এলডিসি উত্তরণে সময় বাড়ল, করণীয় কী!

‘২০১৮ সালে সিডিপি প্রথম সুপারিশ করে বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করতে। ওই সময়ের মধ্যে উত্তরণের প্রস্তুতি তো দূরে থাক; বরং উল্টো পথে হেটেছে বাংলাদেশ’ -ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট, বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়।

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা, বৈদেশিক ঋণের সুদসহ আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে সরকার বাড়তি সময় পেল। তবে এই সময়কে কাজে লাগাতে না পারলে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতির ক্ষত ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি
২০১০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬–৭ শতাংশ অর্জন করায় বাংলাদেশ বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতি বা ইমার্জিং ইকোনোমির খেতাব পায়। কিন্ত ব্যাংক খাতে বড় জালিয়াতি, উন্নয়ন কর্মকান্ডে দুর্নীতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে অবকাঠামো নির্মাণ ও সরকারি ক্রয়ে আর্থিক লুটপাট অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি করায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে এখন তা ৩ শতাংশের ঘরে নেমেছে। একইসঙ্গে ইউক্রেন-রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ ও সর্বশেষ ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন হুমকিতে ফেলেছে। জ্বালানিসহ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করেছে। ফলে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে ভাটা, কর্মসংস্থান সংকট এবং উচ্চ মুল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদী সরকারের বিরুদ্ধে সর্বসাধারনের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়। 

এসব প্রেক্ষাপটে এলডিসি উত্তরণের মেয়াদ আরও ৩ বছর বাড়াতে বাংলাদেশের আবেদন গত ফেব্রুয়ারীতে গ্রহণ করে জাতিসংঘ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীনে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সহায়ক সংস্থা কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) সুপারিশ করে কোনো দেশ এলডিসি তালিকা থেকে উন্নীত হবে কি না? উত্তরণ ঘটা বা উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত কাজ করে থাকে সিডিপি। 

গত ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের প্রেক্ষাপটে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে এলডিসি থেকে উত্তরণের নতুন সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর।  

বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; বরং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার শেষ বড় সুযোগগুলোর একটি। কারণ এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্য জোটের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বিশেষ বাণিজ্যসুবিধার আওতায় রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা ধাপে ধাপে হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

কারণ, ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা ও অন্যান্য বিশেষ সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ পেলেও এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে না পারলে উত্তরণ পরবর্তী চাপ মোকাবেলা করার সক্ষমতা সৃষ্টি হবে না।

অর্থনীদিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৮ সালে সিডিপি প্রথম সুপারিশ করে বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করতে। তিনি বলেন, ওই সময়ের মধ্যে উত্তরণের প্রস্তুতি তো দূরে থাক; বরং উল্টো পথে হেটেছে বাংলাদেশ। 

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতিতে যে অবনতি ঘটেছে তা দেড় দশকে সৃষ্ট। তিন বছরে এই অবস্থার উত্তরণ সম্ভব নয়। এর বাইরেও স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) বাস্তবায়নে আরও ৩ বছর সময় পাওয়া যাবে। কিন্ত প্রশ্ন হলো, সামনের দিনগুলোতে করণীয় কী?

তিনি বলেন, সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতির সকল আয়োজন দূর করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও শক্তিশালী করা, পুরো ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, পিডিবি, পিজসিবি, বিআরটিএসহ সকল সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত করা এবং এনবিআরের নীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগকে পৃথকীকরণ করা দরকার।

তার মতে, বর্তমান সরকার চলতি বছরের বাজেটে রাজস্ব হার বিষয়ে কিছু ছাড় দিয়েছে বটে; তাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সহায়ক হবে না। কারন, রাজস্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মাধ্যমে নেহায়েত কিছু সুবিধাবন্টন করা হয়েছে। এছাড়া মুল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইনের সংস্কার যথাযথ হয়নি। এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেনো করদাতারা হয়রানিমুক্তভাবে সরকারকে রাজস্ব পরিশোধ করতে পারে।

তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে পাওয়া বাড়তি সময় কাজে লাগাতে হবে। আমাদের অর্থনীতির কোথায় ঘুনপোকা আক্রমন করেছে তা আর ডায়াগনোসিস করার দরকার নাই। প্রেসক্রিপশনও যথেষ্ট হয়েছে। এজন্য সময় বা অর্থ ব্যয় না করে সরকারের অ্যাকশন দরকার। বৈশ্বিক পরিস্থিতি কখন অনুকুলে আসবে সে অপেক্ষা না করে নিজেদের ঘর (রাষ্ট্র) ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে এর কোনও বিকল্প নেই। নিজস্ব রিসোর্স (সম্পদ) ও সক্ষমতা ঠিকমতো ব্যবহার করতে হবে। 

এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী ধাক্কা    
এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক এবং ঔষধ খাতের ওপর এর প্রভাব পড়ার শঙ্কা বেশি। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এলডিসি পরিচয় হারালে এসব সুবিধার ধরন ও পরিধি পরিবর্তিত হবে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) ২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে জানায়, এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা হারালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ৩২ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি করা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভারতের সঙ্গে বাজারসুবিধা ধরে রাখার বিষয়ে কার্যকর আলোচনা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (সিইপিএ) মাধ্যমে নতুন বাজারসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবায়ন, পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজারে প্রবেশের শর্ত পূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

রপ্তানিতে নতুন পণ্যযোগ
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। ফলে একটি নির্দিষ্ট খাত বা কয়েকটি বাজারে সংকট তৈরি হলে পুরো অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। এলডিসি উত্তরণের পর এ দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হতে পারে। এ কারণে ঔষধ, চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, প্লাস্টিক, জাহাজ নির্মাণ, আইসিটি ও সফটওয়্যার খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষ করে ঔষধশিল্প বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় হলেও এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (আইপিআর) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে ওষুধ উৎপাদনে কিছু বিশেষ ছাড় ও নমনীয়তা পাওয়া যায়। উত্তরণের পর এসব সুবিধার পরিবর্তন ঘটবে। এতে ওষুধের কাঁচামাল, পেটেন্ট, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে। তাই পেটেন্ট আইন, গবেষণা ও উন্নয়ন, ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ব্যাংক খাত ও বিনিয়োগ পরিবেশের সংস্কার
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা জরুরি। উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থাও করতে হবে।

একই সঙ্গে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা, জমি ও শিল্প অবকাঠামোর সহজলভ্যতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দ্রুত অনুমোদন এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করতে হবে।

রাজস্ব আয় না বাড়ালে বাড়বে ঋণের চাপ
বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো এবং ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য সরকারের বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয় সে তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। বিশ্বব্যাপী উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে কর-জিডিপি অনুপাতের আদর্শ মান হলো প্রায় ১৫ শতাংশ। ২০৩০–৩১ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬.৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯.৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

এছাড়া, এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা ও স্বল্পসুদে ঋণের কিছু বিশেষ সুযোগ ধীরে ধীরে কমতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, কর প্রশাসনের সংস্কার এবং অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমাতে হবে। পাশাপাশি সরকারের ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।

জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোয় সক্ষমতা বাড়ানো
বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বড় বাধা। উৎপাদন খরচ বেশি হলে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, বন্দর ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়ন এবং পণ্য খালাসে সময় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের অগ্রগতি, স্থলবন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পণ্য পরিবহনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। জাতীয় লজিস্টিকস নীতির কার্যকর বাস্তবায়নও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমমান, পরিবেশ ও উৎপাদনশীলতায় নতুন বিনিয়োগ
উত্তরণের পর বাংলাদেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু শুল্ক নয়, শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, কার্বন নিঃসরণ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বাজারগুলোতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের অধিকার, কর্মপরিবেশ এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে কঠোর শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। এসব শর্ত পূরণ করতে না পারলে পণ্যের বাজার ধরে রাখা কঠিন হবে।

এ জন্য শিল্পকারখানায় জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পে রূপান্তর ঘটাতে হবে।

১৫৭ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা
এলডিসি উত্তরণ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) বা মসৃণ উত্তরণ কৌশল চূড়ান্ত করেছে। এতে পাঁচটি প্রধান কৌশলগত স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যসুবিধা ও বাজারপ্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা। এ কৌশল বাস্তবায়নে ১৫৭টি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে জাতিসংঘের এলডিসি উত্তরণ প্রস্তুতি মূল্যায়নে দেখা গেছে, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, অর্থায়নের অস্পষ্টতা, বেসরকারি খাতের সীমিত অংশগ্রহণ এবং সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি বড় বাধা হয়ে আছে।

বর্ধিত তিন বছরের জন্য চাই সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা
২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সরকারকে এখনই একটি বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। প্রথম বছরে ব্যাংক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের জরুরি সংস্কার শুরু করতে হবে। দ্বিতীয় বছরে এফটিএ ও ইপিএ আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি, শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং শ্রম ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে হবে। শেষ বছরে সংস্কারের ফলাফল মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, বেসরকারি খাত, ব্যবসায়ী সংগঠন, ব্যাংক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এলডিসি উত্তরণকে শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বা উন্নয়নশীল দেশের পরিচয় পাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটি হতে হবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, বহুমুখী ও টেকসই করার একটি কার্যকর রূপান্তর প্রক্রিয়া। 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত