বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক দিক হলো, ভারত-চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, শুধু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় পৌনে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, প্রতি ডলার রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করছে প্রায় ৬ ডলারের পণ্য। চীনের সঙ্গেও চিত্র ভিন্ন নয়। বাংলাদেশের আমদানির শীর্ষ উৎস চীন, আর রপ্তানি অতি নগণ্য। জাতীয় সংসদে সাম্প্রতিক আলোচনার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঘাটতি দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে ১১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। পরবর্তী দুই অর্থবছরে কিছুটা কমে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার ও ৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও বেড়ে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি সর্বাধিক। চীনের সঙ্গেও বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিনের। প্রতি অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যেখানে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বড়জোর দেড় বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পর্যন্ত ঘাটতি প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল ঘাটতি কেবল পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এর পেছনে আমাদের নিজস্ব কিছু কাঠামোগত ব্যর্থতা রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট ও হিমায়িত খাদ্যে সীমাবদ্ধ। ভারত-চীনে রপ্তানিযোগ্য উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস বা প্রকৌশল পণ্যের সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। শিল্পায়ন মূলত কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এবং ভারত ও চীনের বিকল্প উৎস তৈরি করতে না পারায় এই ঘাটতি অনিবার্য। এর সঙ্গে বেসরকারি খাতের স্বদেশে শিল্প সৃষ্টি বা নিজ দেশের পণ্যের পৃষ্ঠপোষকতা না করে ক্রমবর্ধমান আমদানি করার মানসিকতা ঘাটতি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে, যা টাকার মান ও মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে না পারার পেছনে শুধু নিজস্ব ব্যর্থতা নয়, ভারত ও চীনের নীতি-নির্ধারিত বাধাও দায়ী। ভারত তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, রাবার, প্লাস্টিক ও কাঠের আসবাবসহ বেশ কিছু বাংলাদেশি পণ্যের স্থলবন্দরে প্রবেশে কড়াকড়ি বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৪২ শতাংশ প্রভাবিত করছে। অথচ ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করে না। অথচ বাংলাদেশের পণ্যে ভারতের কাস্টমস ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্র্তৃপক্ষ অতিরিক্ত পরীক্ষা ও সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করে, যা সময় ও খরচ বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র করে। তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতের ট্রানজিট সুবিধা প্রত্যাহারের ফলে দেশের রপ্তানি কমেছে। অন্যদিকে, এমনিতেই চীনা বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত। তার ওপর চীন বাংলাদেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘ কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় শিল্প সংরক্ষণের নীতির নামে। অথচ এই চীনই বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক এবং মুক্তবাণিজ্যের নবতর প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে দাবি করে। কিন্তু নিজের বাজারে ছোট প্রতিবেশীদের জন্য সেই দরজা প্রায় বন্ধ করে দেয়। চিত্রটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ভারত-চীনের রক্ষণশীলতা মূলত শক্তির অসমতাকে কাজে লাগিয়ে দুর্বল দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল।
দুর্ভাগ্যজনক হলো, ভারত-চীনের বাণিজ্য কৌশল মোকাবিলায় বাংলাদেশের পক্ষের অবস্থান অনেকটা নমনীয় এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ভূমিকা সুবিধাবাদী যা দরকষাকষির টেবিলে বসার আগে আত্মসমর্পণের পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ জন্য ভারতের সঙ্গে বারবার বৈঠক করেও, অশুল্ক বাধা দূরীকরণ ও ট্রানজিট সুবিধায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। চীনের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক থাকলেও, সেখানে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার বাড়ে না। উৎপাদনগত দুর্বলতার পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের রাজনৈতিক স্বার্থ এবং ব্যক্তিস্বার্থের মানসিকতা বাংলাদেশকে আলোচনার টেবিলে দুর্বল করে। অথচ ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া তুলনামূলক অসম ক্ষমতার সম্পর্কেও কঠোর দরকষাকষির মাধ্যমে রপ্তানি স্বার্থ এগিয়ে নিয়েছে। এই নীতিগত দেউলিয়াত্বের তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’। নির্বাচিত সংসদের আলোচনার বাইরে সম্পাদিত চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ১৭৯টি বাধ্যবাধকতার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি তুলনামূলকভাবে নগণ্য। অত্যন্ত দামি বোয়িং বিমান কেনা, নির্দিষ্ট সময়ে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি আমদানি, কৃষিবিষয়ক পণ্যে বাধ্যবাধকতা এবং ভূ-রাজনৈতিক শর্তের সংযোগ থাকায় সংগত কারণে চুক্তিটির অর্থনৈতিক ও সার্বভৌমত্বগত তাৎপর্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিআইডিএস, টিআইবি ও সিপিডির আলোচনায় উঠে আসা বাণিজ্যিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তারুণ্যের জনমিতিক সুবিধাকে উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতায় রূপান্তর করতে হলে, আত্মসমর্পণমূলক কূটনীতি ভাঙতে হবে। রাষ্ট্রের স্বার্থের বদলে ক্ষমতাবানদের সুবিধা রক্ষার প্রবণতা দেশপ্রেমের ঘাটতি নয়, এটি অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী নীতি।
ভারত-চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি এবং এর পেছনে বাংলাদেশের কাঠামোগত ব্যর্থতা, আমলাতান্ত্রিক মেরুদণ্ডহীনতা ও স্বার্থান্বেষী আচরণকে বিভিন্ন শাস্ত্রের প্রভাবশালী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে বহুমাত্রিক চিত্র স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কশাস্ত্রে কেনেথ ওয়াল্টজের ‘নিওরিয়ালিজম’ ও হ্যান্স মর্গেনথাউয়ের ‘রিয়ালিজম’ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নৈরাজ্যিক এবং শক্তির বণ্টন রাষ্ট্রের আচরণ নির্ধারণ করে। ভারত ও চীন আঞ্চলিক হেজেমন হিসেবে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও শক্তি সর্বাধিকায়নের লক্ষ্যে দুর্বল প্রতিবেশীর প্রতি অশুল্ক বাধা, মান নিয়ন্ত্রণ ও ট্রানজিট প্রত্যাহারের মতো রক্ষণশীল কৌশল প্রয়োগ করে, যা জোসেফ নাইয়ের ‘সফট পাওয়ার’ তত্ত্বের বিপরীতে তাদের প্রকৃত আচরণকে উন্মোচিত করে। অর্থনীতিশাস্ত্রে রাউল প্রেবিশ ও আন্দ্রে গান্ডার ফ্রাঙ্কের ‘ডিপেন্ডেন্সি থিওরি’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ পেরিফেরিতে থাকায় তার রপ্তানি নিম্নমূল্যের আর আমদানি উচ্চমূল্যের এই অসম বিনিময়ই কোর-পেরিফেরি শোষণের ক্লাসিক উদাহরণ, যা ডেভিড রিকার্ডোর ‘তুলনামূলক সুবিধার তত্ত্ব’কে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কারণ পল ক্রুগম্যানের ‘স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড পলিসি’ তত্ত্ব বলে, রাষ্ট্র নিজ শিল্প রক্ষায় হস্তক্ষেপ করলে মুক্তবাণিজ্যের তাত্ত্বিক লাভ বাস্তবে ব্যাহত হয়। অর্থনীতিশাস্ত্রে ডগলাস নর্থের ‘নিউ ইনস্টিটিউশনাল ইকোনমি’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তিগুলোতে এনফোর্সমেন্ট মেকানিজম দুর্বল হওয়ায় ট্রানজ্যাকশন কস্ট বেড়ে যায় এবং সুবিধা আদায় ব্যর্থ হয়। অর্থনীতিশাস্ত্রে জেমস বুকাননের ‘পাবলিক চয়েস থিওরি’ ও অ্যান ক্রুগারের ‘রেন্ট-সিকিং তত্ত্ব’ ব্যাখ্যা করে আমলারা ব্যক্তিগত সুবিধা সর্বাধিকায়নের জন্য কঠোর দরকষাকষি এড়িয়ে যান, আর ব্যবস্থাপনাশাস্ত্রে মাইকেল জেনসেন ও উইলিয়াম মেকলিংয়ের ‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট থিওরি’ ও ডোনাল্ড ক্রেসির ‘ফ্রড ট্রায়াঙ্গল’ বলে নাগরিক ও আমলার স্বার্থবিরোধ, চাপ-সুযোগ-ন্যায্যতা মিলে দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানশাস্ত্রে গ্রাহাম অ্যালিসনের ‘ব্যুরোক্রেটিক পলিটিক্স মডেল’ ও সি. রাইট মিলসের ‘এলিট থিওরি’ দ্বারা আরও পুষ্ট হয়। অর্থাৎ, নীতিনির্ধারণে আমলাতান্ত্রিক অভিজাতদের স্বার্থ প্রাধান্য পায়। সমাজবিজ্ঞানশাস্ত্রে জর্জ হোম্যানস ও পিটার ব্লাউয়ের ‘সোশ্যাল এক্সচেঞ্জ থিওরি’ অনুযায়ী, আমলা-ব্যবসায়ী-বিদেশি পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সুবিধা বিনিময়ের নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানশাস্ত্রের আলোকে বাংলাদেশের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য, বিশেষত আমদানি-রপ্তানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। লিওন ফেস্টিঙ্গারের ‘কগনিটিভ ডিসোন্যান্স থিওরি’র মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের পর আমলারা মানসিক দ্বন্দ্ব এড়াতে নিজেদের আচরণকে ‘বাস্তববাদী কূটনীতি’ বলে যৌক্তিকীকরণ করেন। মূলত বাংলাদেশের রপ্তানি ঘাটতির সংকট কেবল বাহ্যিক বাধা বা চাপ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, আমলাতন্ত্রের স্বার্থপরতা ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাব এবং ব্যবসায়ীদের লোভাতুর মানসিকতা। যা বহুশাস্ত্রীয় তত্ত্বের সম্মিলিত বিশ্লেষণে স্পষ্টত প্রমাণ হয়।
ভারত-চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি যেমন বাংলাদেশের রপ্তানি বৈচিত্র্যহীনতা ও শিল্পসক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ফল, তেমনি ভারত-চীনের রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতির প্রতিফলন। বাংলাদেশের দরকষাকষির ব্যর্থতা শুধু কূটনৈতিক-প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব নয় এটি কাঠামোগত নির্ভরশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ ও মনস্তাত্ত্বিক আত্মসমর্পণের ফল। যতদিন না বাংলাদেশে বিকল্প বাজার ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, ততদিন দরকষাকষির শক্তি শূন্যতেই আটকে থাকবে। এই সুযোগে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করবে।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়