ফরিদপুরে ইজিবাইক ছিনতাই, চার বছর পর গ্রেপ্তার আসামি

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

ফরিদপুরে চেতনানাশক ওষুধ প্রয়োগ করে ইজিবাইক চালককে অচেতন করে ইজিবাইক ছিনতাইয়ের ঘটনায় চালক বিশ্বনাথ সরকারের মৃত্যুর চার বছর পর মুরাদ শেখ (৩৭) নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ দুই বছর বিশ্বস্ত গুপ্তচরের মাধ্যমে নজরদারি চালিয়ে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ছাড়াই তার অবস্থান শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বাকি তিনজন এখনো পলাতক।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা ১২টার দিকে ফরিদপুর পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম।

গ্রেপ্তার মুরাদ শেখ ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের সিরাজ শেখের ছেলে। গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) ফরিদপুর শহরের জনতা ব্যাংকের মোড়সংলগ্ন ফলপট্টি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৬ জুলাই জীবিকার তাগিদে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ইব্রাহীমদি গ্রামের বাসিন্দা বিশ্বনাথ সরকার। ওই দিন রাত ৮টার দিকে পরিবারের সদস্যরা খবর পান, তিনি অচেতন অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে পড়ে আছেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় ১৮ জুলাই বিশ্বনাথের ছেলে শ্রী রবি কুমার কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। পরে ওই বছরের ১৯ অক্টোবর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই। দীর্ঘ তদন্তেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব না হওয়ায় মামলাটি ক্লুলেস হিসেবে তদন্ত চলতে থাকে।

তদন্তের একপর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট ছিনতাই হওয়া ইজিবাইকটির ক্রেতা কামাল মিয়াকে ফরিদপুর সদর উপজেলার বাখুন্ডা বাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইজিবাইকটি উদ্ধার করা হয়। পরে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদহ গ্রামের ফিরোজ আহমেদের ছেলে সুমন আহমেদকে (৩৬) গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুরাদসহ আরও চারজনের নাম উঠে আসে।

পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন পাঁচজন মিলে ইজিবাইক ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন। ওই দিন সন্ধ্যায় ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার পুরোনো বাস টার্মিনাল থেকে ২০০ টাকায় বিশ্বনাথের ইজিবাইক ভাড়া করেন তাঁরা। নগরকান্দার তালমা মোড়ে যাওয়ার কথা বলে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক ধরে এগোতে থাকেন। একপর্যায়ে নির্জন স্থানে পৌঁছালে আসামিরা রুমালে চেতনানাশক ওষুধ লাগিয়ে বিশ্বনাথের নাক-মুখ চেপে ধরেন। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে মহাসড়কের পাশে ফেলে রেখে ইজিবাইক নিয়ে পালিয়ে যান তাঁরা। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

পিবিআইয়ের তথ্যমতে, ছিনতাই করা ইজিবাইকটির মূল্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করেন মুরাদ। পরে চার সহযোগীর প্রত্যেককে ২৫ হাজার টাকা করে দিয়ে ইজিবাইকটি নিজের কাছে রেখে দেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ইজিবাইকটি কামাল মিয়ার কাছে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।

পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, কামাল ও সুমন গ্রেপ্তার হওয়ার পর সতর্ক হয়ে যান মুরাদ। প্রায় দুই বছর আগে তিনি নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। এমনকি শ্বশুরবাড়িতেও যেতেন না। গ্রেপ্তার এড়াতে মোবাইল ফোন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারও বন্ধ করে দেন তিনি। ফলে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কোনো মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন না হওয়া পর্যন্ত তদন্ত চালিয়ে যাই। মুরাদের পেছনে বিশ্বস্ত গুপ্তচর নিয়োগ করে দীর্ঘ দুই বছর ধরে কাজ করেছি। একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ছাড়াই লোকমুখে তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাই। তাকে কোনো কিছু বুঝতে না দিয়ে কৌশলে অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। এটি আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন।’

তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারের পর মুরাদকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া কামাল ও সুমন বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। এ ঘটনায় পলাতক অপর তিন আসামিকে গ্রেপ্তারে পিবিআইয়ের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক অখিল কুমার বিশ্বাসসহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত