খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা, বিগত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হওয়া এবং পরীক্ষা চলাকালীন দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার প্রভাব, কোথাও কোথাও বন্যাকবলিত এলাকায় পরীক্ষা গ্রহণ সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিশেষ করে এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এইচএসসির ফল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার প্রকাশিত হতে যাওয়া ফলাফলে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে আলোচনা এখন চলছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পরীক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়ছে। এ ছাড়া উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নেরও সুযোগ রাখা হয়েছে, একই সঙ্গে মূল্যায়নে অযথা কঠোরতা পরিহারের কথাও বলা হয়। তবে নির্ধারিত মানদ- অনুসরণ করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য নম্বর নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রাখা কতটা সম্ভব হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কেটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কারণে একটা বড় সময় তারা ক্লাসে অনুপস্থিত ও অমনোযোগী ছিলেন। এর ফলে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি শেষ করা, নিয়মিত ক্লাস করা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির ওপর কতটা পড়েছে, তা ফলাফল বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পাঠদান পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাসের সুযোগ কতটা ছিল, তা পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার মতো ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মনোজগতেও প্রভাব পড়েছে।
তারা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষকদের কর্মস্থলে লাগাতার অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মবের ভয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক শিক্ষক কলেজে যেতে পারেননি। কোনো কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে পাঠদান ব্যাহত হয় এবং তার প্রভাবও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে পড়তে পারে, ফলে ফলাফল খারাপ হতে পারে।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বন্যা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন কয়েকটি জেলার পরীক্ষা বন্যার কারণে স্থগিত ও পুনর্নির্ধারণ করতে হয়। অন্যান্য অঞ্চলেও ভারী বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াতে ভোগান্তির খবর পাওয়া যায়। বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, নিয়মিত পড়াশোনা এবং পরীক্ষার আগে পুনরায় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ কতটা ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালে সর্বশেষ যে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয় সেখানে ফলাফলে ধস নেমেছিল। দুই দশকের মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় সবচেয়ে কম পাসের হারের রেকর্ড গড়ে। ২০২৫ সালে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ১২, যা ২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ পয়েন্ট কম এবং গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ফলাফল। ২০২৫ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বিপুল পরিমাণে কমেছিল।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু তাহের দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার পরীক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নির্র্ভুলভাবে খাতা মূল্যায়ন করতে। তাড়াহুড়া করে ভুল মার্কিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। যার যা নম্বর প্রাপ্য তাকে তাই দেওয়া হবে, কম বা বেশি নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফলাফল কমবে না বাড়বে তাতে শিক্ষার মানের কোনো হেরফের হবে না। স্বাভাবিকভাবে সরকারের যে অবস্থান তাতে আগের সরকারের তুলনায় রেজাল্ট কমবে ধরে নেওয়া যায়। তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক জায়গায় হাত দিতে হবে। আমরা যে নম্বর দিচ্ছি তার মূল্যায়নের একটা মানদন্ড ঠিক করতে হবে।