দুর্গাপূজার ইহজাগতিক ভাষা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ এএম

শরতের নীল আকাশ আর কাশফুলের দোলায় বিশ্বজুড়ে ছড়ানো বাঙালি হিন্দুদের হৃদয়ে যখন এক অচেনা শিহরণ জাগে, তখন বুঝে নিতে হয় ঘরের টানে আর শিকড়ের টানে মেতে ওঠার সময় এসে গেছে। কলকাতার ব্যস্ত গলি, ঢাকার ঢাকেশ্বরী, চট্টগ্রামের হাজারী গলি কিংবা সুদূর লন্ডন-নিউ ইয়র্কের হিমশীতল শহর সবখানেই এক চেনা অনুভূতির তান। মন্ত্রের অপার্থিব ব্যাকরণ আর ঢাকের চেনা বিটে যখন দেবীকে আবাহন করি, তখন তা কেবল এক ধর্মীয় আচার হয়ে থাকে না; বরং রূপ নেয় এক খাঁটি সামাজিক মেলবন্ধনে। কট্টরতা ও বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই আবাহন আসলে দুই বাংলা থেকে প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা বিশ্ববাঙালির একতার, সহাবস্থানের এবং সম্প্রীতির এক অসাম্প্রদায়িক ইহজাগতিক ভাষা। সব গণ্ডি পেরিয়ে দুর্গাপূজা তাই আজকের প্রজন্মের কাছে কেবল ঐতিহ্য আর নস্টালজিয়ার মেলবন্ধন নয়, বরং নিজেদের রি-কানেক্ট করার এক নান্দনিক প্ল্যাটফর্ম। উৎসবের এই বর্ণিল আয়োজনে যে নীরব শিল্পীরা নেপথ্যে থাকেন কলকাতার কুমোরটুলী কিংবা চট্টগ্রামের হাজারীগলির মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে মণ্ডপের কাঠমিস্ত্রি, আলোর কারিগর আর ঢাকিরা-তাদের অনন্য অবদান এই আয়োজনকে এক গভীর মানবিক মাত্রা দেয়। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বহু অসাম্প্রদায়িক ও শ্রমজীবী মানুষের হাতের স্পর্শেই একখণ্ড কাদা-মাটি আর খড় রূপ নেয় শিল্পের পরম নান্দনিকতায়। তাদের এই জীবিকার লড়াই ও মমতার মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে আমাদের যৌথ সামাজিক দায়বদ্ধতা।

দুর্গাপূজা কেবল কোনো নির্দিষ্ট অনুশাসনের আয়োজন নয়; এটি শিল্প, শ্রম আর সর্বজনীন মেলবন্ধনের এক বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংযোগসূত্র। পোশাকের বাজার থেকে শুরু করে পরিবহন, পর্যটন কিংবা আতিথেয়তা ক্ষেত্র প্রতিটি খাতেই যুক্ত থাকে সর্বস্তরের মানুষের যৌথ প্রচেষ্টা। প্রতিমা যখন চট্টগ্রাম থেকে ফটিকছড়িতে যায়, কিংবা প্রবাস থেকে দুই বাংলার শহরগুলোতে পৌঁছায়, তখন চালকের আসন থেকে শুরু করে প্যান্ডেল নির্মাণের প্রতিটি ধাপে মিশে থাকে সব ধর্মের মানুষের ঘাম ও শ্রম। এমনকি উৎসবের দিনে আড্ডা আর খাবারের রাজপথেও কোনো পরিচয়ের দেওয়াল থাকে না। এই পারস্পরিক সংহতিই প্রমাণ করে যে, সামাজিক উৎসবের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে বিভেদহীন যৌথতায়, যা সব ধরনের সংকীর্ণ ধর্মীয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে। হিন্দু-মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষের এই যৌথ অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই প্রমাণ করে যে, লোকউৎসবের সর্বজনীন ক্যানভাসে সংকীর্ণ ধর্মীয় বিতর্ক একেবারেই অহেতুক ও অবান্তর। এই সময়টায় দুই বাংলা ছাড়িয়ে প্রবাসের প্রতিটি মণ্ডপ আজ একেকটা ছোট্ট ‘বাংলাদেশ’ বা ‘পশ্চিমবঙ্গ’ হয়ে ওঠে। যেখানে ধর্মীয় আচারের সুবাস আর খাঁটি সামাজিকতার আড্ডা মিলেমিশে একাকার। দেশজুড়ে ও বিদেশের বুকে হাজার মাইল দূরে বসেও অঞ্জলি দেওয়া, ধুনুচি নাচ, সাজগোজ আর ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি প্রসাদের আনন্দ-সবকিছুর পেছনে যে আবেগ কাজ করে, তা কেবল শাস্ত্রীয় রীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আসলে প্রবাসে ও দেশে নিজস্ব পরিচয় রক্ষা করার, শেয়ারড মেমোরি তৈরি করার এবং সব ভেদাভেদ ভুলে একসাথে আনন্দ উদযাপনের এক অসাধারণ সোশ্যাল ক্যানভাস।

শরতের এই আবাহন তাই কেবল দেবীর পূজা নয়, এটি দুই বাংলাসহ সনাতনী বিশ্ববাঙালির এক কালেক্টিভ যোগাযোগ। যখন দেশ-বিদেশের প্রতিটি অলিগলিতে ঢাকের কাঠি পড়ে, তখন সেই শব্দতরঙ্গ আসলে একতার বার্তা পাঠায়। হানাহানি, ক্লান্তি আর সামাজিক দূরত্বকে দূরে ঠেলে এই উৎসব আমাদের এমন এক অলিখিত নেটওয়ার্কে যুক্ত করে, যার প্রধান ভাষাই হলো সম্প্রীতি। পৌরাণিক টেক্সটগুলোকে যদি কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে না বেঁধে এক সর্বজনীন মুক্ত আলোয় দেখা যায়, তবে বোঝা যায় দুর্গা রূপকটি আদতে বিভেদের বিরুদ্ধে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক সংহতির গল্প বলে। যোগাযোগবিদ্যার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতে দুর্গাপূজার ‘আবাহন’ হলো একটি শক্তিশালী সংকেত-প্রক্রিয়া, যা দূরত্বের দেওয়াল ভেঙে দিয়ে বিশ্ববাঙালিকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে। উগ্রতা ও সামাজিক বিভেদের বিপরীতে এটি এক ইহজাগতিক ও সর্বজনীন মানবিক যোগাযোগের মাধ্যম। পুরাণের পাতা উল্টালে দেখা যায়, দেবী দুর্গার উপস্থিতি কোনো একক সত্তার প্রকাশ নয়, বরং বিভিন্ন দেবতা ও শক্তির তেজ ও অস্ত্রের একত্রীভবন। পৌরাণিক অনুসন্ধানের আলোকে এটি কোনো অলৌকিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং যৌথ শক্তির এক মহান সামাজিক রূপক। সমাজবিজ্ঞান ও যোগাযোগবিদ্যার দৃষ্টিতে, বিভেদ ও উগ্রতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে বিচ্ছিন্নতা নয়, বৈচিত্র্যের ঐক্য প্রয়োজন। কলকাতা থেকে নিউ ইয়র্ক- সব মণ্ডপেই এই বহুত্বের তেজ প্রতিফলিত হয়, যা শেখায় কীভাবে বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে একতাবদ্ধ হতে হয়।

উৎসবের দিনগুলোতে শহরের রাজপথ কিংবা বিদেশের কমিউনিটি সেন্টারগুলো এক একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণে পরিণত হয়। এখানে শ্রেণি, পরিচয় কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখার পার্থক্য মুছে যায়। মিডিয়া অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজের মতে, এই উৎসবটি একটি বিশাল গণমাধ্যম, যা ভিজ্যুয়াল আর্ট, সুর ও আলোর নান্দনিকতায় অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে। বিদেশের মাটিতে এই আয়োজন যেমন বাঙালিদের জন্য শিকড় আঁকড়ে ধরার মাধ্যম, তেমনি সামাজিক দূরত্ব ও আধুনিক একক জীবনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে নতুন করে যুক্ত হওয়ারও এক বিরাট সামাজিক সেতু। দুর্গা প্রতিমা নির্মাণে পতিতালয়ের মাটি থেকে শুরু করে সমাজের নানা স্তরের উপকরণের প্রয়োজনীয়তা এবং পূজার আয়োজনে নয়টি গাছের (নবপত্রিকা) উপস্থিতি এক গভীর অন্তর্ভুক্তি পাঠায়। পৌরাণিক আচারের পেছনের এই সামাজিক সত্যটি প্রথাগত সংকীর্ণতার একদম বিপরীত। এটি বার্তা দেয় সমাজ ও

প্রকৃতির সবচেয়ে অবহেলিত বা প্রান্তিক অংশকে বাদ দিয়ে সমাজের কল্যাণ বা পূর্ণতা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আধুনিক সমাজের জন্য এটি একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ও অসাম্প্রদায়িক সংকেত। শরতের এই আবাহন তাই ধর্মীয় আবেগকে সঙ্গে নিয়েও এক বিশ্বজনীন সামাজিক যোগাযোগের ভাষা হয়ে ওঠে। দুই বাংলা ও প্রবাসী বাঙালির এই যৌথ আয়োজন প্রমাণ করে যে, বিভেদ ও উগ্রতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শিল্প, ঐতিহ্য এবং মানুষের মেলবন্ধনই পারে এক সম্প্রীতিপূর্ণ পৃথিবীর বার্তা দিতে।

দুর্গাপূজা পার্থিব না অপার্থিব? জাগতিক নাকি ইহজাগতিক? এসব প্রশ্ন তোলা মানে উৎসবকে খাটো করা। মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে যখন ঢাকের তালে হালকা শরীর দুলিয়ে নিই, তখন তো আসলে তা হয় ইহজাগতিক! পুরাণ মতে, বছর ঘুরে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে মা দুর্গার আগমন ঘটে। স্বর্গের পাসপোর্ট-ভিসা, প্রোটোকল আর ডিভাইন এনার্জির যে কারবার, তা পুরোপুরি অপার্থিব। কিন্তু সেই ‘ডিভাইন ডেস্টিনেশন’ যখন এসে পৌঁছায় আমাদের পাড়ার প্যান্ডেলে, অমনি তার ভাষা বদলে হয়ে যায় একদম খাঁটি ইহজাগতিক! স্বর্গের দেবী মর্ত্যে পা রাখতেই আমরা তাকে বানাই আমাদের ঘরের মেয়ে। দশ হাতে দশটা অস্ত্র নিয়ে তিনি উগ্রতা সংহার করছেন ঠিকই, কিন্তু আমরা সেই দশ হাতের শক্তিতে খুঁজে পাই সংসারের দশ দিক এক সঙ্গে সামলানো বাঙালির প্রতিদিনের জ্যান্ত লড়াইটাকেই। যোগাযোগবিদ্যার লেন্সে দেখলে, দুর্গোৎসব হলো সনাতনী হিন্দুদের সবচেয়ে বড় আর রঙিন ‘অফলাইন সোশ্যাল মিডিয়া’। স্বর্গের বার্তা আমরা কীভাবে ডিকোড করি? মন্ত্রপাঠের সংস্কৃত সুর হয়তো অনেকের কাছেই বেশ অপার্থিব, কিন্তু সেই সুরের ভেতরেই কিন্তু লুকিয়ে থাকে পঞ্চপ্রদীপের ধোঁয়া, নতুন জামার সুবাস আর আড্ডার সোঁদা গন্ধ। বিদেশের বরফশীতল শহর থেকে শুরু করে কলকাতার উপচে পড়া ভিড় সব প্যান্ডেলই আসলে একেকটা ‘ইনক্লুসিভ হিউম্যান হাব’। যেখানে স্বর্গের দেবীকে আবাহন করে মানুষ খুঁজে নেয় মানুষকে। প্রতিমার ভেতরের যে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সেটাও কম মজার নয়! কাদা-মাটি, পতিতালয়ের মাটি আর নয়টি গাছ দিয়ে দেবী গড়ে তোলা এই যে অসাম্প্রদায়িক ব্যাকরণ, তা স্বর্গের কোনো নিয়ম নয়, এটা মাটির মানুষের বানানো সহাবস্থানের গল্প। দেবীর চার পাশে থাকা পরিবারের মেম্বারশিপটাও দারুণ কে নেই সেখানে? বিদ্যার দেবী, লক্ষ্মী দেবী আর বাহনদের কারবার। উগ্রতা ও অসুর দমনের পৌরাণিক মিথটি আসলে সমাজে চলতে থাকা হিংসা আর বিভেদের বিরুদ্ধে এক চরম বার্তা।

তাই বলা যায়, পূজার মূল টেক্সটটি হয়তো অপার্থিব, কিন্তু তার সাবটেক্সট বা ভেতরের ভাবটা পুরোটাই ইহজাগতিক। স্বর্গ থেকে মহিষাসুরমর্দিনী যা-ই বার্তা পাঠান না কেন, মর্ত্যরে মানুষ তাকে কনভার্ট করে নেয় জিলাপি, খিচুড়ি প্রসাদ, ধুনুচি নাচ আর ভেদাভেদ ভুলে গলা মেলানোর সম্প্রীতির ভাষায়। দেবীর আবাহন তো বাহানা মাত্র, আসল উদ্দেশ্য তো মানুষে মানুষে যোগাযোগের এই মহাসমুদ্র তৈরি করা! উৎসব প্রিয় বাঙালির কাছে উপলক্ষ মানেই কয়েকটি দিন উল্লাসে মাতা। শুভ শারদীয়া!

লেখক : শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি গবেষক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত