বাড়ছে দারিদ্র্য

ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজন কার্যকর চেষ্টা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৮ এএম

দেশের সীমিত আয়ের অধিকাংশ মানুষের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর্যাপ্ত আয় নেই। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ গত অর্থবছরে দারিদ্র্যসীমার নিচে গেছেন। গত চার বছরে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। উচ্চমূল্যস্ফীতি, প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ও চাকরি হারানোসহ বিভিন্ন কারণে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ এবং আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার দিক থেকে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

দারিদ্র্যসীমা কী? বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যক্তির দৈনিক আয় বা খরচ তিন ডলারের কম হলে তিনি চরম দরিদ্র। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের শনিবারের বিনিময় হার অনুযায়ী ১ আমেরিকান ডলার ১২৩ টাকা ৭০ পয়সার সমান। তাহলে ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহের জন্য দৈনিক কমপক্ষে ৩৭১ টাকা অথবা মাসে অন্তত ১১ হাজার ১৩৩ টাকা আয় না থাকলে তিনি দারিদ্র্যসীমায় পড়ছেন, যা তার খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের অক্ষমতা নির্দেশ করে। টাকার এই পরিমাণ আয় সীমিত নয় অথবা পর্যাপ্ত আয় করেন, এমন ব্যক্তিদের কাছে তেমন গুরুত্ব নাও পেতে পারে। কিন্তু যে মানুষটির নিজের বা পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণের মতো নিয়মিত আয় নেই, তার প্রতিটি দিন কাটে নানামুখী বিড়ম্বনায়। সমস্যা হলো, এমন মানুষদের প্রায় সবাই রাষ্ট্রে ও সমাজে প্রায় গুরুত্বহীন অবস্থায় থাকেন। আশঙ্কার আরেকটি দিক হলো দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে রয়েছেন আরও প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। যারা নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আয়বৈষম্য বাড়তে থাকা, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, সঞ্চয় ভেঙে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ঋণগ্রস্ত হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।

বিশ^ব্যাংক বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমরা মনে করি, দারিদ্র্যের এই সংকটকে সাময়িক অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে বড় ভুল করা হবে। কারণ, এত বিপুল সংখ্যক মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস এবং ওই সীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রের জন্যও বড় ঝুঁকির বিষয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগত পুঞ্জীভূত সমস্যার জন্য এমন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে সঠিক ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। সমস্যা হলো, সরকার সাময়িক সমস্যা মোকাবিলায় বেশি মনোযোগ দেওয়ায় দারিদ্র্য নির্মূলের জন্য অতি প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের চেষ্টা এখনো নেই বললেই চলে।

সরকার তার চলতি পাঁচ বছর মেয়াদে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায়। তবে শুধু আর্থিক সহায়তা ও ভর্তুকিনির্ভর কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্যের মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দূর করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা মনে করি, দারিদ্র্যের এই সংকট লাঘব করতে সামাজিক কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি, আয় বৃদ্ধি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিসহ সমন্বিত কার্যক্রম নিতে হবে। 

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা মনে করি, বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের জন্য ন্যূনতম মজুরির সরকারি ঘোষণা এখন সময়ের দাবি।

দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সরকার সব কিছু করে দেবে, এমন ভরসায় অলস-অপেক্ষা যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি না। মানুষের, বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের নিজের চেষ্টায় দারিদ্র্য থেকে মুক্তির জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি, যাদের সামান্য আয় আছে তাদের প্রয়োজনে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি এবং ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে সঠিক আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। নিজে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি, ডিজিটাল ও বাস্তবমুখী এমন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা দরকার, যা চাকরির চাহিদা মেটানো ছাড়াও প্রয়োজনে স্বল্প পুঁজিতে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেই কিছু করার উপায় হতে পারে।

আমাদের প্রত্যাশা, দারিদ্র্য মোচনের এ লড়াইয়ে রাষ্ট্র, বেসরকারি উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সবাই সবার প্রতি সহমর্মী হবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত