বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক জোরদারের আহ্বান জামায়াত সেক্রেটারির

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম

পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নিজ নিজ আদর্শিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ ও চীন পরস্পরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ক্রিস্টাল হলে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে দলের সঙ্গে দলের মতবিনিময়ের ভূমিকা’।

অনুষ্ঠানে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং, ঢাকায় নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িন, দূতাবাসের কর্মকর্তারা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াতের প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, মোবারক হোসাইন, নুরুল ইসলাম বুলবুল ও মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। এ ছাড়া ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, মীর আহমাদ বিন কাসেম, নাজিবুর রহমান মোমেন, নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার এবং জামায়াত আমিরের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য আলী আহমদ মাবরুর উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ রয়েছে। গত বছর দুই দেশ সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে। দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রয়েছে।

তিনি বলেন, ২০০৬ সালে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী চীন সফর করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দলের নায়েবে আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চীনের আমন্ত্রণে জামায়াতের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বেও আরেকটি প্রতিনিধি দল দেশটি সফর করে।

এসব সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ অব্যাহত থাকতে পারে। তাই দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে দলীয় পর্যায়ে নিয়মিত মতবিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চীনের উন্নয়ন কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বলে উল্লেখ করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের কার্যক্রম তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেখানে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সততা এবং জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁর মতে, দারিদ্র্য বিমোচন, স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কাজে লাগতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে দুই দেশের নিজস্ব আদর্শিক অবস্থান ও মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়াতে তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।

প্রথম প্রস্তাবে তিনি বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার কথা বলেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়নসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের নিয়মিত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দুই দেশের তরুণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পারস্পরিক সফর, যৌথ অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, তরুণ নেতৃত্ব ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তৃতীয় প্রস্তাবে তিনি বলেন, দুই দেশের সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা সভাকক্ষে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এ সহযোগিতার সুফল পৌঁছে দিতে হবে।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, এ সংকট শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় নিজ দেশে প্রত্যাবাসন আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ধারাবাহিক যোগাযোগ, আন্তরিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে নিজস্ব অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশ সফররত চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং ও তাঁর সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। একই সঙ্গে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান এবং আয়োজনের সফলতা কামনা করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত