদন আজও অমলিন। তবে চাইলে লাল পাড়ের সাদা শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজের বদলে বেছে নিতে পারেন কনট্রাস্ট রঙের ব্লাউজ। সঙ্গে লাল টিপ, শাঁখা-পলা কিংবা মানানসই কানের দুল সাজে আনবে ঐতিহ্যের আবহ। সিঁদুরখেলার পরিকল্পনা থাকলে এমন মেকআপ ব্যবহার করুন, যা সহজে নষ্ট হয়ে অস্বস্তি তৈরি করবে না। দীর্ঘস্থায়ী লিপস্টিক ও হালকা বেস কাজে আসতে পারে। চুল খোঁপা করে ফুল পরলে যেমন  টেডিশনাল লুক আসবে, তেমনি বেণী কিংবা খোলা চুলেও থাকতে পারে নিজস্বতা। ট্র্যাডিশনাল অলংকারের পাশাপাশি নাকে নথ, কোমরে বিছা বা  শাড়ির আঁচলে চাবির গোছা বেছে নিতে পারেন।

দিনের সাজ বনাম রাতের সাজ

দিনের বেলায় এখনো গরমের আমেজ থাকবে। ঘাম, ধুলাবালু এবং দীর্ঘক্ষণ হাঁটার বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। তাই ত্বক পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। প্রয়োজন হলে হালকা, ঘাম সহনীয় মেকআপ বেছে নিন। অতিরিক্ত পাউডার বা একাধিক প্রসাধনীর স্তর না দিয়ে ত্বককে স্বাভাবিক রাখুন। সঙ্গে রাখতে পারেন ব্লটিং পেপার বা টিস্যু।

রাতের সাজে আলো ও পোশাকের ধরন অনুযায়ী মেকআপে কিছুটা ভারী হবে। আইলাইনার, আইশ্যাডো, হাইলাইটার কিংবা গাঢ় লিপস্টিকের ব্যবহার হতে পারে পরিমিতভাবে। যদিও রাতের ঘোরাঘুরি তারপরও আরামকে অবহেলা করা যাবে না। অনেকক্ষণ হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকার পরিকল্পনা থাকলে উঁচু হিলের বদলে আরামদায়ক জুতা কিংবা স্যান্ডেল বেছে নিন। সঙ্গে গরম থেকে রক্ষা পেতে পোর্টেবল ফ্যান ও পানির বোতল রাখতে পারেন।

চুলের সাজে ছোট্ট পরিবর্তনেই নতুনত্ব

পূজার সাজে চুলের ভূমিকা কম নয়। শাড়ির সঙ্গে নিচু খোঁপা, বেণী কিংবা হালকা কার্লিং করা খোলা চুল মানানসই। কুর্তি বা ওয়েস্টার্ন ধাঁচের পোশাকের সঙ্গে পনিটেল, হাফ-আপ হেয়ারস্টাইল কিংবা সাধারণ খোঁপা ভালো লাগতে পারে। চুলে তাজা ফুল ব্যবহার করলে সাজে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।  জারবেরা কিংবা গোলাপ পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন। একটু আইকনিক চুলের সাজ চাইলে পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে অর্কিডও পরতে পারেন চুলে। বাইরে দীর্ঘক্ষণ থাকতে হলে এমন হেয়ারস্টাইল বেছে নিন, যা সহজে এলোমেলো হবে না। দীর্ঘসময় আপনাকে পরিপাটি দেখাবে।

মন্ডপে যাওয়ার  সময় ব্যাগে কী রাখবেন

পূজায় বের হওয়ার সময় সাজের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখাও জরুরি। ছোট্ট ব্যাগে গুছিয়ে নিতে পারেন - টিস্যু, রুমাল ও প্রয়োজন হলে ওয়েট টিস্যু। - সানস্ক্রিন এবং ঠোঁটের জন্য লিপবাম বা লিপস্টিক। - ছোট আয়না, চিরুনি ও কয়েকটি হেয়ারপিন।- পানির বোতল এবং প্রয়োজনে হালকা শুকনো খাবার।- ফোন, পাওয়ার ব্যাংক, পরিচয়পত্র।- ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকলে সেটাও নিতে পারেন।- বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে ছোট ছাতা বা হালকা রেইনকোট। ব্যাগ যত ছোট ও গোছানো হবে, ভিড়ের মধ্যে চলাফেরা তত সহজ হবে। মূল্যবান গয়না বা অতিরিক্ত নগদ টাকা বহন না করাই ভালো। ভিড়ের মধ্যে ব্যাগ ও ফোনের দিকে খেয়াল রাখুন।

জেনে রাখুন

পূজার সাজ ভালো রাখতে আগের রাতেই ত্বক পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন এবং পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করুন। নতুন প্রসাধনী সরাসরি মুখে ব্যবহার না করে আগে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বক হলে সুগন্ধিযুক্ত বা অপিরিচিত প্রসাধন পণ্য ব্যবহারে সতর্ক থাকুন।

 মেকআপের আগে ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত বেস ব্যবহার করুন। লিপস্টিক পরার আগে ঠোঁটের শুষ্কতা দূর করুন। তবে সাজ ঠিক রাখার জন্য বারবার মুখে হাত দেওয়া এড়িয়ে চলুন। বাইরে থেকে ফিরে অবশ্যই মেকআপ তুলে ত্বক পরিষ্কার করুন।

সবচেয়ে বড় কথা, পূজার সাজের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। শাড়ি পরলেই বাঙালিয়ানা, আর আধুনিক পোশাক পরলেই ফ্যাশন এমন ধারণায় আটকে থাকার প্রয়োজন নেই। কারও কাছে লাল পাড়ের শাড়িই উৎসবের পূর্ণতা, কারও কাছে প্রিয় কুর্তি কিংবা স্নিকার্সের সঙ্গে ফিউশন পোশাক। সাজের সৌন্দর্য আসলে নিজের পছন্দকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বহন করার মধ্যে।

উৎসবের প্রতিটি দিন তাই হয়ে উঠুক আলাদা গল্প। কখনো চোখে কাজলের রেখা, কখনো চুলে ফুল, কখনো সাধারণ পোশাকের সঙ্গে উজ্জ্বল গয়না। ছোট ছোট এই আয়োজনেই তৈরি হোক আপনার পূজার সাজের নিজস্বতা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত