বাবাকে হারানোর শোক বুকে নিয়ে ভোলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সামনে একাই অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন নয়ন খান। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে তার দাবি, হাসপাতালে দ্রুত চালু করতে হবে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ)। নিজের বাবার মতো চিকিৎসার অভাবে আর কোনো পরিবারকে যেন স্বজন হারাতে না হয়, সেই দাবিতেই তার এই প্রতিবাদ। অথচ পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে স্থাপন করা হাসপাতালের ছয় শয্যার আইসিইউ ইউনিট এখনো চালু হয়নি। কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়।
ভোলা সদর উপজেলার বাসিন্দা নয়ন খান হাসপাতালের নতুন বহুতল ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। তার হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর দাবি তুলে ধরা হয়েছে। নয়নের দাবি, ভোলার মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ও সিসিইউ চালু করতে হবে। এ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি তার অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
নয়নের এই প্রতিবাদের পেছনে রয়েছে নিজের পরিবারের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। তার ভাষ্য, গত ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে অসুস্থ বাবাকে ভোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা ও আইসিইউ-সিসিইউ সুবিধা না থাকায় বাবাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন তিনি। বাবাকে হারানোর সেই অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তুলে ধরেন নয়ন।
নয়ন খান বলেন, নিজের পরিবারের মতো পরিস্থিতি যেন অন্য কোনো রোগীর স্বজনদের মোকাবিলা করতে না হয়, সে জন্যই তিনি হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়েছেন। শুধু দাবি জানিয়ে ফিরে যেতে চান না, হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ও সিসিইউ চালু না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তার এই প্রতিবাদ ব্যক্তিগত শোকের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভোলার মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
অথচ হাসপাতালটিতে আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পাঁচ বছরেরও বেশি আগে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার জন্য ২০২১ সালের ২৯ জুলাই নতুন বহুতল ভবনের তৃতীয় তলায় ছয় শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগার (সিএমএসডি) থেকে সরবরাহ করা হয় আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন কনসেনট্রেটরসহ প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অ্যানেসথেটিস্ট, প্রশিক্ষিত নার্স ও প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবলের অভাবে ইউনিটটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় স্থাপিত আইসিইউ ইউনিটটি বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে আছে। ইউনিটের দরজায় ঝুলছে তালা। ভেতরে পড়ে থাকা ছয়টি শয্যা ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী রোগীদের সেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে না। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় মূল্যবান যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইসিইউ সেবা না থাকায় ভোলার গুরুতর অসুস্থ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল কিংবা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। ডেঙ্গু, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট কিংবা দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা না থাকায় স্বজনদের পড়তে হচ্ছে বাড়তি ভোগান্তিতে। বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীকে অন্য জেলায় নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় ও যাতায়াত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. আরাফাতুর রহমান বলেন, আইসিইউ সেবা চালু না থাকায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায়ই বরিশাল ও ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। ডেঙ্গু, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত জটিল রোগীদের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আইসিইউ চালু করতে দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স এবং তাদের সহযোগিতার জন্য পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন। হাসপাতালে সেই জনবল নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরী বলেন, ভোলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হলেও জনবল সংকটে তা চালু হচ্ছে না। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক কম। কখনো কখনো দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকের সংখ্যা ১০ জনে নেমে আসে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান বলেন, ছয় শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হলেও পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর অভাবে এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া গেলে আইসিইউ ইউনিট চালু করা হবে।
একটি হাসপাতাল নির্মাণ, শয্যা স্থাপন কিংবা কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করলেই উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হয় না, এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল। ভোলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের বন্ধ আইসিইউ ইউনিট সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। একজন সন্তানকে বাবাকে হারানোর পর হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসাসেবার দাবি জানাতে হচ্ছে। ভোলার মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করে আইসিইউ চালু করা হবে। একই সঙ্গে চালু হবে সিসিইউ সেবা, যাতে সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য জেলায় ছুটতে না হয়।
অগ্নিকান্ডের ১৫ দিনেও আইসিইউ চালু হয়নি