গাইবান্ধায় চুরির অপবাদে এক বৃদ্ধাকে গাছে বেঁধে পেটানো হয়েছে। ওই ঘটনার ১৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। ঘটনার পর থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ১৩ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, রশি দিয়ে এক নারীকে বাড়ির আঙিনায় গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার দুই হাত ও দুই পা গাছের সঙ্গে বাঁধা। শরীরে শাড়ি নেই। ওড়না জাতীয় কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। পরনে লাল রঙের প্যাডিকোট।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, এই বৃদ্ধা নারীকে শার্ট ও লুঙ্গি পরা এক ব্যক্তি গাছের চিকন ডাল দিয়ে পেটাচ্ছেন। ওই নারী চিৎকার করছেন। কান্নাজড়িত গলায় বাঁচার আকুতি জানিয়ে বলছেন, ও আল্লারে, ও আল্লারে, ও বাবা, ও মা রে! মোক ক্যা ডাঙ্গাস রে! পাশে থেকে একজনকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ওর পায়োত ভালো করি গেরন (শক্ত করে বেঁধে রাখা) দেও, আরেকজনকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ক্যামনে বানদোন দিলু...
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্যাতিত বৃদ্ধার নাম গোলাপী বেগম (৬৫)। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন। তার বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের উত্তর গোবিন্দপুর বালাআটা গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত মজিবর রহমানের স্ত্রী। গত ২ নভেম্বর ওই গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন, লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ। তিনি মুঠোফোনে জানান, কী চুরির অপবাদে তাকে পেটানো হয়, তা জানা যায়নি। আমি বৃদ্ধাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। ওই বৃদ্ধা এখন আগের চেয়ে সুস্থ আছেন।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২ নভেম্বর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের উত্তর গোবিন্দপুর বালাআটা গ্রামের মানসিক ভারসাম্যহীন গোলাপী বেগমের বিরুদ্ধে ছাগল ও সেচপাম্পের মোটর চুরির অপবাদ তোলা হয়। এরপর তাকে একটি গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়।
ঘটনার পর তাকে বাড়িতেই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর বেশি অসুস্থ হলে বৃহস্পতিবার ওই নারীকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের ২২ নম্বর শয্যায় তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অসুস্থ গোলাপী বেগম বলেন, ‘হামরা কোনো দোস করি নাই, তাও ওমরা হামাক গাছোত বানিদি মারচে। গায়োত বিষ (ব্যথা) হয়া আচে। কেউ হামাক বাঁধা দেওনাই।’
জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মোহাম্মদ আসিফ মুঠোফোনে জানান, ওই নারীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে হাসপাতালের ২২ নম্বর শয্যায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি খাওয়া-দাওয়া করেছেন, তার শরীরের অবস্থা উন্নতির দিকে যাচ্ছে। আমরা সার্বক্ষণিক তার তদারকি করছি।
এদিকে এই ঘটনায় নির্যাতিত নারীর ছেলে গোলাপ উদ্দিন (২৩) বাদী হয়ে গাইবান্ধা সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে একই গ্রামের সাদা মিয়াসহ (৩৫) চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গোলাপী বেগম একজন মানসিক রোগী। তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো যখন যেখানে যাতায়াত করেন। এলাকায় তাকে গোলাপী পাগলী হিসেবে চেনে। গত ২ নভেম্বর সকালে সাদা মিয়া কাজের কথা বলে গোলাপীকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান। তারপর সাদা মিয়া তাঁকে গাছের সঙ্গে বেঁধে লোহার রড দিয়ে মারধর করেন। ওই দিন দুপুরে আমরা সাদা মিয়ার বাড়ি থেকে তাকে উদ্ধার করি।
মামলার বাদী গোলাপ উদ্দিন মুঠোফোনে জানান, আমার মাকে সাদা মিয়া ও তার লোকজন অন্যায়ভাবে গাছে বেঁধে মেরেছে। আমি এই ঘটনার বিচার চাই। এসব বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি নাজমুল হুদা মুঠোফোনে বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরদিকে ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তি গা ঢাকা দিয়েছেন। তার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।