বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ বহর আধুনিক করার উদ্যোগ, বোয়িং ও এয়ারবাসের সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সসহ বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার কারণে ভবিষ্যতে দক্ষ পাইলট ও কারিগরি জনশক্তির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের বিমান পরিবহন খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে আমরা কি পর্যাপ্ত দক্ষ পাইলট, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী এবং অন্যান্য প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারছি?
অল্প সময়ে একটি আধুনিক উড়োজাহাজ কেনা সম্ভব হলেও দক্ষ পাইলট তৈরি করতে অনেক সময়, অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক, উপযুক্ত উড়োজাহাজ, উন্নত প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অতি প্রয়োজন।
দেশেই মানসম্মত পাইলট প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো গেলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হবে। বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ওপর নির্ভরতাও কমবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নিজস্ব দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল খাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান দেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি পাইলট প্রশিক্ষণ ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে অবদান রেখেছে।
আর্থিক সংকটের পেছনে অবকাঠামো হারানোর প্রভাব
বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব ও ফ্লাইং একাডেমির বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যা। একসময় প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অবকাঠামো ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আয় করত।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দক্ষিণ পাশে কয়েক একরেরও বেশি জমিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সেখানে নিজস্ব হ্যাঙ্গারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল।
ফ্লাইট প্রশিক্ষণের পাশাপাশি হ্যাঙ্গার ভাড়া, উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও পার্কিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আয় হতো। নিজস্ব ফ্লাইং স্কুল থেকেও নিয়মিত আয় আসত।
কিন্তু তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের সময় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত জমি অধিগ্রহণ করে। সে সময় ঢাকার হ্যাঙ্গারের পরিবর্তে রাজশাহী বিমানবন্দরে বিকল্প হ্যাঙ্গার, উড়োজাহাজ কেনা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
নিজস্ব জমি ও হ্যাঙ্গার হারানোর ফলে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের বড় একটি অংশ বন্ধ হয়ে যায়। পরে নিজস্ব অর্থায়নে নিকুঞ্জ এলাকায় একাডেমিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নতুন স্থানে কার্যক্রম পরিচালনার খরচ এবং আগের আয়ের উৎস হারিয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক চাপে পড়ে।
ফলে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে সচল রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে।
পাইলট প্রশিক্ষণে ভর্তুকি ও সরকারি সহযোগিতা জরুরি
পাইলট প্রশিক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উড়োজাহাজের জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষকদের পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ কারণে অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী ইচ্ছা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন না।
অতীতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আর্থিক সহায়তা ও ভর্তুকি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করত। বিশেষ করে উড়োজাহাজ কেনা ও জ্বালানি ব্যয়ে সহায়তা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
এই ধরনের সহায়তা আবার চালু করা গেলে প্রশিক্ষণের খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি এবং সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব ও ফ্লাইং একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বহু পাইলট দেশে-বিদেশে পেশাগত জীবন গড়ে তুলেছেন। তাঁদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমান পরিবহন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এমিরেটস, সৌদিয়া, কুয়েত ও কাতারের মতো আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থায় কর্মরত পাইলটদের সাফল্য দেশীয় প্রশিক্ষণের সম্ভাবনা তুলে ধরে।
জাতীয় স্বার্থে বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবের পুনর্জাগরণ
আমি নিজেও এই একাডেমি থেকে পাইলট প্রশিক্ষণ নিয়েছি এবং পেশাগত জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমার মতো অনেক পাইলটের আবেগ, স্মৃতি ও সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠান। তাই বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবকে টিকিয়ে রাখা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের পাইলট তৈরির সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য দেশেই দক্ষ পাইলট ও কারিগরি জনশক্তি তৈরির ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে। প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় উড়োজাহাজ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নতুন করে গতিশীল করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাবের পুনর্জাগরণ মানে শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা নয়; বরং দেশের গৌরবময় বিমান চলাচলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মের দক্ষ পাইলট তৈরি এবং ভবিষ্যতে দেশের ক্রমবর্ধমান বিমান পরিবহন খাতের জনশক্তির চাহিদা পূরণে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া।
_________________
_________________
লেখক: ইথার ফারিয়েল হামিদ, পাইলট, ইনস্ট্রাক্টর ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ;
নির্বাহী কমিটির সদস্য (একাডেমিক ও ইঞ্জিনিয়ারিং), বাংলাদেশ ফ্লাইং ক্লাব