মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আলোচকরা। তারা বলেছেন, শুধু অভিযান ও শাস্তির মাধ্যমে মাদকের বিস্তার রোধ সম্ভব নয়। মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেল ৩টায় ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) এস টি সি মিলনায়তনে ‘মাদকমুক্ত বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক নীতিনির্ধারণী সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (ডিআইইউজেএ) আয়োজিত এ সংলাপের মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক দেশ রূপান্তর।
সংলাপে অতিরিক্ত আইজিপি ও রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে মাদকের বড় ধরনের উৎপাদন না থাকলেও ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এসব মাদক প্রতিরোধে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। সীমান্ত থেকে মাদক রেলপথ, মহাসড়ক, গাড়ি ও লঞ্চের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার রেলপথ ও বিপুলসংখ্যক যাত্রীবাহী ট্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে পুলিশের পর্যাপ্ত জনবল নেই। মাদক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে অপরাধী ও মাদক কারবারিদের শনাক্ত করতে সব সংস্থার সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি। পাশাপাশি মাদক প্রতিরোধে পারিবারিক অনুশাসন, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেন।
রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হসপিটালের মনোরোগ বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট ড. এম. এস. কবির জুয়েল বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন বা দুজন কাউন্সেলর রাখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা, আর্থিক সংকট ও সম্পর্কের জটিলতা থেকে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপে পড়েন। এর প্রভাবে অনিদ্রা, হঠকারী সিদ্ধান্ত ও আত্মক্ষতির প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, মানসিক অস্থিরতা থেকে অনেক শিক্ষার্থী চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘুমের ওষুধ সেবন শুরু করেন। পরে ভেপ, ইলেকট্রনিক সিগারেট ও ইনহ্যালেন্টের মতো আসক্তিকর উপাদানের দিকে ঝুঁকছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে টিএইচসি-যুক্ত তরল পদার্থের সহজলভ্যতা উদ্বেগজনক। এসব উপাদান নিয়ন্ত্রণে আইনের সীমাবদ্ধতা ও অস্পষ্টতা দূর করার প্রয়োজন রয়েছে। মাদকাসক্তি প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শিক্ষার্থীদের ভর্তির সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়কে ধূমপানমুক্ত, মাদকমুক্ত ও রাজনীতিমুক্ত রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক। বহিরাগতদের একটি অংশ এ বিস্তারের সঙ্গে জড়িত। এ বিষয়ে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সহায়তা নেওয়া হলেও এককভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। এটি শুধু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কর্নেল অব. কাজী শরীফ উদ্দিন, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাবের মো. সোয়াইব এবং ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল। তাঁরা মাদক নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।