জুলাই যোদ্ধা দাবি করে মামলা, পুলিশ বলছে কোনো ঘটনাই ঘটেনি

 হাসিনাসহ ৮৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নূর হোসেন নামে এক যুবক নিজেকে জুলাই যোদ্ধা দাবি করে শরীরে ৯টি গুলি লেগে আহত হওয়ার ঘটনায় মামলা করেছিলেন। এতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনকে আসামি করে অভিযোগ আনা হয়। এ মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। বিভিন্ন মেয়াদে তাদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই (উপপরিদর্শক) উক্যমং রাখাইন আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলেছেন, নূর হোসেনকে গুলির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। মামলায় নূর হোসেনের দাখিল করা কাগজপত্র সবই ছিল ‘ভুয়া’  ও নিজের তৈরি করা।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। গতকাল শনিবার বিষয়টি জানা যায়। তবে প্রতিবেদনে মিথ্যা অভিযোগে মামলা করার জন্য বাদীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেননি।

এসআই উক্যমং রাখাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদালত চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারেন। মামলার বাদী নূর হোসেনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ইতিমধ্যে আগামী ১ ডিসেম্বর বাদীর উপস্থিতিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণসংক্রান্ত দিন ধার্য করেছেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক।

এ মামলায় অব্যাহতির জন্য সুপারিশ করা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিম-লীর সদস্য শাজাহান খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, মিলন হোসেন, মহিলা লীগ নেত্রী ইসরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার। তদন্ত কমকর্তা তার প্রতিবেদনে বলেছেন, বাদী নূর হোসেন অভিযোগের সঙ্গে   বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ‘চিকিৎসা নেওয়ার’ কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। তদন্তে দেখা যায়, তিনি ওই হাসপাতালে কোনো  চিকিৎসকের কাছেই চিকিৎসা নেননি এবং মামলায় যুক্ত করা হাসপাতালের কাগজপত্রগুলো ওই প্রতিষ্ঠানের নয়।

তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেন, বাদী নূর হোসেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ব্যবস্থাপত্র কম্পিউটারে টাইপ করা জমা দিয়েছেন। কিন্তু ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা হাতে লিখে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া যেই ক্যাশ মেমো দিয়ে নূর হোসেন চিকিৎসা নিয়েছেন, সেই নম্বর ক্যাশ মেমো দিয়ে ওই হাসপাতালে ৫৪ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার নামে একজন চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যদিকে তিনি (বাদী) যে আইডি নম্বর ব্যবহার করেছেন, সেটিতে ৩২ বছর বয়সী জুয়েল নামে আরেকজন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নূর হোসেনের চিকিৎসার কাগজপত্র যাচাই করে সেগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহতদের গেজেটেও তার নাম পাওয়া যায়নি। এসব কারণে নূর হোসেন প্রকৃতপক্ষে আহত হননি এবং আহত হওয়ার মিথ্যা কল্পকাহিনির ঘটনা সাজিয়ে মামলা করেছেন  প্রতীয়মান হয়।

এ মামলার গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মিলন হোসেনের আইনজীবী এএইচএম হাসিবুজ্জামান হাসিব বলেন, ‘আমরাও জুলাই আন্দোলনের পক্ষে ছিলাম। আমরাও জুলাই আন্দোলনের মামলার বিচার চাই। তবে যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, তাদের এ ধরনের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা আইনসঙ্গত নয়। রাজনৈতিক  ফায়দা নেওয়ার জন্য এসব মামলা করা হয়েছে। মিথ্যা মামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা হোক।

অন্যদিকে বাদীপক্ষের ওকালতনামায় আইনজীবী জান্নাতুল বর্ণা সুমির স্বাক্ষর রয়েছে। তবে তিনি বলেন, এ মামলা সম্পর্কে  তিনি কিছুই জানেন না। তবে অনেক সময় সিনিয়র আইনজীবীরা ওকালতনামা ব্যবহার করে মামলা করেন। তারা জুলাই আন্দোলনের মামলায় বাণিজ্য করার জন্য এসব মামলা করেছেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, নূর হোসেন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া ‘ময়ূর ভিলা’  এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও গুলি চালানো হয়। নূর হোসেনের পিঠে ছয়টি, বাম পায়ের হাঁটুর ওপর দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি। বাদী উল্লেখ করেন, গুলিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে তিনি রাস্তায় পড়ে থাকেন। আসামিরা তাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন এবং আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে আছেন। পরে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একই বছরের ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে এ মামলাটি করেন নূর হোসেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) সহসভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, যেসব আইনজীবীর বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব নিয়ে মিথ্যা মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত