 এইচএসসির ফল

বিপর্যয়ের উৎসে নজর দেওয়া জরুরি

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম

পাবলিক পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ৩১ অক্টোবর। এ পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, প্রথমে ২৯ অক্টোবর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা ছিল। পরে তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। ৩১ অক্টোবর দেশ রূপান্তরের এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২৯৩ প্রতিষ্ঠানের কেউ পাসই করেনি! এইচএসসির ফল প্রকাশের প্রতিবেদনের সঙ্গে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসির ফল জালিয়াতির প্রতিবেদনটি সঙ্গতই প্রশ্ন ফের দাঁড় করিয়েছে, অবক্ষয়ের এ কোন গ্রাসে পড়েছে শিক্ষা? ‘চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসিতে ফলাফল জালিয়াতি, ১১ পত্রেই বাড়ানো হয়েছে নম্বর’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের এসএসসিতে পরীক্ষার ফলাফলে হাসিবুল আলী শোভনের ১১টি পত্রেই সৃজনশীল নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। আইসিটি বিষয়ে সৃজনশীল না থাকায় হয়তো সেখানে পরিবর্তন করা যায়নি। পরিবর্তনের সবই হয়েছে সৃজনশীল অংশে।

এসএসসি এবং এইচএসসি শিক্ষা জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধাপ। তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা যায়, এইচএসসি অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার পথ নির্ধারিত হয়ে থাকে এই অধ্যায় শেষে। এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, এই তথ্য জানানো হয়েছে ৩১ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে। দেশ রূপান্তরের অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ইংরেজি ও আইসিটিতে বিপর্যয়ের অভিঘাত আরও কঠিন।

কোনো কোনো শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেছেন, সিলেবাসের কারণে অনেক পরীক্ষার্থী মানসিকভাবে চাপের মুখে পড়ে। এ ছাড়া খাতা মূল্যায়নে লিবারেল না থেকে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাও বিরাজমান ছিল। এতে অনেকেই কলেজবিমুখ হয়ে পড়ে, যা এবারের ফলে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। আমরা অনেকাংশেই তাদের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ না করলেও প্রশ্ন রাখতে চাই, ফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশের বিষয়টি কি উপেক্ষা করার মতো? এবার মানবিক বিভাগ থেকে ফেল করেছে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, শিক্ষার মান উন্নয়নের ব্যাপারে কথা হয়েছে যত, এর বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি তত। শিক্ষার হার আর পাসের হার এই বিষয়গুলো এক কাতারে ফেলার নয়। আর পাসের হার বেড়েও দেশ-জাতির জন্য কল্যাণকর কিছু নিশ্চিত হবে না, যদি গুণগত মানের উন্নয়ন না ঘটানো যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা খুশির কিছু নয়, যদি এর সমান্তরালে শতভাগ অকৃতকার্যের প্রতিষ্ঠানের তালিকা দীর্ঘ হতে থাকে।

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে আবারও কিছু কঠিন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত না করে তাদের শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান, মূল্যায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং সামগ্রিক শিক্ষাদর্শনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে সেভাবে গড়ে তোলার প্রয়াস জোরদার করা হোক। নজর গভীর করা হোক ফল বিপর্যয়ের উৎসে। পাসের হার কমেছে কিনা বেড়েছে শুধু এই সংখ্যা দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার মান বিচার করা সঠিক নয় বলে আমরা মনে করি। কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী  উত্তীর্ণ হতে পারলেন না, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণক্রমে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া এবং এর বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাফল্যের সিঁড়ি নির্ণয় করা।

শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতার বিষয়েও সম-গুরুত্বেই দৃষ্টি প্রখর করা বাঞ্ছনীয়। আমরা আরও মনে করি, যেসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে ফল খারাপ হচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত তদারকির বিকল্প নেই। প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়াও গত্যন্তর নেই। আমরা এও মনে করি, অবস্থার উন্নতির জন্য আগে জরুরি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি। পরীক্ষার ফল বিপর্যয়কে শুধু শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া আরও জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং কোচিংনির্ভর ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণী বা সৃজনশীল চিন্তার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এই অভিযোগও আমলে রাখা উচিত।     

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত