ভারতের সিইসি জ্ঞানেশ জনতার দরবারে অভিশংসিত

ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ২০ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় বিচারের দাবি জানিয়েছে বিরোধী জোট।

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৭ পিএম

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচি পালন করেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে অনিয়ম এবং ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় বিচারের দাবি জানানো হয়েছে। খবর এনডিটিভির।

শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এই প্রতীকী অধিবেশনে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সাবেক লোকসভা স্পিকার মীরা কুমার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ভারতের সংসদের কার্যক্রমের আদলে সাজানো হয়েছিল পুরো আয়োজন।

সংসদের পুরোনো ভবনের কেন্দ্রীয় হলের আদলে খোলা জায়গায় আসনবিন্যাস করা হয়। সেখানে একসময় লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যরা একসঙ্গে বসতেন। মঞ্চে পেছনে বিশেষ সাজসজ্জার মাধ্যমে সেই পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়।

প্রস্তাব পাসের আগে সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ২০২৩ সালের একটি আইনের মাধ্যমে পাওয়া আইনি দায়মুক্তি জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষা করতে পারবে না। দেশের মানুষের মনোভাব বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধী দলের নেতারা ও সাধারণ মানুষ তাকে দায় এড়িয়ে যেতে দেবেন না।

এদিকে বিজেপি এই আয়োজনের সমালোচনা করেছে। দলটির বক্তব্য, বাস্তব নির্বাচনে জিততে না পেরে রাহুল গান্ধী এখন নিজের পছন্দমতো একটি সংসদে বসছেন। বিজেপির মুখপাত্র গুরু প্রকাশ পাসওয়ান সংবাদ সংস্থা আইএএনএসকে বলেন, এটি কোনো সংসদের অনুকরণ নয়, বরং সংসদকে উপহাস করার চেষ্টা। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি এবং ভুল তথ্য ছড়াতেই এমন আয়োজন করা হয়েছে।

নভেম্বরের ১ তারিখ দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের বড় সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে। চলমান বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এতে বিভিন্ন বিরোধী দল ছাড়াও মিম পেজ থেকে চাপ সৃষ্টিকারী সংগঠনে পরিণত হওয়া ককরোচ জনতা পার্টিসহ অন্য কয়েকটি সংগঠন সমর্থন জানিয়েছে। তবে আম আদমি পার্টির মতো কিছু দল স্পষ্ট করেছে, তারা ইন্ডিয়া জোটের আনুষ্ঠানিক অংশ নয়।

প্রতীকী অধিবেশনে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। রাহুল গান্ধীসহ দলের অন্য নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের অ্যাকাউন্ট থেকে পুরো কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

অধিবেশন উদ্বোধন করে মীরা কুমার বলেন, ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম অনিয়মিতভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও স্বচ্ছভাবে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণেই জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানোর দাবিতে অভিশংসনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে। তাই এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগের বিষয়।

মীরা কুমার জানান, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ রাখা হয়েছে। ইন্ডিয়া জোটের সদস্য, লোকসভা ও রাজ্যসভার সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া সাধারণ মানুষ তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থী আন্দোলনকর্মী নেহা বোরাও বক্তব্য দেন।

অভিযোগের তালিকায় ছয়টি বিষয়

প্রতীকী অধিবেশনে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, গণতন্ত্রে ভোটাধিকার সবচেয়ে মৌলিক অধিকার। কিন্তু বর্তমানে এই অধিকার গুরুতর হুমকির মুখে। তাঁর অভিযোগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সরাসরি নির্দেশে কাজ করছেন।

খাড়গে আরও অভিযোগ করেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে ক্ষমতাসীনরা বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে। সংসদ সদস্যদের দল পরিবর্তনে বাধ্য করা, রাজনৈতিক দল ভাঙা, সরকার পতন ও সরকার গঠন নিয়ে কারসাজি, নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের মতো সংস্থার ব্যবহার—এসবের পর এবার ভোট চুরির অভিযোগ সামনে এসেছে।

প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলা হয়, ভারতের সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কর্মকাণ্ডের কারণে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।

২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে উপস্থিত ইন্ডিয়া জোটের সদস্য ও নাগরিকদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবে বলা হয়, ভারতের ৬০ শতাংশের বেশি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী এই জোট ছয়টি অভিযোগের ভিত্তিতে জ্ঞানেশ কুমারের অভিশংসন দাবি করছে।

অভিযোগগুলো হলো—নির্বাচন চুরির ষড়যন্ত্র, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ২০ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া, সংসদের অনুমোদন ছাড়াই ভোটার নিবন্ধনের ফরম-৬ পরিবর্তন, ইসিনেট নামের অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের নির্দেশে কাজ করা।

অমিত শাহের সংসদে আলোচনার প্রস্তাব

অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে শুক্রবারই বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কে রাহুল গান্ধী ও সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবকে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে আলোচনার আহ্বান জানান তিনি। লোকসভায় কংগ্রেসের পর সবচেয়ে বড় বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন অখিলেশ।

লখনৌতে উত্তর প্রদেশ বিজেপির এক সভায় অমিত শাহ বলেন, ভারতীয় জনতা পার্টি সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তাদের লুকানোর কিছু নেই। এ জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকা যেতে পারে।

বিরোধীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, সংসদে আলোচনা করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। বরং তারা সংসদের কার্যক্রম চলতে না দিয়ে হট্টগোল সৃষ্টি করে।

এসআইআর নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ

ইন্ডিয়া জোট দীর্ঘদিন ধরে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম স্থগিত এবং সংশোধনের আগের ভোটার তালিকা পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছে। এই কার্যক্রমে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, যা এসআইআর শুরুর আগের মোট ভোটারের প্রায় ১৪ শতাংশ।

এর আগেও সংসদে এসআইআর নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ২০২৫ সালের বর্ষাকালীন অধিবেশনে অপারেশন সিঁদুর নিয়ে আলোচনা ছাড়া সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম খুব বেশি এগোয়নি। বিহারে এসআইআর কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের প্রতিবাদের কারণে বারবার অধিবেশন মুলতবি করতে হয়।

এরপর শীতকালীন অধিবেশনে সরকার জানায়, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই এসআইআর নিয়ে সরাসরি বিতর্কের পরিবর্তে নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে আলোচনায় সম্মতি দেওয়া হয়।

২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ওই বিতর্কে রাহুল গান্ধী তার ভোট চুরির অভিযোগ নিয়ে আয়োজিত তিনটি সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে অমিত শাহকে আলোচনার চ্যালেঞ্জ জানান। জবাবে অমিত শাহ বলেন, তিনি নিজের বক্তব্যের ক্রম নিজেই ঠিক করবেন। পরে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।

চলতি বছরের এপ্রিলে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের দেওয়া প্রস্তাবের নোটিশ গ্রহণ করেননি।

উল্লেখ্য, কংগ্রেস প্রথমে এই আয়োজনের নাম দিয়েছিল ‘মক পার্লামেন্ট’ বা প্রতীকী সংসদ। পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘জনগণের অভিশংসন’ রাখা হয়। প্রকৃত অভিশংসনের জন্য ইন্ডিয়া জোট আগে যে নোটিশ দিয়েছিল, তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। এ ছাড়া সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও জোটটির নেই। শুক্রবার আয়োজনটি হওয়ার কথা থাকলেও দিল্লিতে বৃষ্টির কারণে এক দিন পিছিয়ে শনিবারের পরিবর্তে শুক্রবারের কর্মসূচি শনিবারে অনুষ্ঠিত হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত