‘পুরনো ক্ষমতা-কাঠামো বদলাও, অংশীদারত্বের গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্র রূপান্তর কর’ প্রতিপাদ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জেএসডির ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে শনিবার (৩১ অক্টোবর)।
এ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সভায় বক্তারা বলেছেন, শুধু ক্ষমতা বদল নয়, জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশীদার করাই এখন সময়ের দাবি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি তানিয়া রবের সভাপতিত্বে এই সভায় আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন সিনিয়র সাংবাদিক ও চরচার সম্পাদক সোহরাব হাসান, বহুমাত্রিক লেখক ও দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পেশাজীবী সংগঠক ডা. হেলালুজ্জামান আহমেদ এবং জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপনসহ অন্যরা।
তানিয়া রব বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল জাতীয় সরকার গঠন ও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই অঙ্গীকার থেকে সরে আসা হতাশাজনক। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া মতামতও উপেক্ষা করা হচ্ছে। সরকার ও বিরোধী দল সংস্কার পরিষদের শপথ নিলে সংস্কারের বিষয়টি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতো।’
তিনি বলেন, ‘দেশে মব সংস্কৃতি, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যক্তিত্ববোধ, রুচিবোধ এবং দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ধর্মের নামে রাজনীতি ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ প্রয়োজন।’
তানিয়া রব আরও বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সত্য। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙচুর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্র সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক শক্তিগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমজীবী ও পেশাজীবী মানুষের অংশীদারত্বের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।’
দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, ‘একাত্তর-পরবর্তী সময়ে আমরা অনেক সুযোগ হারিয়েছি। চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে সুযোগটি যদি আবার হারাই, তবে ১০০ বছরেও আর সে সুযোগ পাব না।’
দেশে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কথায় কথায় মব হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে।’
স্বপ্ন দেখা ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের কথাও বলেন মুস্তাফিজ শফি। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বলতে চাই যে সমাজটাকে আগে ঠিক করতে হবে এবং সেই সমাজের যে বিভাজনের রেখাটা আছে, সেটাকে তুলে দিতে হবে। স্বপ্ন দেখা ভুলব না। স্বপ্ন দেখা যদি বাদ দিয়ে দিই, তাহলে তো আমরা মৃত। বেঁচে থাকার জন্যই আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে।’
ডা. হেলালুজ্জামান আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামোর সংকট। সমাজ এগিয়ে গেলেও রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটেনি। শিক্ষক, কৃষক, চিকিৎসক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সমাজ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ নেই। সমাজের অগ্রগতি ও রাষ্ট্রের স্থবিরতার মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্বই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।’
শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘শুধু শাসক পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের শাসনকাঠামোর পরিবর্তন জরুরি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। বারবার ব্যক্তি ও দল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথ তৈরি হয়েছে।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জেএসডির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ও স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট কে এম জাবির বলেন, ‘স্বাধীনতার যে লক্ষ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণআন্দোলনে জাসদ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় শ্রমজীবী, কর্মজীবী ও পেশাজীবী মানুষের অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয়নি।’