কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার আগের রাতে অর্থাৎ শুক্রবার রাতে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। শনিবার ভোরে ঘুরতে বের হন আইরিন জাহান মীম ও ইসরাত জাহান ইমা। বাকি ১৯ পর্যটক তখন ঘুমে ছিলেন। এরই মধ্যে আগুন লাগলে ৮ জন পর্যটক লাফিয়ে কিংবা জানালা ভেঙে বের হতে পারলেও তিন শিশু ও ৬ জন নারীসহ ১১ জন রিসোর্টে আটকে পড়েন। ফায়ার সার্ভিস ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে শনিবার বিকেল ৪টায় উদ্ধার অভিযান শেষ করে।
নিখোঁজরা হলেন ফারিয়া কবীর (৩৫), তার ছেলে ফাইজান (৫), ফারিয়ার ছোট ভাই নাফিজ তেহামী জেরিফ, খালাতো বোন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা, মিলিতা মেহেজাবিন আলভী, যশোরের মনিরামপুরের নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী আফসানা আক্তার এবং তাদের দুই শিশুকন্যা রোবাইনা আকতার ও সুনাইনা আকতার, ঢাকার সাভারের স্কুলশিক্ষক নাসরিন আকতার মুক্তা।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর রিসোর্টটির সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন জানিয়েছিলেন, রিসোর্টটিতে মোট ২১ জন পর্যটক এবং ১৯ জন স্টাফ অবস্থান করছিলেন। এরমধ্যে দুইজন নারী আগুন লাগার আগে সকালে ঘুরতে বের হন। বাকিরা রিসোর্টে ছিলেন। এদের মধ্যে ৭/৮ জন পর্যটক আগুন ভয়ংকর রূপ নেওয়ার আগেই নানাভাবে রিসোর্ট ত্যাগ করেন। স্টাফরাও দ্রুত বের হয়ে যান। এই বিষয়ে ফারিহার ফুফাতো ভাই বিজিবিতে কর্মরত ইলিয়াছ আমিন বলেন, ‘আমার ৬ জন স্বজন নিখোঁজ রয়েছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহ দেখে শনাক্ত করার উপায় নাই। তাই ডিএনএ প্রতিবেদন পেলেই বলতে পারব এই ১০ জনের মধ্যে কয়জন আমাদের স্বজন রয়েছে।’
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নিখোঁজ নাহিদুর রহমান তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স বলেন, ‘দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে আমার ভাই রিসোর্টের ২০২ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছিলেন। ধারণা করছি, শনিবার একটি বাথরুম থেকে যে ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে সেগুলো আমার ভাইয়ের পরিবারের। তবে দেহগুলো পুড়ে গেছে। তাই চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ জন্য ডিএনএ প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছি। এ ছাড়া মর্গে একজনের মরদেহ কম রয়েছে।’
নিখোঁজ নাসরিন আক্তার মুক্তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টে গিয়েও নাসরিনকে পেলাম না। হাসপাতালে লাশের যে অবস্থা দেখা গেল, কারও পরিচয় শনাক্ত করারই উপায় নাই। পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট লাগবে। তবে হাসপাতাল মর্গে ও পোড়া রিসোর্টে এসে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে হিসাব করে বুঝেছি মরদেহ ১১টি থাকার কথা। কিন্তু একটি কম রয়েছে।’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক ( প্রশাসন ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, ‘নানাভাবে আমরা তথ্য পেয়েছি অগ্নিকা-ের ঘটনায় ১১ জনের সন্ধান মিলছে না। কিন্তু আমরা মরদেহ উদ্ধার করেছি ১০ জনের। এই কারণে রবিবার বিকেল থেকে আবারও পোড়া রিসার্টে উদ্ধার অভিযান চালু করি। কিন্তু দুর্ঘটনাস্থল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমাদেরকে ভালোভাবে তল্লাশি চালানোর আগেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে হয়।’
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বলেন, আসলে পুলিশ বা প্রশাসন কারও কাছেই ওই রিসোর্টে দুর্ঘটনার সময় কয়জন ছিল তার কোনো তথ্য নেই। তবুও আমরা স্বজনদের দাবির মুখে রবিবারও সেখানে তল্লাশি চালাই। কিন্তু রিসোর্টের পোড়া কাঠগুলো ওপর থেকে ভেঙে পড়তে শুরু করায় উদ্ধারকারীদের জীবনের ঝুকি দেখা দেয়।’
মরদেহ পেতে এক মাস অপেক্ষা করতে হবে স্বজনদের : টুপটুপ রিসোর্ট হতে শনিবার উদ্ধারের পর কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা ১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে প্রায় একমাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকর্মী, তদন্তকারী কর্মকর্তা, চিকিৎসক, পুলিশসহ জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, মরদেহগুলো পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে। দেখে শনাক্ত করা সম্ভব নয় কোনটি কার। এমনকি কে নারী, কে পুরুষ কিংবা শিশু তাও জানা সম্ভব নয়। তিনি জানান, মরদেহ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে রবিবার পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদন পেতে সাধারণত ৩/৪ সপ্তাহ সময় লাগে।
এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার এসআই আশিষ সূত্রধর ফোনে বলেন, ‘আমি ডিএনএ নমুনা নিয়ে ঢাকায় এসেছি ও ল্যাবে জমা দিয়েছি। আশা করছি দ্রুত প্রতিবেদন পাব এবং স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে পারব।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ডিএনএ প্রতিবেদন তৈরিতে ৩/৪ সপ্তাহ সময় লাগে। এখানে আমরা চাইলেই কিছু করতে পারব না। তবে এর চেয়েও বেশি দেরি যাতে না হয় সে চেষ্টা আমরা করব।’
মালিক ম্যানেজারসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা : টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকা-ে শিশু, নারী ও শিক্ষার্থীসহ ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শনিবার রাতে উখিয়া থানার এসআই আশিষ সূত্রধর বাদী হয়ে রিসোর্টটির দুই মালিক ও ম্যানেজারসহ ২৩ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। এরমধ্যে ৭ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ তদন্তের স্বার্থে কারও নাম প্রকাশ করেনি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলায় রিসোর্টের মালিক চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা তানভীর আহমদ ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদ ও রিসোর্টটির সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সুমনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও নিয়াজ ও তানভীরের অবস্থান এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া রিসোর্ট পরিচালনা করে ১০ জন লোককে হত্যার অভিযোগে মামলাটি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এতে ২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আটক সুমনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) অহিদুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে পুলিশ। দশটি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। এর সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
তদন্ত কমিটি মাঠে : অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট পরিচালনা, আগুন ধরার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে জেলা প্রশাসনের গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল রবিবার থেকেই মাঠে নেমেছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের এডিএম তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে কমিটি গতকাল বিকেলে পোড়া রিসোর্টটি পরিদর্শন করে। এ সময় তারা আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তবে গণমাধ্যমকে প্রতিবেদন তৈরির আগে কোনো কিছু জানাতে রাজি হয়নি তদন্ত কমিটি।
এ বিষয়ে তাসনীম জাহান বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এমন ভয়াবহ ঘটনা নিকট অতীতে কক্সবাজারে ঘটেনি। তাই এটি খুব নিরপেক্ষভাবে এবং গোপনীয়তার সহিত তদন্ত করা হবে। তদন্ত শেষ হলে প্রতিবেদন দাখিলের পর বিস্তারিত জানানো হবে।’