সৌদি-হুতি সংঘাত বিচ্ছিন্ন লড়াই নয়। এটি আধিপত্যবাদীর সর্বশেষ অধ্যায় যেখানে যুদ্ধ, বাণিজ্যপথ আর ভূ-রাজনীতির হিসাব একে অপরের সঙ্গে জট পাকিয়ে আছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যুদ্ধনীতি, পুরো অঞ্চলকে ধাপে ধাপে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সৌদি-নেতৃত্বাধীন জোট এবং হুতিদের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা এবং তীব্র নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। সম্মেলনটি আগামী ২৬-২৯ অক্টোবর রিয়াদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে এটি ২০২৭ সালে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, ‘খুব শিগগির’ নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে।
ইসরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়েছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর হামলায় দেশের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন। ইরান সমর্থকদের প্রশ্ন, কোন আইনে? যে বিশ্বব্যবস্থা নিজেকে ‘নিয়মভিত্তিক’ বলে দাবি করে, তার প্রধান রক্ষক সেই নিয়ম ভেঙেছে। তাদের মতে, এই দ্বিমুখী আচরণ পশ্চিমা নৈতিক অবস্থানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালিতে চাপ তৈরি করে, তেহরান যাকে আত্মরক্ষার ন্যূনতম উপায় হিসেবে দেখে। একের পর এক যুদ্ধবিরতি হয়েছে, আবার ভেঙেছে। এই পটভূমিতে হুতিরা ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আবার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া শুরু করে। হুতিরা বলছে, গাজা ও ইরানে আগ্রাসন চলবে আর ইয়েমেন চুপ থাকবে, এটা অস্বাভাবিক। ইয়েমেন বহু বছর নীরব মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে, অথচ তার কণ্ঠ কখনো আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে জায়গা পায়নি। গাজায় হামাসের সামরিক কাঠামো বিধ্বস্ত, লেবাননে হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব বিপর্যস্ত, সিরিয়া সরকারের পতন। এখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব আক্রান্ত। একের পর এক প্রতিরোধ-স্তম্ভ ভাঙার এই ধারাবাহিকতা কাকতালীয় নয়। ইরান ও তার মিত্রদের কাছে এটা অস্তিত্বের লড়াই। হুতিরা শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং তারা ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর একটি অন্যতম শরিক (যার মধ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহও রয়েছে)। ইরান হুতিদের আধুনিক ড্রোন, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণ সরবরাহ করে। ফলে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের বিরুদ্ধে হুতিরা প্রক্সি বা প্রতিনিধি হিসেবে আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করে।
হুতিদের সক্রিয়তা তেহরানের জন্য যেমন কৌশলগত বাস্তবতা, তেমনি একটি অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। গত আড়াই মাসে হুতিরা লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বন্দর মোখাসহ বিশাল এলাকা দখল করেছে। লক্ষ্য, বাব এল মান্দেব প্রণালির ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ। সেপ্টেম্বরে সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় হামলায় একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রিয়াদ ও খামিস মুশাইতের দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। বর্তমানে হুতিরা সানাসহ দেশের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই ঘটনাগুলোকে আলাদা করে দেখলে মনে হতে পারে, এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কিন্তু কারণ খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় সেই মূল প্ররোচনায়, যে আগ্রাসন গোটা অঞ্চলে ডমিনো প্রভাব তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালিতে চাপের কারণে সৌদি আরব তেল রপ্তানির বড় অংশ লোহিত সাগর পথে সরিয়েছে। বাব এল মান্দেব দিয়ে সৌদির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বহু গুণ বেড়েছে। কিন্তু জ্বালানির দাম, জাহাজভাড়া ও বীমার প্রিমিয়াম বেড়েছে, যার আঁচ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার, যাদের এই যুদ্ধে কোনো ভূমিকা নেই, তারা মাস শেষে বাড়তি খরচের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই সংকটের মূল্য দিচ্ছে বিশ্বের সাধারণ ভোক্তা, আর যুদ্ধের সূচনাকারী এবং নিয়ন্ত্রকরা দূরে বসে নিরাপদে। তেহরান বলেছে, আমেরিকা শর্ত মানলে তারা হরমুজ খুলে দেবে। এখানে দায়টা ওয়াশিংটনের, যে দেশ আগে হামলা চালিয়ে নেতা হত্যা করে আলোচনা ভেঙে সংকট বাড়িয়েছে, সমাধানের চাবি তার হাতে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে, অস্ত্র-ব্যবসায়ী ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। যারা অস্থিরতা বিক্রি করে ঘাঁটি গড়ে, আর নিরাপত্তা-ছাতার নামে বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা চাপিয়ে দেয়। আধিপত্যবাদী কাঠামোর সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। ইয়েমেনের বাস্তুচ্যুত পরিবার, সৌদি সীমান্ত শহরের বাসিন্দা, আর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাড়তি দামের বোঝা কাঁধে নেওয়া কোটি কোটি ভোক্তা। শরণার্থী শিবিরের শিশু জানে না, হরমুজ কোথায়। শুধু জানে, আজ রাতে তার খাবার জুটবে কি না। প্রশ্ন হলো, এই অস্থিরতার দায় কার? রিয়াদ যত বিদেশি নিরাপত্তা-অংশীদারত্বে ঝুঁকছে, দীর্ঘমেয়াদে ততই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তাদের কমবে। হরমুজ ও বাব এল মান্দেব একসঙ্গে অস্থির থাকা মানে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর অদৃশ্য লাগাম, যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বহিঃশক্তির প্রভাব আরও পাকাপোক্ত হয়। এই অর্থে সংকট যতটা না সৌদি বনাম হুতির, তার চেয়ে অনেক বেশি এই অঞ্চলের স্বাধীনতা বনাম বাইরের নিয়ন্ত্রণের। সমস্যা উত্তরণে দরকার কার্যকর যুদ্ধবিরতি ও মানবিক করিডর, তারপর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হুতি, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সমাধান টেকে না। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বদলে, প্রকৃত মধ্যস্থতাকারী শক্তি হতে হবে। শান্তি কোনো উপহার নয়, এটি সচেতন সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্ত সময় ফুরানোর আগেই নিতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট, শিক্ষক ও গবেষক