যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন স্তরের ঝুঁকি, আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের দেয়াল মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দূরত্বের হিসেবে প্রায় ছয় হাজার মাইল দূরে বসে ইরানের নেতারা এখন প্রায় নিশ্চিত যে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর গত ১৬ মাসের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো বড় ধরনের আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, তেহরানকে আমেরিকার সমস্ত শর্তের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য করাই এই সম্ভাব্য হামলার মূল লক্ষ্য। খবর নিউ ইয়র্ক টাইমস।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হামলার একটি বিশাল ছক চূড়ান্ত বা ‘উন্নত পর্যায়ে’ নিয়ে গেছে ইরান।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এক অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক ধাপে এসে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া রাজনৈতিক হিসাব, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং সংঘাতের সুযোগ নিয়ে দুপক্ষের আড়ালে অজুহাত খোঁজার প্রবণতা—সব মিলিয়ে সেখানে এখন চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবেই একটি ছোট সংঘাত শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বিধ্বংসী যুদ্ধে রূপ নেয়।
একজন জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যে ইরানের যে পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে- যেখানে নিজ দেশে ও বিদেশে মার্কিনদের ওপর হামলার সুনির্দিষ্ট ছক রয়েছে—তা যদি সত্যি হয়, তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে চালানো একটিমাত্র গুলি বা একটি সাধারণ ভুল বিস্ফোরণই মুহূর্তের মধ্যে পুরো অঞ্চলে আগুনের দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারে। এমনকি ইরানি নেতাদের বাংকারের কাছাকাছি কোনো একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট বোমার বিস্ফোরণও এই সংঘাতকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতেই দেশটির শীর্ষ নেতাদের এক হামলায় হারিয়েও বর্তমান ইরানি প্রশাসন কোনোমতে টিকে আছে।
এই জটিল সামরিক হিসাব-নিকাশের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের মুখোমুখি, যা তাদের দেশের ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিতে পারে। নেতানিয়াহু যদি আগামী মঙ্গলবারের নির্বাচনে হেরেও যান, তবুও তিনি ক্ষমতা ছাড়ার আগে শেষ একটি বড় হামলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; যা হয়তো তার পরবর্তী উত্তরসূরি করতে দ্বিধা করতেন। ঠিক একইভাবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব ভালো করেই জানেন যে নিজ দেশের কট্টর সমর্থকদের কাছেও এই যুদ্ধ অত্যন্ত অপ্রিয়। তাই সেনাপতি বা ‘কমান্ডার ইন চিফ’ হিসেবে নিজের পূর্ণ ক্ষমতা প্রকাশ করতে এবং নিজের অবস্থান শক্তিশালী দেখাতে তিনি বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইতে পারেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের চরম সংকটময় মুহূর্তগুলোতে—যেমন কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট বা ইরাক আক্রমণের সিদ্ধান্ত—ভুল ও আংশিক গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রতিপক্ষের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে না পারা মারাত্মক ও প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে এনেছে। বিশেষ করে ইরাক আক্রমণ একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে আছে, যেখানে বাছাইকৃত ও পক্ষপাতদুষ্ট গোয়েন্দা তথ্যকে সামরিক অভিযানের মূল বাহানা বা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, তাদের সাম্প্রতিকতম গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মাটিতে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যার পরিকল্পনা করছে তেহরান। বিশ্বজুড়ে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস থাকা ইরানের এলিট সামরিক বাহিনী ‘ইউনিট ৮৪০’ দীর্ঘদিন ধরেই এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছে। তবে ইতিহাস বলে, ইরানের ইচ্ছার সাথে তাদের প্রকৃত সক্ষমতার বহু তফাত রয়েছে। অতীতে তারা একাধিকবার পেশাদার নয় এমন আনাড়ি ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করেছিল, যারা চূড়ান্ত অঘটন ঘটানোর আগেই ধরা পড়ে যায়।
তা সত্ত্বেও এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বর্তমান আতঙ্ক কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, বরং তা অতীত অভিজ্ঞতার তিক্ত বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন যে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি নতুন করে বড় আক্রমণ করবেন না, তবে একই সাথে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নির্বাচনের পর যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প গোপনে ইরানের ভেতরে আরও এক দফায় বড় ধরনের শক্তিশালী বিমান হামলা চালানোর দিকেই ঝুঁকে আছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড-এর তৈরি করা পরিকল্পনায় বোমাবর্ষণের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা আরও বড় করা হয়েছে, যার মধ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো এবং অর্থনীতি ও বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি এমন সব গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ট্রাম্পের কড়া সুরের সাথে তাল মিলিয়ে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুঙ্কার দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ইরান তার শত্রুদের চমকে দিয়ে অপ্রত্যাশীত হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাদের সামনে ‘কোনো লাল রেখা বা সীমা’ থাকবে না।
ক্রমবর্ধমান হুমকি ও গোপন গোয়েন্দা তথ্য
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই ধরনের গোয়েন্দা তথ্যের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত ব্রিটেনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে (যেটি মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে) ইরানি হামলার চক্রান্ত ফাঁস হওয়ার পর থেকেই গোয়েন্দারা সতর্ক হন।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পর্যালোচনা করা সেই গোপন তথ্যে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি পুনরায় আঘাত হানে, তবে তার জবাবে ইরান কীভাবে বিশ্বজুড়ে পরিকল্পিতভাবে হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের হত্যা করবে এবং পূর্বে মার্কিন হামলার জবাবে কী ধরনের ধ্বংসাত্মক প্রতিশোধ নেবে, তার সুনির্দিষ্ট নীলনকশা সাজানো হয়েছে।
তবে এই সমস্ত গোয়েন্দা তথ্য অতিমাত্রায় শ্রেণীবদ্ধ বা গোপন হওয়ার কারণে সাধারণ বা বাইরের পর্যবেক্ষণ থেকে এর সত্যতা শতভাগ যাচাই করা বেশ কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্যাং অব এইট’ নামে পরিচিত সবচেয়ে প্রবীণ আইনপ্রণেতাদের ছাড়া আর কাউকেই গত শুক্রবারে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টর জে ক্লেটনের চিঠি প্রকাশ পাওয়ার আগে ব্রিফ করা হয়নি। এমনকি হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা নিজে থেকেই এটি নিয়ে ধাঁধায় পড়েছেন যে, যখন নির্দিষ্ট কোনো চক্রান্তের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ বা আলোচনা করা সম্ভব নয়, তখন ট্রাম্প প্রশাসন কেন এই ধরনের কঠোর সতর্কতামূলক চিঠি প্রকাশ্যে আনল!
যুদ্ধ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা প্রকাশ্যে যা বলছেন, আর অন্তরালে সামরিক গোয়েন্দারা যে তথ্য পাচ্ছেন—তার মধ্যে বিরাট ফারাক রয়েছে। উপরন্তু, হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগনের শীর্ষ নেতৃত্ব গত কয়েক মাসের মধ্যে যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন বা ব্রিফিং করেনি। ট্রাম্প সবকিছু গোপন রাখতে পছন্দ করেন, কিন্তু এই গোপনীয়তা যুদ্ধের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবুও, গোয়েন্দা মূল্যায়নের সারমর্ম হলো—ইরানের বেশ কিছু পরিকল্পিত হামলা এখন কেবল ‘আকাঙ্ক্ষার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বাস্তবায়নের বা ‘কার্যকরী প্রক্রিয়ার’ দিকে সরাসরি এগিয়ে গেছে। পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা চলতি মাসের শুরুর দিকে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ‘আরএএফ ফেয়ারফোর্ড’ ঘাঁটিতে ইরানি হামলার সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সেখানে মার্কিন বাহিনীর এক ডজন ‘বি-১ সিক্সটি’ বোমারু বিমান মোতায়েন ছিল। হুমকির মুখে বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হলে ইরানি কর্মকর্তারা পরিষ্কার জানান, এই বিমানগুলো আবার ফিরে আসলে তাকে সরাসরি ‘আসন্ন হামলার সংকেত’ হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।
গত শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি খুব শিগগিরই ইরানে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নেবেন কি না সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। ট্রাম্পকে নিয়মিত এই গোয়েন্দা আপডেট দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক কর্মকর্তা বলছেন যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পাওয়া যেকোনো সতর্কবার্তার চেয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
এমন প্রমাণের অস্তিত্ব রয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইরানের এমন কিছু নেটওয়ার্ক ও এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে যারা কেবল সাধারণ ইরানি নাগরিক নয়। তবে তারা আমেরিকা থেকে সরাসরি কতটা বড় হামলা চালাতে সক্ষম, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ ইরানি কর্মকর্তারা প্রায়শই তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের সময় বিদেশে গোপন হামলা চালানোর সক্ষমতাকে বাস্তবে যা আছে তার চেয়ে বহু গুণ বাড়িয়ে বাড়িয়ে প্রচার করে থাকেন।
তা সত্ত্বেও ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিত্বদের দমনে পেশাদার অপরাধী ও ভাড়াটে ঘাতক জোগাড় করায় ইরানের পুরোনো নামডাক রয়েছে। মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, সুনির্দিষ্ট কোনো হামলা সফল হবে কি না তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে তারা যে অপরাধীকে চুক্তি দিয়ে পাঠাচ্ছে তার কার্যক্ষমতা ও পেশাদারিত্বের ওপর।
২০২৪ সালের সেই ভীতি ও পুরোনো স্মৃতি
ওয়াশিংটনের জন্য এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ট্রাম্প ও তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রকৃত হুমকি এবং হত্যাচেষ্টার নানা দৃশ্যপট ২০২৪ সালের পুরো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাজুড়ে এক চরম আতঙ্ক ও মানসিক অস্থিরতার আবহ তৈরি করেছিল।
ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার চার বছরে এই হুমকিগুলো ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। এর মূল উৎস ছিল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের নিজস্ব আদেশে পরিচালিত হামলা, যাতে ইরানের অভিজাত কুদ্স ফোর্স-এর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই ইরান ট্রাম্পের পেছনে হাত ধুয়ে নেমেছিল।
তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনও ট্রাম্পের ওপর ইরানের ক্রমাগত হুমকি পর্যবেক্ষণ করছিল। যার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১২ জুলাই এফবিআই এক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, সে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডের নির্দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার জন্য নির্দিষ্ট চুক্তি বা ‘মার্ডার-ফর-হায়ার’ প্লট বাস্তবায়ন করছিল।
এর ঠিক একদিন পরেই, ১৩ জুলাই পেনসিলভানিয়ার বাটলার নামক স্থানে ট্রাম্পের এক উন্মুক্ত নির্বাচনী জনসভায় বাইডেন প্রশাসনের গোয়েন্দারা আগে থেকেই একটি বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট ইরানি হুমকির তথ্য পেয়ে সেখানে কাউন্টার-স্নাইপার মোতায়েন করেছিলেন। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর থমাস ম্যাথিউ ক্রুকস নামের এক তরুণ প্রকাশ্যে গুলি চালায় এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্নাইপারের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। পরবর্তীতে তদন্তকারীরা জানান, ক্রুকস একাই এটি করেছিল এবং বিদেশি কোনো চক্রান্তের সাথে তার সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
তবে পর পর ঘটে যাওয়া এসব অঘটন—এবং তার সাথে ট্রাম্পের প্রচার দলের ইমেইল হ্যাক হওয়ার ঘটনা (যা ইরান করেছিল বলে সন্দেহ করা হয়)—ট্রাম্প ক্যাম্পের ভেতরে দিনরাত তীব্র ভীতি ও সংশয় ছড়িয়ে দিয়েছিল। সে সময় পরিস্থিতি এতটাই সংবেদনশীল ছিল যে কিছু ঘটনা হাস্যকর রূপও নিয়েছিল। যেমন, দক্ষিণ ফ্লোরিডায় ক্যাম্পেইনের মূল কার্যালয়ে একটি ছোট্ট অপরিচিত বস্তু পাওয়ার পর অমঙ্গল আশঙ্কায় ৯১১-এ ফোন দেওয়া হয়, সবাই ভেবেছিল এটি হয়তো ইরানিদের আড়িপাতার যন্ত্র। পরে দেখা যায়, এটি স্রেফ ইন্টারনেটে কেনা একটি সাধারণ খেলনা ডিভাইস, যা ক্যাম্পেইনের ভেতরের কেউ রসিকতা করে রেখে দিয়েছিল!
এখনো ট্রাম্পের নিরাপত্তা দল প্রতিনিয়ত আসা শত শত হুমকি পর্যালোচনা করছে, যার মধ্যে হোয়াইট হাউসের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও রয়েছেন। ইরানি গোয়েন্দাদের আড়িপাতা সংকেত বা বার্তালাপের মধ্যে যেসব মার্কিন কর্মকর্তার নাম উঠে আসছে, গোয়েন্দারা সেগুলোকে মারাত্মক গুরুত্ব সহকারে ট্রাম্পের টেবিলে উপস্থাপন করছেন।
ইরানের পাল্টা প্রস্তুতি ও হুমকির নতুন বার্তা
অন্যদিকে, ইরানের সামরিক কর্তারা মনে করেন যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির আক্রমণের পর তাদের নেওয়া সবচেয়ে দূরদর্শী ও সফল পদক্ষেপ ছিল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়ানো মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একযোগে আক্রমণ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সোজা ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেওয়া। তাদের এই আকস্মিক পদক্ষেপ মার্কিন কর্মকর্তাদের পুরোপুরি অপ্রস্তুত ও হতবাক করে দিয়েছিল।
ইরান এখন এটি কোনোভাবেই গোপন করছে না যে, তৃতীয় রাউন্ডের যুদ্ধ শুরু হলে তারা এই যুদ্ধের পরিধি শুধু সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ রাখবে না, বরং বহুদূর ছড়িয়ে দেবে। প্রকাশ্য বিবৃতিতে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা হুমকি দিয়েছেন যে, নতুন যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকার সাধারণ ও বেসামরিক অবকাঠামো, মূল জ্বালানি কেন্দ্র এবং সাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া যে অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও বৈশ্বিক যোগাযোগ চলে—সেগুলোকেও বোমার লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরানের দু’জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা- যাদের একজন রেভোলিউশনারি গার্ডের প্রভাবশালী সদস্য শনিবার এক সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের পরবর্তী টার্গেটের তালিকায় মার্কিন কূটনীতিক ও সেখানে কর্মরত সাধারণ কর্মীরাও রয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই কর্মকর্তা মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সেই রিপোর্টের সত্যতা স্বীকার করেছেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে ইরান আমেরিকানদের টার্গেট করার পরিকল্পনা করছে।
তারা তাদের এই কঠিন রক্তক্ষয়ী পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইরানের বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার-পরিজনকে হত্যা করেছে। তাই তাদের দৃষ্টিতে এখন যেকোনো মার্কিন নাগরিক বা কর্মকর্তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো সম্পূর্ণ ‘ন্যায্য ও বৈধ’। তবে পৃথিবীর অপর প্রান্তে গিয়ে এই হুমকি বাস্তবায়ন করার মতো সক্ষমতা ইরানের বাস্তবে আছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ ১৯৮০-র দশকে ইরানি বিপ্লবের শুরুর দিকে তারা যেভাবে বিদেশে থাকা রাজনৈতিক বিরোধীদের হত্যা করত, সেই তুলনায় বর্তমানে তাদের সেই সক্ষমতা ও সাফল্যের হার লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মূল প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের শীর্ষ উপদেষ্টা মেহেদী মোহাম্মদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে পরিষ্কার জানান যে, ইরান আসন্ন এই যুদ্ধকে তাদের টিকে থাকার লড়াই বা ‘অস্তিত্বের যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছে।
মেহেদী মোহাম্মদী বলেন, ‘আমরা এখন যুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ সারপ্রাইজ বা চমকপ্রদ ধাপে প্রবেশ করেছি। আমরা কোনো চিরাচরিত বা রীতিনীতি মেনে চলা ক্লাসিক্যাল যুদ্ধ লড়াই করব না। এটি হবে একটি চরম অসম, ভয়াবহ ও নির্ণায়ক যুদ্ধ—যেখানে সরাসরি শত্রুর সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা এবং তাদের সবচেয়ে দুর্বল বিন্দুগুলোকে একযোগে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।’
মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলার ছক, গোয়েন্দা সতর্কতা
ইরানে হামলা অথবা সমঝোতার ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প