নেত্রকোনার দুর্গাপুরে নিহত সাংবাদিক লুৎফর জামান ফকিরের হত্যার বিচার দাবি করেছেন তার স্ত্রী আনন্দিতী সাংমা। স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে খুনিদের দ্রুত চূড়ান্ত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ব্যারিস্টার কায়সার কামালের পক্ষে নিহত সাংবাদিকের পরিবারের খোঁজখবর নিতে তার বাড়িতে যান উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা পরিবারটিকে আর্থিক অনুদান ও পোশাক উপহার দেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন আনন্দিতী সাংমা।
তিনি বলেন, ‘আমি তো বিচার চাই। আমার জন্য না, আমার দুইটা সন্তান এতিম হয়ে গেছে। এরা কি আর বাবাকে পাবে? আমার মেয়েটা নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, হয়তো বুঝে গেছে। যখন একটু বুঝতে পারছে, আমাকে বুঝাচ্ছে, ‘বাবা স্টার হয়ে গেছে মা, তুমি কান্না করবা না।’
নিজের চার বছর বয়সী মেয়ের কথা উল্লেখ করে আনন্দিতী বলেন, মেয়েটি মাঝে মাঝে বাবাকে দেখতে না পেয়ে জানতে চায়, বাবা কবে আসবেন বা কোথায় গেছেন। অন্যদিকে, ছোট ছেলেটি এখনো ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। বড় হয়ে যখন সে বাবার কথা জানতে চাইবে, তখন তাকে কী উত্তর দেবেন, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
আনন্দিতীর ভাষ্য, তার ছেলে হয়তো সারাক্ষণ ‘বাবা’ বলে ডাকবে, কিন্তু সাড়া দেওয়ার মতো কেউ থাকবে না। কেউ এসে বলবে না, ‘আমি তোমার বাবা।’ তাই স্বামীকে ফিরে না পেলেও তাঁর হত্যার বিচার চান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার সন্তানদের অন্তত এটুকু বলতে পারব যে, তোমাদের বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি। কিন্তু আমি তার বিচার চেয়েছি, আমরা বিচার পেয়েছি। এটা তো আমি আমার সন্তানদের বলতে পারব।’
সাংবাদিক স্বামীর মৃত্যুর আগে পাওয়া হুমকি এবং কয়েকটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন আনন্দিতী সাংমা। তিনি জানান, গত বুধবার লুৎফর জামান ফকির একটি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে ২৫টি বক মেরে খাওয়ার বিষয়ে একটি শিরোনাম ছিল। তিনি শুধু পোস্টটির শিরোনাম দেখেছেন, পুরো ভিডিওটি এখনো দেখেননি।
আনন্দিতী বলেন, তার স্বামীকে নিয়মিত অনেকেই হুমকি দিতেন। তবে ওই পোস্টের পর তাকে আরও বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হয়েছিল। এ সময় তিনি অন্যদের সঙ্গে কথা বলার সময় কিছুটা উচ্চস্বরে কথা বলতেন বলেও জানান স্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার আগে বিকেলে স্বামীকে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলতে শুনেছিলেন। ওই ব্যক্তি তাকে ভিডিও মুছে ফেলার কথা বলছিলেন বলে তার মনে হয়েছে। জবাবে লুৎফর জামান ফকির বলেছিলেন, চাইলেই ভিডিও মুছে ফেলা যায় না এবং তিনি ভিডিওটি মুছবেন না। তবে কার সঙ্গে তাঁর স্বামীর কথা হয়েছিল, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি আনন্দিতী।
নিহত সাংবাদিক বিভিন্ন সময়ে দুর্গাপুরের অনেক মানুষের অনিয়মের বিষয়ে পোস্ট দিয়েছেন বলেও জানান তার স্ত্রী। যাদের স্থানীয়ভাবে সন্ত্রাসী বা শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি রয়েছে, তাদের নিয়েও তিনি একাধিক পোস্ট করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন আনন্দিতী। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে কারও জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে চাননি তিনি। আনন্দিতী বলেন, কে বা কারা তার স্বামীর সঙ্গে কী করেছে, তা তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন না। নিজের জানা তথ্যগুলোই সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেছেন।
স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আনন্দিতী সাংমা। তিনি বলেন, তার প্রথম দাবি, খুনিদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গ্রেপ্তার করে হাজতে আটকে রাখাই যথেষ্ট নয়, তিনি অপরাধীদের চূড়ান্ত শাস্তি চান।
আনন্দিতী বলেন, ‘আমি ফাঁসির দাবি জানাচ্ছি।’
দুই সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ জীবন গড়তে একটি চাকরির প্রয়োজনের কথাও জানান তিনি। তার ভাষ্য, স্বামী জীবিত থাকাকালে তাকে চাকরি করতে দেননি। কিন্তু এখন দুই সন্তানকে বড় করা এবং মানুষ করার দায়িত্ব তার ওপরই পড়েছে। তার বাবা নেই, মা আছেন। স্বামী সম্পত্তি দিয়ে না গেলেও তাকে শিক্ষিত করে রেখে গেছেন বলে জানান তিনি।
আনন্দিতী সাংমা জানান, তিনি বিএসসি নার্সিং সম্পন্ন করেছেন এবং একজন নিবন্ধিত নার্স। তার নার্সিংয়ের নিবন্ধন নম্বরও রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি নার্সিং নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছেন এবং দুটি প্রিলিমিনারি পরীক্ষাও দিয়েছেন।
এ অবস্থায় নিজের জন্য একটি চাকরির ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ঢাকায় চাকরি হলে তার জন্য সুবিধা হবে বলে জানান আনন্দিতী। কারণ, তার নিজের পরিবার এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। সেখানে চাকরি করতে পারলে পরিবারের অন্য সদস্যরা দুই সন্তানের দেখাশোনায় সহযোগিতা করতে পারবেন।
আনন্দিতী বলেন, দুই সন্তানকে একা রেখে মফস্বলে থেকে চাকরি করা তার জন্য কঠিন হবে। এ কারণে ডেপুটি স্পিকারের কাছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আকুল আবেদন জানিয়েছেন তিনি। তার প্রত্যাশা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একটি চাকরির ব্যবস্থা হলে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবেন।