আর প্রয়োজন নেই টিন সার্টিফিকেট? যেভাবে বাতিলের আবেদন করবেন

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

বিভিন্ন ব্যক্তিগত, আর্থিক ও দাপ্তরিক প্রয়োজনে অনেকেই করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বা টিন সার্টিফিকেট নিবন্ধন করেন। তবে সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে কেউ কেউ এই নিবন্ধন বাতিল করতে চান। কিন্তু টিআইএন চালু থাকলে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আছে কি না, তা নিয়ে অনেকে অনিশ্চয়তায় ভোগেন।

নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে টিআইএন বাতিলের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য জানতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে আবেদন করা যায়, কীভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হয় এবং বাতিলের পরও কোনো কর-সংক্রান্ত দায় থেকে যায় কি না।

টিআইএন কেন প্রয়োজন?

ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন হলো করদাতার পরিচিতি শনাক্ত করার একটি স্বতন্ত্র নম্বর। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে এটি ব্যবহৃত হয়। আয়কর নথি সংরক্ষণ, রিটার্ন দাখিল এবং বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক কাজে টিআইএনের প্রয়োজন হতে পারে।

ব্যাংকিং কার্যক্রম, ভিসার আবেদন, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজনে অনেকে টিআইএন নিবন্ধন করেন। পরে সেই প্রয়োজন না থাকলেও নিবন্ধন সক্রিয় থাকায় কর-সংক্রান্ত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

তবে টিআইএন থাকলেই প্রত্যেককে একই হারে কর দিতে হয় না। করযোগ্য আয়, সম্পদ এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী করদাতার দায়িত্ব নির্ধারিত হয়। তাই টিআইএন আর প্রয়োজন নেই মনে করে রিটার্ন দাখিল বন্ধ করার আগে নিজের আইনগত বাধ্যবাধকতা যাচাই করা জরুরি।

কোন পরিস্থিতিতে টিআইএন বাতিলের আবেদন করা যায়?

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনগত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে টিআইএন বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে। যেমন—

১. ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে: কোনো ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে এবং সংশ্লিষ্ট টিআইএন আর প্রয়োজন না হলে বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠানের বকেয়া কর বা অন্যান্য দায় থাকলে সেগুলো নিষ্পত্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

২. একই ব্যক্তির একাধিক টিআইএন থাকলে: ভুলবশত একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক টিআইএন নিবন্ধিত হলে প্রয়োজনীয় নম্বরটি রেখে অতিরিক্ত নম্বর বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।

৩. টিআইএন ব্যবহারের প্রয়োজন শেষ হলে: কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য টিআইএন নেওয়ার পর সেটির আর প্রয়োজন না থাকলে এবং আইনগত শর্ত পূরণ হলে বাতিলের আবেদন বিবেচনা করা হতে পারে।

৪. করযোগ্য আয় না থাকলে: আয় করযোগ্য সীমার নিচে নেমে গেলে নির্দিষ্ট শর্তে টিআইএন বাতিলের সুযোগ থাকতে পারে। তবে আয় কমে যাওয়া বা করযোগ্য আয় না থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিআইএন বাতিল হয় না।

৫. দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করলে: কোনো বাংলাদেশি নাগরিক দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকলে এবং দেশে টিআইএন রাখার আইনগত প্রয়োজন না থাকলে তাঁর পরিস্থিতি অনুযায়ী আবেদন বিবেচনা করা হতে পারে। শুধু বিদেশে অবস্থান করাই বাতিলের জন্য যথেষ্ট নয়।

৬. করদাতার মৃত্যু হলে: কোনো টিআইএনধারীর মৃত্যু হলে তাঁর নিবন্ধন বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের প্রয়োজনীয় নথিসহ সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। মৃত ব্যক্তির নামে ব্যবসা বা অন্য কার্যক্রম চলমান থাকলে সংশ্লিষ্ট কর ও আইনগত বিষয়গুলোও যাচাই করা জরুরি।

যেভাবে টিআইএন বাতিলের আবেদন করবেন

টিআইএন বাতিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। আবেদনের পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নথি করদাতার পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

অনলাইনে আবেদনের নিয়ম

প্রথমে এনবিআরের ওয়েবসাইটে গিয়ে টিআইএন-সংক্রান্ত সেবা এবং বাতিলের আবেদনের বর্তমান নিয়ম জেনে নিতে হবে। ওয়েবসাইট: https://nbr.gov.bd/

অনলাইনে এ ধরনের আবেদন করার সুবিধা থাকলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। আবেদনে সাধারণত টিআইএন নম্বর, ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি, নিবন্ধন বাতিলের কারণ এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য দিতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক নথিও জমা দিতে হতে পারে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত নথি বা ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত টিআইএন বাতিল হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

সরাসরি আবেদন করতে চাইলে

অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা কর কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে আবেদনপদ্ধতি জেনে নেওয়া যেতে পারে।

পরিস্থিতি অনুযায়ী যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলো হলো—

টিআইএন সনদ বা নম্বরের প্রমাণ;

জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি;

ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রমাণপত্র, যদি প্রযোজ্য হয়;

টিআইএন বাতিলের কারণের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি;

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র।

কিছু ক্ষেত্রে আগের অর্থবছরগুলোর আয়কর রিটার্নের তথ্য বা প্রমাণও চাওয়া হতে পারে। তবে সবার জন্য একই সংখ্যক বছরের শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে প্রয়োজনীয় নথির তালিকা নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।

টিআইএন বাতিল হলে কী হবে?

আবেদন অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অনুমোদন বা বাতিলের প্রমাণপত্রও সংগ্রহ করা উচিত।

তবে টিআইএন বাতিল হলেই আগের সব কর-সংক্রান্ত দায় বা বকেয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। বাতিলের আগের সময়ের বকেয়া কর, রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কিংবা অন্য কোনো আইনগত দায় থাকলে তা নিষ্পত্তি করতে হতে পারে।

ভবিষ্যতে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না, তা প্রযোজ্য আইন ও করদাতার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। একইভাবে, পরে আবার টিআইএন প্রয়োজন হলে পুরোনো নম্বর পুনরায় ব্যবহার করা যাবে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

তাই শুধু আয়কর রিটার্ন দাখিলের ঝামেলা এড়াতে তাড়াহুড়ো করে টিআইএন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। নিজের বর্তমান আয়, সম্পদ, ব্যবসা এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত