বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস আজ: হাড় সুস্থ রাখতে সচেতনতাই সুরক্ষা

অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে হাড়ের ঘনত্ব ও গুণগত শক্তি কমে যায়। ফলে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাত, পড়ে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময়ও হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এ রোগে মেরুদণ্ডের হাড়, নিতম্বের হাড় এবং কবজির হাড় বেশি ভাঙতে দেখা যায়।

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৩ পিএম
'সারা জীবন হাড় গড়ুন, সুরক্ষা দিন ও শক্তিশালী রাখুন।' ২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস। হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগের ঝুঁকি কমানো এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের (IOF) উদ্যোগে এ বছরের প্রতিপাদ্যে সারা জীবন হাড়ের যত্ন নেওয়া, হাড়ের শক্তি বজায় রাখা এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
 
অস্টিওপোরোসিস কী?
 
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে হাড়ের ঘনত্ব ও গুণগত শক্তি কমে যায়। ফলে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে এবং সামান্য আঘাত, পড়ে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময়ও হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এ রোগে মেরুদণ্ডের হাড়, নিতম্বের হাড় এবং কবজির হাড় বেশি ভাঙতে দেখা যায়।
সাধারণত হাড়ের ক্ষয় ধীরে ধীরে ঘটে। প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ মানুষের কোনো সুস্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। এ কারণে অনেকেই হাড় ভেঙে যাওয়ার আগে বুঝতে পারেন না যে তাঁদের হাড়ের শক্তি কমে গেছে। তাই অস্টিওপোরোসিসকে নীরব রোগও বলা হয়।
 
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
 
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে মেনোপজের পর নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ক্ষয় দ্রুত হতে পারে। তবে শুধু নারী নয়, পুরুষেরাও এ রোগে আক্রান্ত হন।
যাদের পরিবারে অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ভাঙার ইতিহাস রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম থেকে দূরে থাকেন, যাদের খাদ্যতালিকায় ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি কম, যারা ধূমপান করেন অথবা অতিরিক্ত মদ্যপান করেন, তাদের ঝুঁকি বেশি হতে পারে। দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ, বিশেষ করে কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহার এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগও হাড়ের ক্ষয়ের কারণ হতে পারে।
 
লক্ষণ ও রোগ নির্ণয়
 
অস্টিওপোরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত ব্যথা হয় না। তবে মেরুদণ্ডের হাড়ে ক্ষুদ্র বা বড় ধরনের ভাঙন হলে পিঠে ব্যথা, উচ্চতা কমে যাওয়া, মেরুদণ্ড সামনের দিকে বাঁকা হয়ে যাওয়া কিংবা দৈনন্দিন চলাফেরায় অসুবিধা দেখা দিতে পারে। সামান্য আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়াও এ রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা বা বোন মিনারেল ডেনসিটি (BMD), বিশেষত ডিএক্সএ (DXA) স্ক্যান করা হয়। রোগীর বয়স, উপসর্গ, পূর্ববর্তী হাড় ভাঙার ইতিহাস, ওষুধ সেবন এবং অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
 
প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা
 
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে শৈশব ও কৈশোর থেকেই। হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও শক্তি বজায় রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও প্রোটিন থাকা জরুরি।
দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম এবং সবুজ শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। তাই নিরাপদ সময়ে সূর্যের আলো গ্রহণ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।
 
হাড় সুস্থ রাখতে ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপি
 
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা, শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী সিঁড়ি ব্যবহার, হালকা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং ভারসাম্য উন্নয়নের ব্যায়াম হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। ব্যায়াম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখে।
যাদের ইতিমধ্যে অস্টিওপোরোসিস রয়েছে, তাদের ব্যায়াম নির্বাচনে সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে মেরুদণ্ডের হাড় দুর্বল হলে হঠাৎ সামনে ঝোঁকা, কোমর মোচড়ানো এবং অতিরিক্ত ভার তোলার মতো কাজ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা, হাড়ের অবস্থা ও ভারসাম্য অনুযায়ী ব্যায়াম নির্ধারণ করা উচিত।
ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে পেশির শক্তি বৃদ্ধি, ভারসাম্য উন্নয়ন, সঠিক দেহভঙ্গি বজায় রাখা এবং নিরাপদে চলাফেরার প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। হাড় ভাঙার পর পুনর্বাসনেও ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যায়াম একা অস্টিওপোরোসিসের চিকিৎসার বিকল্প নয়; প্রয়োজনে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হয়।
 
পড়ে যাওয়া প্রতিরোধে সতর্কতা
 
বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পড়ে যাওয়া অস্টিওপোরোসিসজনিত হাড় ভাঙার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই বাড়ির মেঝে শুকনো রাখা, চলাচলের পথে বাধা সরিয়ে ফেলা, বাথরুমে পিছলরোধী ব্যবস্থা রাখা, পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত জুতা ও হাঁটার সহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করা জরুরি। দৃষ্টিশক্তি, ভারসাম্য ও চলাফেরার সমস্যা থাকলে দ্রুত মূল্যায়ন করানো উচিত।
 
চিকিৎসা ও সচেতনতাই সুরক্ষার উপায়
 
অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত হলে চিকিৎসক রোগীর ঝুঁকি অনুযায়ী ওষুধ, পুষ্টি, ব্যায়াম ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করেন। যাঁদের একবার হাড় ভেঙেছে, তাঁদের ভবিষ্যতে আবার হাড় ভাঙার ঝুঁকি মূল্যায়ন করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবসের মূল বার্তা হলো—হাড়ের যত্ন কোনো নির্দিষ্ট বয়সে শুরু করার বিষয় নয়; এটি সারা জীবনের অভ্যাস। সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব। আসুন, নিজের ও পরিবারের হাড়ের যত্ন নিই এবং অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে সচেতন হই।
  • লেখক: চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট, ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত