একসময়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতা কিংবা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা, পর্তুগিজদের কাছে এ যেন ছিল এক সুদূর পরাহত স্বপ্ন। লুইস ফিগো কিংবা ইউসেবিওর মতো কিংবদন্তিরা দেশের জার্সিতে জাদুকরি নৈপুণ্য দেখালেও ট্রফিহীন থেকে যাওয়ার আক্ষেপ তাড়িয়ে বেড়াত পুরো দেশকে।
পর্তুগালের সোনালী প্রজন্মের দুই সফল তারকা ফিগো ও রুই কস্তা তখনো জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, ঠিক তখনই ২০০৩ সালের এক আগস্টের সন্ধ্যায় ডাগআউট থেকে মাঠে নামলেন ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ উইঙ্গার। তবে মাঠে নামার পর খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, এই চটপটে তরুণ তার আগের সবার চেয়ে একেবারেই আলাদা। শুধু তার অফুরন্ত প্রতিভা নয়, বরং নিখুঁত হওয়ার অদম্য জেদ এবং জয়ের চরম ক্ষুধা তাকে বাকিদের চেয়ে আলাদা করেছিল।
কিংবদন্তি ফিগোর কাছ থেকে আক্ষরিক অর্থেই জাতীয় দলের নেতৃত্ব, ৭ নম্বর জার্সি ও স্বপ্ন দেখার ‘মশাল’ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এ বিষয়ে রুই কস্তা একবার ‘তুত্তোস্পোর্ট’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি তাঁর চেয়ে ক্ষুধার্ত কোনো খেলোয়াড় দেখিনি। ২০০৪ সালের ইউরোতে আমি ক্রিস্টিয়ানোর সঙ্গে খেলেছি, তখন সে কেবলই এক কিশোর। কিন্তু আমরা সবাই জানতাম যে সে একদিন ব্যালন ডি’অর জয়ী হবে।’ ২৩ বছরের সেই অনন্য পথচলার ইতি টেনে অবশেষে নিজের বিখ্যাত ৭ নম্বর জার্সিটি নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন এই পর্তুগিজ সেনানি।
২০০৩ সালের ২০ আগস্ট কাজাখস্তানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে যখন পর্তুগালের জার্সিতে রোনালদোর অভিষেক হয়, সেদিন কেউ ভাবতেও পারেনি এই কিশোর একদিন গোটা পর্তুগালকে ইউরোপের মুকুট পরাবে। এর আগে ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইউসেবিওর নেতৃত্বে তৃতীয় স্থান অর্জন করাই ছিল পর্তুগালের সেরা সাফল্য। কিন্তু রোনালদো আসার পর দৃশ্যপট বদলে গেল। অভিষেক হওয়ার মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই ২০০৪ ইউরোর ফাইনালে দলকে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি, এবং মাত্র ১৯ বছর বয়সেই টুর্নামেন্ট সেরা একাদশে জায়গা করে নেন।
এরপর ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপেও দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান। যদিও জার্সিতে তাঁর গোল ও পারফরম্যান্স নিয়ে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে, যেমন সুইডেনের বিপক্ষে প্লে-অফ বা ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক কিংবা ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ড থাকলেও নকআউট পর্বে তাঁর গোলসংখ্যা ছিল মাত্র একটি (চলতি বছরের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টিতে), তা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। পরিসংখ্যান ও রেকর্ড বলে, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে তিনিই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়; যেখানে ২০২৪ সালের ইউরো কিছুটা হতাশাজনক হলেও ফাইনালে ১৪ গোল এবং ৭ অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনি ফাইনালসের রেকর্ডগুলোর একক মালিক।
আক্ষেপ কেবল সেই বিশ্বকাপ শিরোপার। এছাড়া ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জনের এমন কোনো উচ্চ শিখর বাকি নেই যা এই পর্তুগিজ যুবরাজ স্পর্শ করেননি। ২০১৬ সালের ঐতিহাসিক ইউরো ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে পর্তুগালকে প্রথম কোনো মেজর আন্তর্জাতিক শিরোপা এনে দেওয়ার নেপথ্যে ছিলেন তিনিই। সেবার ফ্রান্সের মাটিতে গ্রুপ পর্ব পার হওয়াই কঠিন ছিল, কিন্তু হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৩-৩ ড্র হওয়া ম্যাচে জোড়া গোল করে দলকে টেনে তোলেন রোনালদো।
যদিও ফাইনালে ফরাসিদের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র ২৫ মিনিটে চোট পেয়ে তাঁকে স্ট্রেচারে করে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল, তবুও দমে যাননি তিনি। টেকনিক্যাল এরিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে ফার্নান্দো সান্তোসের সহকারী কোচের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সতীর্থদের উদ্দীপ্ত করা এবং ড্রেসিংরুমে দেওয়া তাঁর সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ আজও পর্তুগিজ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় হয়ে আছে।
সেই ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে রোনালদো বলেছিলেন, ‘এটি আমার জন্য একটি অনন্য মুহূর্ত। এটি এমন কিছু যা আমি অনেক দিন ধরে চেয়েছিলাম। এটি সত্যিই অবিস্মরণীয়।’ এরপর ২০১৯ সালে প্রথম উয়েফা নেশনস লিগ এবং সবশেষ ২০২৫ সালে জার্মানি ফাইনালে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে দ্বিতীয় নেশনস লিগ ট্রফি হাতে তোলেন তিনি। ওই জয়ের পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘ক্লাবের হয়ে আমার অনেক শিরোপা আছে, কিন্তু পর্তুগালের হয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। তাই এখানে চোখের জল রয়েছে, কারণ এটি দায়িত্ব পালনের স্বস্তি।’
রেকর্ডবুকের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, বর্তমান ফুটবল বিশ্বে রোনালদো মানেই এক জীবন্ত মিথ। ২৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৪৬ গোল নিয়ে তিনি বিশ্বের সর্বকালের সেরা আন্তর্জাতিক গোলদাতার মুকুট নিজের মাথায় পরে আছেন। কেবল গোল করাই নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক ১৪৩টি ম্যাচ জয়ের বিশ্বরেকর্ড, ১০টি হ্যাটট্রিক এবং টানা ছয়টি ভিন্ন ফিফা বিশ্বকাপে খেলা ও গোল করার একমাত্র কীর্তিটি কেবল তাঁরই দখলে। এমনকি ২০২৬ বিশ্বকাপে ৪১ বছর বয়সে নকআউট পর্বে গোল করে হয়েছেন টুর্নামেন্টের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতাও।
কাতার বিশ্বকাপের পর থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাঁর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল এবং চলতি বছর উত্তর আমেরিকায় তাঁর বিদায়টি কিছুটা দীর্ঘায়িত ও নাটকীয় হলেও, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ২৩ বছরের অর্জন চিরকাল মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। মাঠের পরিসংখ্যান, ট্রফি আর দীর্ঘ ২৩ বছরের অমর উপাখ্যান পেছনে ফেলে রোনালদো যখন বুটজোড়া তুলে রাখার ঘোষণা দেন, তখন বিশ্ব ফুটবল সাক্ষী হয়ে থাকল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক জীবন্ত কিংবদন্তির।