নতুন সমীকরণে মিয়ানমার 

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১১ এএম

সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সংকটের বয়স প্রায় এক দশক। বিভিন্ন হিস্যা ও তথ্য অনুসারে,  ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আগে আসা জনগোষ্ঠীসহ বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ, আবার কারও কারও মতে, এর চেয়েও বেশি। কিন্তু তাদের প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি; বরং সংকটের রাজনৈতিক, সামরিক ও ভূকৌশলগত সমীকরণ আরও জটিল হয়েছে, হচ্ছে। একসময় প্রশ্ন ছিল, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে কি না। এখন প্রশ্ন আরও গভীর রোহিঙ্গারা ফিরলে রাখাইনে তাদের নিরাপত্তা দেবে কে? আর রাখাইনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কারা? মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মি (এএ) বাংলাদেশ সংলগ্ন রাখাইনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে, সিত্তেসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং আকাশসীমা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়েছে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান নতুন সমীকরণটি মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের তীব্র সংকট এবং ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সরকারি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সেখানে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে চলে এসেছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনায় এখন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পাশাপাশি এই অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী বা আরাকান আর্মিও একটি বড় পক্ষ বা সমীকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এই ১২ লাখের বেশি শরণার্থীর বোঝা একা আর বহন করতে পারে না। ২০২৬ সালের অক্টোবর, অর্থাৎ এই মাসে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আয়োজিত আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিট এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্বসম্প্রদায়কে কেবল মুখে আশ্বাসের বাণী না শুনিয়ে, মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসন পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আরাকান আর্মি মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বীকৃত কোনো বাহিনী নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকারও নয়। এটি একটি জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন। ফলে বাংলাদেশের সামনে যোগাযোগের কূটনৈতিক সীমারেখা নির্ধারণেও সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করলেই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হবে এমন প্রশ্নও রয়েছে। তবে যোগাযোগের ধরন ও উদ্দেশ্য অনুসারে, এটি মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পকের্র টানাপড়েন সৃষ্টি করতে পারে। বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকে সমর্থন কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার ধারণা তৈরি হলে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশেই বাড়বে। অতএব, প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক স্বীকৃতির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার আলোচনা চলমান

থাকলেও, রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করছে। রোহিঙ্গারা ফিরে নতুন বসতি স্থাপন করলে, একদিকে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় স্থলভাগে নির্যাতন বা হামলার ঝুঁকি থাকতে পারে; অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বা বিমান হামলারও আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাখাইনের আকাশসীমার ওপর আরাকান আর্মির শতভাগ নিয়ন্ত্রণ নেই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থই বলেছেন, ‘মিয়ানমারেই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে হবে’। তিনি আরও বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এত বড় একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব বহন করা, বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সহযোগিতা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। কেবল রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠালেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার পেছনে থাকা কারণগুলোও দূর করতে হবে।’ তার ভাষায়, ‘যে সংকটের জন্ম মিয়ানমারে, তার অবসানও মিয়ানমারেই হতে হবে’। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। 

সংগতভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, ফেরত যাওয়া মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? সংঘাতের মধ্যে তাদের বসতি আক্রান্ত হলে আশ্রয় দেবে কে? নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, জীবিকা এবং জমির অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া প্রত্যাবাসনের সংখ্যা নির্ধারণ করা অর্থহীন। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি। রোহিঙ্গা সংকটের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো সময়ের সঙ্গে একটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠা। যে শিশুরা মায়ের হাত ধরে কিংবা বাবার কোলে চড়ে শরণার্থী শিবিরে এসেছিল, তারা এখন কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশ করছে। রোহিঙ্গা শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুরাও বড় হচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে। সীমিত সুযোগ, শিক্ষার ধারাবাহিক দুর্বলতা এবং অর্থায়ন সংকটে বহু শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আবার কারিগরি বা কর্মপ্রযুক্তি শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানাবিধ জটিলতা।  ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী দুই লাখ ৩৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিশু বিদ্যালয় বা সমমানের শিক্ষার বাইরে ছিল। শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে তরুণদের পাচার, শোষণ, অপরাধ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের ঝুঁকি বাড়ে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিশুদের সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের উদ্বেগজনক প্রবণতার কথাও ইউনিসেফ জানিয়েছিল। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের সংঘাতে রোহিঙ্গা তরুণদের ব্যবহার করতে চাইতে পারে এমন আশঙ্কা বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তাই শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বৈধ জীবিকার সুযোগ বাড়ানো কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; আঞ্চলিক নিরাপত্তারও অপরিহার্য শর্ত।

মানবিক করিডর, চীনের স্বার্থ ও ভূরাজনীতি এই বিষয়গুলো সামনে এসেছে। রাখাইন এখন শুধু একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়, এটি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বৃহত্তর ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানবিক করিডরের নামে, বিদেশি শক্তির উপস্থিতি বা প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশকে সতর্কভাবে ভাবতে হবে। মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু তার বাস্তবায়ন যেন কোনো শক্তির কৌশলগত অবস্থান বিস্তারের মাধ্যম না হয়ে ওঠে। অন্যদিকে চীন সম্প্রতি বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে ‘অর্থনৈতিক করিডর’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগ বাড়তে পারে। এ ধরনের করিডরের জন্য স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা অপরিহার্য। ফলে চীনের কাছে রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক সমস্যা নয়, রাখাইনের স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গেও এই সংকটের সম্পর্ক রয়েছে। তবে চীন করিডরের নিরাপত্তার স্বার্থে রোহিঙ্গা সমস্যায় কী ভূমিকা নেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এখনই বাংলাদেশের উচিত, মানবিক সমাধান ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে বাস্তবসম্মত যোগসূত্র খোঁজা, কিন্তু কোনো বৃহৎ শক্তির কৌশলগত স্বার্থে রোহিঙ্গাদের অধিকার নির্ধারণ করতে না দেওয়া।

রোহিঙ্গা সমস্যাকে শুধু দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ, ক্রমেই কমে আসছে। প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাখাইন নীতি, যার কেন্দ্রে থাকবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন। পাশাপাশি থাকবে সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, শিক্ষা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং চীন, ভারত ও আসিয়ানের ভূমিকা। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। বাস্তব প্রয়োজন হলে, আরাকান আর্মির সঙ্গেও সীমিত ও উদ্দেশ্যনির্ভর যোগাযোগের প্রশ্ন বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তা যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক স্বীকৃতি বা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমর্থন হিসেবে প্রতীয়মান না হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ বাড়াতে হবে, যাতে প্রত্যাবাসনের আগে নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। রোহিঙ্গাদের শুধু সীমান্ত পার করে রাখাইনে পাঠানোর নাম প্রত্যাবাসন নয়। তাদের নিজের ঘরে, নিজের জমিতে, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করাই হলো প্রকৃত প্রত্যাবাসন। তাই আজ প্রশ্ন শুধু রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে, তা নয়। প্রশ্ন হলো তারা যখন ফিরবে, তখন রাখাইনে কার হাতে থাকবে ক্ষমতা, কে নিশ্চিত করবে তাদের নিরাপত্তা, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোন ধরনের সমাজ অপেক্ষা করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected] 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত