‘রাজনৈতিক’ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অবশেষে যাচ্ছে ভোলায়

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৩ এএম

রাজনীতির পালাবদলে দেশের এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাগ্যও বদলাচ্ছে। টানা ১০ বছর উৎপাদনে না থাকা কেন্দ্রটিকে টঙ্গী থেকে ভোলায় সরিয়ে নিচ্ছে সরকার। রাজধানীর লোডশেডিং কমাতে একসময় যে কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটিই পরে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক। খুব সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি না সারিয়ে ফেলে রাখা হয় টঙ্গী ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। গ্যাস না থাকার অজুহাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখার কথা বলা হলেও রাজধানীর আশপাশেই বড় বড় গ্যাসচালিত কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।

পিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, টঙ্গীর পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভোলায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এই পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে সরকার। চলতি বছরের মধ্যে ভোলায় কেন্দ্রটি স্থানান্তরের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে তারা।

পিডিবি সূত্র বলছে, টঙ্গী ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বৈরী রাজনীতির শিকার। বিগত চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর টঙ্গী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে। উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার লোডশেডিং কমানো। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা হারায়। আর এতেই একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বৈরী রাজনীতির কোপে পড়ে। কেন্দ্রটি নির্মাণ পর্যায়ে দুর্নীতি হয়েছে উল্লেখ করে দুদক মামলাও করে। এমনকি এই মামলার বিচারও শেষ হয়।

বিগত সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতের কথা উঠলেই চারদলীয় জোট সরকারের সময় নির্মাণ করা এই টঙ্গী কেন্দ্রটির কথা বলা হতো। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বিদ্যুৎমন্ত্রী একাধিকবার এই কেন্দ্রটির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের সময়ে এই একটি কেন্দ্র ছাড়া আর কোনো কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারেনি।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টঙ্গী বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে একটি পলিটিক্যাল কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হতো। ফলে কেন্দ্রটিতে একবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা আর ঠিক করা হয়নি। ইচ্ছা করেই এটি করা হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কারণ হিসেবে এই কর্মকর্তা বলেন এই কেন্দ্রটি চলছে না, এটি দেখানো গেলে আগের সরকার যা করেছে, তা ঠিক ছিল না, তা প্রমাণ করা সহজ হয়। বিষয়টিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা যে শুধু আগের সরকার করেছে তা নয়, এখনও করা হচ্ছে। তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক একটি বৈঠকের সূত্র ধরে বলেন, এখনও কিছু কেন্দ্রের বিষয়ে একই মনোভাব দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, এই কেন্দ্র জোর করে নির্মাণ করা হয়েছে।

টঙ্গী বিদুৎকেন্দ্রটির প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ ১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ৩ টাকা ২ পয়সা। কিন্তু এরপরও দীর্ঘ ১০ বছর বন্ধ করে রাখা হয়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। পিডিবি এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে খরচ করছে ১২ টাকার মতো। সেখানে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পরও এই কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪ টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয় বলে জানা গেছে।

টঙ্গী বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হয় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর কেন্দ্রটির যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কেন্দ্রটি আর আগের মতো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। দেখা যায়, ২০১৮ সালে কেন্দ্রটি সীমিত পরিসরে চালু হলেও পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। কেন্দ্রটিকে পিডিবির জন্য বাড়তি বোঝা হিসেবে উল্লেখ করেছেন পিডিবির কর্মকর্তারা। কেন্দ্রটি বন্ধ থাকলেও এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রাখতে হচ্ছে। আবার নিয়মিত সংস্কারও করতে হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে কোনো কোনো বছর কেন্দ্রটির পেছনে ৪০ কোটি টাকা খরচ করেছে পিডিবি। কিন্তু এর বিপরীতে এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন করা হয়নি। উল্টো কেন্দ্রটি পাহারা দিতে গ্রিড থেকে লাখ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ নিয়েছে পিডিবি।

পিডিবির হিসাব বলছে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পিডিবির এই কেন্দ্রটি ৩৫৮ দশমিক ৭১ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তখন প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ পড়ে ১ টাকা ৭৬ পয়সা। এরপর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১৩৪.৩৬ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ১ টাকা ৫৪ পয়সায়, ২০০৯-১০ এ ২৫.৩৪ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ২ টাকা ৭৪ পয়সা, ২০১০-১১ তে ২৬৮.১ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ২ টাকা ৭৪ পয়সায়, ২০১১-১২ তে ৪৩৪.১৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ২ টাকা ৭৪ পয়সায়, ২০১২-১৩ তে ২ টাকা ৭৫ পয়সা ব্যয়ে ৩৩৮.২৪ কিলোওয়াট আওয়ার, ২০১৩-১৪ তে ১১৫.০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ৮ টাকা ৩১ পয়সায়, ২০১৪-১৫ তে ১৭৪.৩৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ৩ টাকা ৫৬ পয়সায় এবং ২০১৫-১৬ তে ১৬.৯৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার ৩ টাকা ৫৬ পয়সায় উৎপাদন করে কেন্দ্রটি। এরপর ২ বছর কেন্দ্রটি বন্ধ ছিল।

আবারও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কেন্দ্রটি চালু করা হয়। তখন কেন্দ্রটি ২১.৫৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এতে প্রতি ইউনিটে খরচ হয় ১৬ টাকা ১৩ পয়সা। এরপর কেন্দ্রটি আর চালানো হয়নি। কেন্দ্রের যে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, তাও আর ঠিক করা হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস সংকটের কারণে টঙ্গী কেন্দ্রটি চলছে না বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু সাবেক সরকার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অন্তত চারটি ৪৫০ মেগাওয়াটের গ্যাসচালিত কেন্দ্র নির্মাণ করেছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক পিডিবির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, টঙ্গী কেন্দ্রটি ভোলায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রটি অনেক দিন ধরেই বন্ধ। এখানে মূলত গ্যাসের ঘাটতি থাকলেও কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে। সেগুলো ঠিক করার জন্য কেন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল না আসায় কেন্দ্রটির যান্ত্রিক ত্রুটি ঠিক করা যায়নি।

জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই। আমরা কেন্দ্র নির্মাণ করি কিন্তু সেগুলো ঠিকমতো চলছে কি না, তা দেখি না। আবার নতুন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেন কারা, এসব কাজ করে, তা খুঁজে বের করা উচিত।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত