ইন্টারনেটের ব্যাপক প্রসারের এক-দেড় দশক আগেও, সংবাদপত্র ছিল মানুষের নির্ভরতার একটি জায়গা। অনেক পাঠকের কাছে প্রতিদিনের পত্রিকাটি ছিল, একজন বার্তাবাহকের মতো প্রতিদিন নিয়ে আসত নতুন ও অজানা-অচেনা সব খবর। সেই খবর কখনো মানুষকে আশাবাদী করত, কখনো রাষ্ট্র, সমাজ ও জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাত। দেশ-জাতির চিত্র, মানুষের সুখ-দুঃখ, শোষণ-বঞ্চনা কিংবা পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা সবকিছুরই একটি জানালা ছিল সংবাদপত্র। অস্বীকার করার উপায় নেই, সংবাদপত্র তথা সংবাদমাধ্যম আজও সেই কাজটিই করছে। তবে পদ্ধতির বদল এসেছে। একসময় একটি খবরের জন্য পুরো একটি দিন অপেক্ষা করতে হতো। এখন সেই অপেক্ষার সময় নেমে এসেছে কয়েক সেকেন্ডে। পৃথিবীর এক প্রান্তে কিছু ঘটলে, অন্য প্রান্তের মানুষ প্রায় একই মুহূর্তে তা জানতে পারে। সংবাদ এখন শুধু কাগজের পাতায় নয়; মোবাইল ফোনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, ভিডিওতে, লাইভে এবং নোটিফিকেশনে।
সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, বদলে দেয় আমাদের অভ্যাসও। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা গাজা, লেবানন ও ইরানের সংঘাতে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, ধ্বংস আর কান্নার ছবিও এখন প্রায় সরাসরি সবার চোখের সামনে চলে আসে। কিন্তু এই অবিরাম দৃশ্যমানতার মধ্যেই কখনো কখনো মানবতা যেন অসাড় হয়ে পড়ে। আমরা একটি খবর দেখি, কিছুক্ষণ পর অন্য একটি খবরে চলে যাই। আর এই তথ্য বন্যার সুযোগে ক্ষমতাবানরা নিজেদের বয়ান প্রতিষ্ঠা করে; ছড়িয়ে পড়ে বিভ্রান্তি, অপতথ্য ও প্রচারণা। রাষ্ট্র কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠী কখনো কখনো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে, রাজনীতি ও সমাজকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এখানেই সাংবাদিকতার দায়িত্ব বেড়ে যায়। খবর পৌঁছে দেওয়া আর সাংবাদিকতা এক কথা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যে কোনো মানুষ তথ্য বা কোনো ঘটনা প্রচার করতে পারেন, কিন্তু প্রত্যেকে সাংবাদিক নন। একটি ছবি সত্য কি না, একটি ভিডিও কোথাকার, একটি বক্তব্যের প্রেক্ষাপট কী, কিংবা কোনো দাবির পেছনে সত্যিই তথ্য আছে কি না এসব যাচাই করার জন্য প্রয়োজন পেশাদার সাংবাদিকতার চর্চা।
বিশে^র বড় সংবাদ সংস্থাগুলোও এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের বদলে নিচ্ছে। রয়টার্সের মতো প্রতিষ্ঠান দ্রুত সংবাদ দেওয়ার পাশাপাশি ছবি ও ভিডিও যাচাইয়ের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়া ব্যবহার করছে। কারণ প্রযুক্তি যেমন সত্যকে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, তেমনি মিথ্যাকেও আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু সংবাদমাধ্যম বহু বছর ধরে অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ ও জনস্বার্থের সাংবাদিকতার জায়গা তৈরি করেছে। যদিও এখনো অনেক সাংবাদিক বাংলাদেশে কারাগারে আছেন। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশি সাংবাদিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তাই শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, প্রবাসী সমাজও তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ব্রিটেনে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের ইতিহাস কম সমৃদ্ধ নয়। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জনমত’ এবং পরবর্তীকালে ‘সুরমা’র মতো বাংলা ভাষার সংবাদপত্র দীর্ঘদিন কমিউনিটির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছে। পত্রিকা ও বাংলা পোস্টের মতো প্রকাশনাও এক সময় বাংলাদেশি দোকানগুলোতে জায়গা করে নিয়ে কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বদলে যাওয়া পাঠক, প্রযুক্তি ও সংবাদ গ্রহণের অভ্যাসের কারণে সেই স্বর্ণালি সময় অনেকটা অতীত। বাস্তবতা কঠিন, ব্রিটেনের বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমকে লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশের ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পাঠকের দ্রুত বদলে যাওয়া রুচির সঙ্গে। সঙ্গে রয়েছে বিজ্ঞাপন সংকট, সীমিত জনবল, প্রশিক্ষণের অভাব, দুর্বল সম্পাদকীয় কাঠামো এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে স্বাধীন থাকার চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতার মধ্যে কাজ করছে, কয়েকটি বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল। তবে সংকটের মধ্যে সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন বড়, শিক্ষিত, বৈচিত্র্যময় ও সামাজিকভাবে সক্রিয়। স্থানীয় কাউন্সিল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অভিবাসন, ব্যবসা, সংস্কৃতি, তরুণ প্রজন্ম, নারীর অংশগ্রহণ, বর্ণবাদ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বসহ অসংখ্য বিষয় আছে, যা নিয়ে গভীর, তথ্যনির্ভর ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত চ্যানেল বাড়ছে, কিন্তু ভিউয়ের বাইরে সাংবাদিকতার উৎকর্ষ ও দায়বদ্ধতার জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গাতেই নর্থ ইংল্যান্ড বাংলাদেশি টিভি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নেবট্রা) পেশার বাইরে, ডিজিটাল মাধ্যমে অভ্যস্ত একদল সংবাদকর্মীর উদ্যোগ সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই জন্ম নিয়েছে। পরিসর সীমিত হতে পারে, কিন্তু সীমিত পরিসর মানেই সীমিত দায়িত্ব নয়। দীর্ঘ দশ বছর ধরে বাংলা ভাষায় ব্রিটেনের বাংলাদেশি অভিবাসীদের জীবন, সংগ্রাম, সাফল্য, স্বপ্ন ও সংকটের কথা দেশে-বিদেশে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছে নেবট্রা। দ্রুততার প্রতিযোগিতায় সত্যকে যেন বিসর্জন দিতে না হয়, সেই জায়গাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকতার শেষ কথা শুধু ‘কে আগে খবর দিল’ নয়; বরং ‘কে সত্যটা দায়িত্ব নিয়ে বলল’।
সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ গ্রহণের পদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু অঙ্গীকার বদলানোর সুযোগ নেই। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু প্রযুক্তির কাছে সাংবাদিকতার বিবেক বিসর্জন দিয়ে নয়। ভুল তথ্যের বিপরীতে তথ্য, বিভ্রান্তির বিপরীতে যাচাই এবং বিভাজনের বিপরীতে মানুষের গল্প তুলে ধরাই হবে সাংবাদিকতার পথ। দেশ-জাতির ক্রান্তিকালে, প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের ভেতরেও নেবট্রার সংবাদকর্মীরা মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কমিউনিটির কথাগুলো উচ্চারণ করবে এই হোক বদলে যাওয়া সময়ে নেবট্রার অঙ্গীকার।
লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী কলাম লেখক