বিসিএস নিয়োগ

স্বচ্ছতার জন্য সংস্কার সময়ের দাবি

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৮ এএম

অবশেষে ৪৫তম বিসিএস ব্যাচের নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। এতে ৪ বছর সময়  লেগে গেল! নিয়োগে এমন দীর্ঘসূত্রতার চর্চায় অনেকের সরকারি চাকরির বয়সসীমা ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তীব্র মানসিক অবসাদও তৈরি হয়।

প্রতি বছর দেশে কমপক্ষে ২০ লাখ তরুণ-তরুণী কাজের বাজারে (জব মার্কেট) ঢোকেন। যদিও স্বকর্মসংস্থানের ধারণার চর্চা সমাজে আজকাল ধীরে হলেও শুরু হয়েছে। তবে পরিচিত পরিসরে স্বকর্মসংস্থানের চর্চা নেই, এমন অনেকেই সরকারি অথবা বেসরকারি চাকরি খুঁজতে থাকে। বিপুল সংখ্যক চাকরি-প্রত্যাশীর তুলনায় পদের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও বিসিএস সরকারি খাতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় কর্মসংস্থানের একটি ব্যবস্থা। বেসরকারি চাকরির বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করতে থাকার পাশাপাশি সরকারি চাকরির আশায় দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকায় তরুণদের উৎপাদনশীল বয়স নষ্ট হয়। আমরা মনে করি, উৎপাদনশীল সময় নষ্ট হওয়া শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। তাই এমন নিয়োগ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে খুব বেশি সময় নেওয়া সঠিক নয়।

২০২৪ সালে দেশে ক্ষমতায় পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ৪৫তম বিসিএস ব্যাচের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে চার বছরে তিনটি সরকারের সময়ে। দীর্ঘ এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষপাতসহ নানামুখী বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, সিভিল সার্ভিসের নিয়োগ রাজনৈতিক পক্ষপাতসহ সব ধরনের প্রভাব মুক্ত রেখে পুরোপুরি মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন।

কেন? তার আগে দেখা যাক, সিভিল সার্ভিসের কী কাজ? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সিভিল সার্ভিস রাষ্ট্রের কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ অরাজনৈতিক অংশ বলে বিবেচিত হয়, যার মূল কাজ হলো সরকারের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা, রাষ্ট্রের সব জনসেবা চালু রাখা ও আইন কার্যকর করা। রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, বাজেট বাস্তবায়ন ও বৈদেশিক সম্পর্ক চর্চায় সরকারের নির্দেশনা কার্যকর করা। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার নির্ধারিত সময়ের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সরকার-নির্বিশেষে রাষ্ট্রব্যবস্থা জারি রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বড় দায়িত্বের একটি অংশ পালন করার কথা সিভিল সার্ভিসের। এমন ভূমিকার কারণে ইতিপূর্বে জাপান ও নেপালে রাজনৈতিক সরকার বারবার বদল হলেও সেখানকার রাষ্ট্রব্যবস্থায় তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশেও সংশ্লিষ্ট সবার এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ সম্পূর্ণ পক্ষপাতমুক্ত রেখে উচ্চমানসম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করা দরকার।

দেরি হলেও ৪৫তম বিসিএস ব্যাচে নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া পিএসসিসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, প্রশ্নাতীত এবং মেধাভিত্তিতে সম্পন্ন করে থাকে, তাহলে আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই। আমরা মনে করি, ভবিষ্যতে সব সরকারি নিয়োগে পরীক্ষাসহ পুরো ব্যবস্থা মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ রেখে যুক্তিসংগতভাবে কম সময় নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নিয়োগ ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিও উঠছে। দীর্ঘসূত্রতার লাগাম টানতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ আছে। সংস্কারের ক্ষেত্রে  প্রয়োজনে অন্য দেশে কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয়, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। জাপানে সিভিল সার্ভিসে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে ‘কম্প্রিহেনসিভ সার্ভিস’, সাধারণ প্রশাসনিক কাজে ‘জেনারেল সার্ভিস’ এবং বিশেষায়িত কাজে ‘স্পেশালিস্ট সার্ভিসে’ মেধা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় নিজস্ব সাক্ষাৎকারের সমন্বয়ে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। শ্রীলঙ্কায় সাধারণত তিনটি ভিন্ন ধারায় নিয়োগ হয়। স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ প্রার্থীরা ‘ওপেন স্ট্রিমে’, অভিজ্ঞ সিনিয়র কর্মকর্তারা ‘মেরিট স্ট্রিমে’ এবং পদোন্নতি প্রত্যাশীরা ‘লিমিটেড স্ট্রিমে’ লিখিত পরীক্ষা ও কাঠামোবদ্ধ সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে  মেধাভিত্তিতে নিয়োগের সুযোগ পান।

বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের কাঠামো ও প্রক্রিয়া স্থানীয় উপযোগিতার দিকটি বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত করা দরকার। এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা ঠিক নয় বলে আমরা মনে করি। তবে পুরো প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত হয় এবং প্রতিটি নিয়োগ যেন মেধাভিত্তিতে হয়, এটাই সময়ের দাবি। আমাদের আশা, সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে সময়োচিত দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত