জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা থেকে সাংবাদিকদের সুরক্ষার আহ্বান বিএনএনআরসির

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি ও হামলার ধরন বদলালেও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই। তাই রাজধানীর পাশাপাশি মফস্বলের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হুমকির নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, দ্রুত প্রতিকার এবং জেলাভিত্তিক সমান নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতা অবসান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে ২ নভেম্বর ২০২৬ এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানায় সংস্থাটি। এতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রতি সাংবাদিকদের সুরক্ষাকে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে তাঁর পরবর্তী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ। হুমকির বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হলে সাংবাদিক ও তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। এর ফলে গণমাধ্যম বন্ধ হওয়ার আগেই জনগণ তথ্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

বিএনএনআরসি বলেছে, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা থেকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে হবে। প্রতিটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকির দ্রুত জবাব, হামলার কার্যকর তদন্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান বিবেচনা না করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকির ধরন পরিবর্তিত হলেও বিচারহীনতা বহাল রয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নতুন প্রযুক্তি ও অস্ত্রের ব্যবহার সাংবাদিকদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের কৌশল দ্রুত আধুনিক হলেও জবাবদিহির ব্যবস্থা সেই গতিতে এগোচ্ছে না।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার হার ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১২ সালে ইউনেস্কোর এ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর প্রথম বৃদ্ধি। সংস্থাটির রেকর্ড অনুযায়ী, দুই বছরে ১৮৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২৭ জনই সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন। এই ৮৬ শতাংশের হিসাব বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার চিত্র তুলে ধরে, এটি শুধু বাংলাদেশের তথ্য নয় কিংবা সব ধরনের সহিংসতার হিসাবও নয়।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ইউনেস্কোর আঞ্চলিক হিসাব অনুযায়ী, আরব দেশগুলোতে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ছয়টি যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় ৫০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের স্তব্ধ করার জন্য শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, অপহরণ, নির্যাতন, অন্যায় আটক ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি স্ল্যাপ (SLAPP) ধরনের হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধের চেষ্টা করা হয়। অপরাধীদের বিচার না হলে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপরাধের খবর প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বিএনএনআরসি বলেছে, সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। পরিবারটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দীর্ঘসূত্রতার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো পূর্বনির্ধারিত ধারণার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও বিচারহীনতার ঘটনা শুধু জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার বাইরের স্থানীয় সাংবাদিক ও সম্পাদকদের হত্যাকাণ্ডের অনেক ঘটনারও বিচার হয়নি। সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটির (সিপিজে) সতর্কতার উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশে ধারাবাহিক হামলা, হুমকি ও বিচারহীনতা সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু দিবসভিত্তিক সংহতি নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।

সংস্থাটির মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার সঙ্গেও সম্পর্কিত। সরকারি ব্যয়, ভূমিবিরোধ, পরিবেশের ক্ষতি ও নাগরিক সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জনগণকে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি করে। তাই জেলা প্রতিনিধি, ফ্রিল্যান্সার ও কমিউনিটি রেডিওর সাংবাদিকদেরও সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবাদিকদের সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

ডিজিটাল মাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের হয়রানির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনএনআরসি। ইউনেস্কো ও আইসিএফজের ‘দ্য চিলিং’ প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, জরিপে অংশ নেওয়া নারী সাংবাদিকদের ৭৩ শতাংশ পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষায় যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য, ছবি বিকৃত করে প্রচার এবং অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

বিএনএনআরসি বর্তমানে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।

প্রকল্পের পাশাপাশি ঢাকা ও ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের প্রযুক্তিভিত্তিক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) থেকে সুরক্ষা জোরদারের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। যৌন হুমকি, সাইবার স্টকিং, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বা বিকৃত ছবি ব্যবহার করে ভয় দেখানোর বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সাংবাদিকের কর্মস্থল বা পদমর্যাদার ভিত্তিতে সুরক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য না রাখার কথাও বলা হয়েছে।

বিএনএনআরসি মনে করে, অনলাইন ও মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। হুমকির প্রমাণ সংরক্ষণ, অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পরিচয় ও তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রেখে এবং মানসিক আঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও বিচারহীনতা প্রতিরোধে জাতিসংঘের কর্মপরিকল্পনাকে (ইউএন প্ল্যান অব অ্যাকশন) গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। ২০১২ সালে গৃহীত এ পরিকল্পনার আওতায় জাতিসংঘ, জাতীয় কর্তৃপক্ষ ও সুশীল সমাজকে প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে প্রায় ৫০টি দেশে জাতীয় সাংবাদিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

২০২২ সালে কর্মপরিকল্পনার ১০ বছর পূর্তিতে নতুন অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করে বিএনএনআরসি বলেছে, বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এ/রেস/৬৮/১৬৩ প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২ নভেম্বর দিবসটি পালিত হয়। ২০১৩ সালের এই দিনে মালিতে দুই ফরাসি সাংবাদিক নিহত হওয়ার স্মরণে দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিএনএনআরসি ছয়টি প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো হলো—হত্যাকাণ্ড, শারীরিক হামলা ও গুরুতর হুমকির নিরপেক্ষ তদন্তে প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রযুক্তি বরাদ্দ এবং অপরাধের নির্দেশদাতা, অর্থায়নকারী ও সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনা; জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে দ্রুত সাড়াদান ব্যবস্থা ও হেল্পলাইন চালু করে হুমকি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; স্বাধীন সাংবাদিকতার কারণে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা পর্যালোচনা করে প্রত্যাহার, অন্যায় আটক বন্ধ ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।

অন্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে, নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা, যৌন হুমকি ও এআই দিয়ে তৈরি বিকৃত কনটেন্টের ঘটনায় গোপনীয়তা বজায় রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া; গণমাধ্যমকর্মী ও ফ্রিল্যান্সারদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে জাতীয় বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করা। পাশাপাশি হুমকির তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশেরও দাবি জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিএনএনআরসি বলেছে, যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। হুমকি, অন্যায় আটক, নির্বাসন কিংবা হত্যাকাণ্ডের শিকার সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সংস্থাটি বলেছে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো সরকার, বিরোধী দল বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মনোযোগের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।

বিবৃতিতে বলা হয়, কোনো সাংবাদিক সহায়তা চাওয়ার পর রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তিনি নিরাপত্তা পাচ্ছেন কি না, তদন্ত এগোচ্ছে কি না এবং অপরাধীদের বিচার হচ্ছে কি না—এসবের ওপরই প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে। প্রতিটি জেলায় কার্যকর সাড়াদান ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই বিচারহীনতার অবসানের অন্যতম পথ। কারণ সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপরই জনগণের সত্য জানার অধিকার নির্ভরশীল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত