 এলএনজি পাইপলাইন

অর্থ সাশ্রয়ী সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিন

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৩ এএম

দেশের মানুষ, শিল্প ও পরিবহন খাত বছরের পর বছর জ¦ালানি সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে গ্যাসের দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বড় অংশ আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সময়োচিত ও সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়েছে। জাহাজে আমদানি করা গ্যাস মূল ভূখ-ে আনতে সহায়ক হয়, এমন মাত্র দুটি সচল ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে বেসরকারি খাতে। ভবিষ্যতে গ্যাসের চাহিদা বাড়বে; একই সঙ্গে এ খাতে সংকট বাড়ার ঝুঁকিও আছে। এ ঝুঁকি সামাল দিতে সরকার আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে অন্তত ৩টি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে আরও ৩টি এলএনজি টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা করছে। শুধু টার্মিনাল হলেই কি সংকট মিটবে? বিদেশ থেকে কেনা গ্যাস টার্মিনাল থেকে মূলত রিগ্যাসিফিকেশন এবং উচ্চ-চাপের পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখন্ডে আনা হয়। কয়েকটি ধাপে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক ও আবাসিক সংযোগে গ্যাস যায়। বর্তমানে টার্মিনাল থেকে মূল ভূখন্ডে গ্যাস আনার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত পাইপলাইন নেই। একইসঙ্গে সাগরে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে সেই গ্যাস উপকূলে আনার জন্যও পর্যাপ্ত পাইপলাইন নেই। সব মিলিয়ে আমরা মনে করি, গ্যাসসহ সামগ্রিক জ্বালানি সংকট মেটাতে দ্রুত ও সাশ্রয়ী সিদ্ধান্ত দরকার। কঠোর অভিযানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা, গ্যাস প্রিপেইড মিটার স্থাপন, সীমিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তরলীকৃত গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রয়োজন এলএনজি অবকাঠামো শক্তিশালী করা, দেশে স্থলভাগ ও সাগরে বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানসহ দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের সুযোগ তৈরি ও কাজে লাগানো।

দেশ রূপান্তরে বুধবার প্রকাশিত ‘এলএনজি আমদানিতে নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পরিত্যক্ত সাঙ্গু’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রথম অফশোর গ্যাসক্ষেত্র সাঙ্গু থেকে সাগরতলের যে পাইপলাইনে উপকূলে গ্যাস আনা হতো, তা বর্তমানে পরিত্যক্ত থাকলেও আবার কাজে লাগানো যেতে পারে। সাঙ্গু থেকে গ্যাস তোলা আর সম্ভব না হওয়ায় সেখানকার প্ল্যাটফর্ম, সাগরের তলদেশ হয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত পাইপলাইন এবং অনশোর গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রটি ২০১৩ সাল থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সাঙ্গুতে যে প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, তার আশপাশে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপিত হলে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইনটির ব্যবহার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে দিতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সমাধান হিসেবে কাজে লাগতে পারে। সাঙ্গুর প্ল্যাটফর্মটি সাগরে ৫০ কিলোমিটার ভেতরে হওয়ায় এখানে এলএনজির বড় জাহাজ ভেড়ানো কঠিন নয় বলে মনে করা হয়। সব মিলিয়ে নতুন গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতা এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় এড়িয়ে সাশ্রয়ী উপায়ে বছরজুড়ে নিরাপদে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস স্থানান্তর হতে পারে। মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে গ্যাস গ্রিড আছে, তা দিয়ে এখন ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। নতুন টার্মিনাল হলেও এই সঞ্চালন লাইন দিয়ে আরও ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সম্ভব। এর চাইতে বেশি গ্যাস আমদানি করতে হলে তখন নতুন পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সাগর ও স্থলভাগ দুই জায়গায়ই নতুন পাইপলাইন করা ছাড়া গ্যাস আমদানি করে লাভ হবে না।

সাঙ্গুর পাইপলাইন ব্যবহারে সরাসরি উপকৃত হবে চট্টগ্রাম ও পাশর্^বর্তী অঞ্চলে অবস্থিত সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র। অনুকূল প্রতিক্রিয়া হিসেবে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুর অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে অন্যান্য ব্লকে গ্যাস আবিষ্কৃত হলেও দ্রুত উপকূলে গ্যাস আনার জন্য সাঙ্গুর পাইপলাইন ব্যবহৃত হতে পারে।

আমরা মনে করি, যেকোনো ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ ও জটিল নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে প্রতিটি পুরনো অবকাঠামো কাজে লাগানোর উপযোগিতা যাচাই করা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার এ ক্ষেত্রে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত