ঋণের জালে বাড়ছে দরিদ্র

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম

আজ ১৭ অক্টোবর, জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য সেফ হোমস ফর অল’ বা ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান’। বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও মানুষের অসমতা দূর করাই দিবসটির মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশে গত চার বছর ধরে অবনতি হচ্ছে দারিদ্র্য পরিস্থিতি। এতে যারা দরিদ্র, তারা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। ঋণ শোধ করতে নতুন করে চড়া সুদে ঋণ নিচ্ছেন কেউ কেউ। প্রয়োজনের সময় ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় গ্রামীণ দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বড় অংশকে নির্ভর করতে হচ্ছে এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও মহাজনদের ওপর। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাও পান না অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ। ফলে এসব মানুষের আর্থিক সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা, উচ্চ সুদ ও সীমিত আয়ের চাপে তারা আটকে পড়ছেন দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশে টানা চার বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। সব মিলিয়ে গত চার বছরে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং নারীদের চাকরি হারানোসহ বিভিন্ন কারণে দারিদ্র্যের এই বিস্তার ঘটেছে। এ ছাড়া দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে রয়েছেন প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি খাতের ভর্তুকি দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দিলেও দেশের প্রায় অর্ধেক দরিদ্র মানুষ কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পান না। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্রদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ধনীরা। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকার সুবিধা পান। বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান ১০ হাজার ৪৭২ টাকার সুবিধা।

বিদ্যুৎ খাতেও সরকারের দেওয়া ভর্তুকির বেশি সুবিধা ধনীরা পান বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির ১৫ শতাংশের কিছু বেশি পান। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান মোট ভর্তুকির ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয় সমাজের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের জন্য।

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র : এদিকে গ্রামীণ ঋণবাজারে দরিদ্র মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে ঋণের বোঝা ও কিস্তি পরিশোধের চাপ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক বছরে গ্রামে ঋণ নেওয়া পরিবারের হার ৩৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বকেয়া ঋণ রয়েছে এমন পরিবারের হার ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭১ শতাংশ হয়েছে। গ্রামীণ ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই সরবরাহ করছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান।

অন্যদিকে, মহাজনী ঋণের সুদহার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত, কিছু ক্ষেত্রে তা ১০০ শতাংশও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আয়ের তুলনায় ঋণের কিস্তি বেড়ে যাওয়ায় একটি ঋণ পরিশোধ করতে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষে ঋণের বোঝা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ছে। কৃষি উৎপাদনের জন্য ঋণ নেওয়া প্রান্তিক ও বর্গাচাষিরাও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাচ্ছেন না। ফলে দরিদ্র মানুষের আয় বাড়ানোর বদলে ঋণ পরিশোধের চাপই তাদের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত করছে বলে মনে করে বিআইডিএস।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ ঋণবাজারে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামে ব্যাংকের সরাসরি ঋণ দেওয়ার পরিমাণ ও বিস্তৃতি কমলেও বেড়েছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রভাব। বর্তমানে গ্রামীণ এলাকার প্রতি চারটি ঋণের তিনটিই দিচ্ছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকগুলোর মোট অগ্রিম ঋণের মাত্র ৮ শতাংশ যাচ্ছে গ্রামে, যা ২০০০ সালে ছিল ১৭ শতাংশ। গ্রামে সরাসরি ব্যাংক ঋণ পাওয়া পরিবারের হারও ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, গ্রামে ব্যাংকের প্রায় ৫ হাজার ৩০০ শাখার বিপরীতে এনজিওর শাখা রয়েছে প্রায় ২৬ হাজার। অর্থাৎ, প্রতিটি ব্যাংক শাখার বিপরীতে এনজিওর প্রায় পাঁচটি শাখা রয়েছে। এনজিওগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা গ্রামীণ ব্যাংকিং খাতের ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন টাকার চেয়ে বেশি।

গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকার প্রতি চারটি ঋণের তিনটি বা ৭৫ শতাংশই দিচ্ছে এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। ফলে ব্যাংকগুলো সরাসরি কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে মূলত এনজিওগুলোকে অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রামীণ ঋণবাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

গত ১৪ অক্টোবর থাইল্যান্ডে আইএমএফের বার্ষিক সভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রশংসা পেয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও কৃষকদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। সরকারের লক্ষ্য, বহিঃস্থ অর্থনৈতিক ধাক্কার পুরো চাপ যেন সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরও অবনতি না ঘটে।

উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কেবল তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয় নয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ও যুক্ত। সরকার এসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় এসব পরিকল্পনার বাস্তবসম্মত দিকগুলো উঠে এসেছে।

বিষয়টি নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৮০ লাখ মানুষের নতুন করে দারিদ্র্যে নেমে যাওয়া এবং সোয়া ছয় কোটি মানুষের দারিদ্র্যঝুঁকিতে থাকা কোনো সামান্য নীতিগত বিচ্যুতি নয়। এটি দেশের উন্নয়ন কৌশলের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের আয়কে নিরাপদ করতে না পারে, কর্মসংস্থানের মান উন্নত না করে এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সামাজিক ভিত্তি দুর্বলই থেকে যাবে। উন্নয়নের সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষ শুধু দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠবে না, বরং সেখানে টিকে থাকার সক্ষমতাও অর্জন করবে।

তিনি বলেন, বাজারের দুর্বলতা দারিদ্র্য বাড়ার একটি কারণ। উচ্চ আয়ের পরিবার কিছু সঞ্চয় কমিয়ে বা খরচের ধরন বদলে মূল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে পারে। দরিদ্র পরিবার পারে না। এখন তাই শুধু দারিদ্র্য কর্মসূচি বাড়ালেই হবে না। প্রথম কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক শাসনের প্রশ্ন হিসেবে দেখা। খাদ্য সরবরাহ, বাজারে প্রতিযোগিতা, আমদানি নীতি, জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং মুদ্রানীতিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষাকে ভাতার সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক বীমা, বেকারত্ব ঝুঁকি, স্বাস্থ্য ব্যয় এবং আয়হানি মোকাবিলার দিকে নিতে হবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানকে দারিদ্র্য হ্রাসের কেন্দ্রীয় কৌশলে ফিরিয়ে আনতে হবে।

দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সরকারকে বহুমুখী কর্মসূচি নিতে হবে এবং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ অবস্থায় দারিদ্র্য নিরসনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। আর কর্মসংস্থান তৈরির জন্য স্থানীয় ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখাও প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ ও দারিদ্র্য কমানো সম্ভব। তবে এ উদ্যোগের সুফল পেতে হলে যেসব মানুষ সামাজিক সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন, তাদের সবার কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। এখনো সুরক্ষাহীন সব মানুষের কাছে এ ধরনের কর্মসূচির সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত