কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষির উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটলেও, কৃষিপণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানিপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের মাটি, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, শাকসবজি ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম, মধুপুরের আনারস, বিভিন্ন অঞ্চলের কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলের যথেষ্ট আন্তর্জাতিক বাজারের সম্ভাবনা রয়েছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, জীবাণু ও পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা মান পূরণে ঘাটতির কারণে এসব পণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ বাস্তবতায় কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, গুণগত মান বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির সংযোজন বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। সম্প্রতি গাজীপুরের ভবানীপুরে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক গবেষণাকেন্দ্রে দেশের নতুন গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রায় ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি কৃষিপণ্য ও খাদ্যদ্রব্য প্রক্রিয়াজাতকরণে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ৫০০ কিলোকিউরি ক্ষমতাসম্পন্ন কোবাল্ট ৬০ ভিত্তিক এই স্থাপনায় গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিক সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না আইসোটোপ অ্যান্ড রেডিয়েশন করপোরেশন কেন্দ্রটির যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন করেছে। এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত স্থাপনা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং কৃষিপণ্যের উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি থেকে মানসম্মত প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানিমুখী কৃষি অর্থনীতিতে উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গামা ইরেডিয়েশন মূলত নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় গামা রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্য ও কৃষিপণ্যের জীবাণু, ক্ষতিকর অণুজীব এবং পোকামাকড়ের কার্যক্ষমতা নষ্ট করার একটি আধুনিক প্রযুক্তি। সাধারণত কোবাল্ট ৬০ নামের তেজস্ক্রিয় উৎস থেকে নির্গত গামা রশ্মি বিশেষভাবে নির্মিত সুরক্ষিত কক্ষে কৃষিপণ্যের ওপর প্রয়োগ করা হয়। নির্ধারিত মাত্রার এই বিকিরণ পণ্যের ভেতরে প্রবেশ করে জীবাণু ও পোকামাকড়ের কোষের জৈবিক কার্যক্রম এবং বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা নষ্ট করে। ফলে খাদ্যপণ্যের পচন সৃষ্টিকারী অণুজীবের সংখ্যা কমে, পোকামাকড়ের বংশবিস্তার বন্ধ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ফলের স্বাভাবিক পাকার প্রক্রিয়াও কিছুটা বিলম্বিত করা যায়। এর ফলে পণ্যের সংরক্ষণক্ষমতা বাড়ে এবং দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গামা ইরেডিয়েশন প্রয়োগ করা হলে খাদ্যপণ্য তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় না। নির্ধারিত মাত্রায় বিকিরণ প্রয়োগের পর পণ্যে তেজস্ক্রিয় পদার্থের অবশিষ্টাংশ থাকে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট শর্তে খাদ্য ইরেডিয়েশন নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত। তবে সব পণ্যের জন্য একই মাত্রার বিকিরণ উপযোগী নয়। পণ্যের ধরন, পরিপক্বতা, আর্দ্রতা ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বিকিরণের মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়।
বাংলাদেশের আম রপ্তানির ক্ষেত্রে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। দেশের আম স্বাদ, ঘ্রাণ ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হলেও দ্রুত পচনশীল হওয়ায় সংগ্রহের পরই বাজারজাত করতে হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পচন ও ছত্রাকের সংক্রমণে এর গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। উপযুক্ত মাত্রায় গামা ইরেডিয়েশন প্রয়োগের মাধ্যমে রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণ ও ফলের পাকার গতি কিছুটা বিলম্বিত করা গেলে আমের সংরক্ষণকাল বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ০.৭০ কিলোগ্রাম মাত্রায় গামা ইরেডিয়েশন প্রয়োগ এবং উপযুক্ত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে আমের ওজন হ্রাস, রোগের তীব্রতা ও পচন কমানো এবং সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানোর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের আম আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা দেশের আমচাষি ও রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে চীনের পাশাপাশি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান উন্নত বাজারে প্রবেশ করতে হলে শুধু সুস্বাদু আম উৎপাদন করলেই চলবে না, উৎপাদন থেকে সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও পরিবহন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে আমের সঙ্গে থাকা ক্ষতিকর পোকামাকড় ও রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণে আমদানিকারক দেশের উদ্ভিদ স্বাস্থ্যবিধি বা ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে গামা ইরেডিয়েশন কার্যকর বিকল্প হতে পারে। ভারতের আম যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০০৭ সাল থেকে পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির ব্যবহার এর বাণিজ্যিক গুরুত্বের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বিশেষ করে কাঁঠাল বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই ফলের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকলেও এর আকার, দ্রুত পচনশীলতা এবং পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতা রপ্তানির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। উপযুক্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ইরেডিয়েশনের মাধ্যমে কাঁঠালের কোয়া, পাল্প কিংবা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পেঁয়াজ ও রসুনের ক্ষেত্রে অঙ্কুরোদ্গম নিয়ন্ত্রণ, আলুর ক্ষেত্রে সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ফল ও সবজিতে জীবাণু ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত ইরেডিয়েশন প্রয়োগে পেঁপের সংরক্ষণকাল ১৫ দিন থেকে চার মাস এবং আম ও কলার ক্ষেত্রে প্রায় ১০ দিন থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যথেষ্ট বিস্তৃত। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর পচে নষ্ট হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়ানো গেলে উৎপাদনোত্তর অপচয় কমবে, কৃষককে তাড়াহুড়া করে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হবে না এবং মৌসুমি ফল ও সবজি পর্যায়ক্রমে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে অতিরিক্ত সরবরাহজনিত মূল্যপতনের চাপ কমার পাশাপাশি রপ্তানিযোগ্য পণ্যের পরিমাণ বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, পরিবহন ও শীতল সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, পণ্যের ধরন ও বিকিরণের মাত্রাভেদে প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়ও ভিন্ন হয়। ভারতের একটি গবেষণায় কম মাত্রার বিকিরণ প্রয়োগে প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ পয়সা থেকে ১ রুপি এবং বেশি মাত্রায় জীবাণুমুক্তকরণের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৫ রুপি ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। তবে এগুলো বাংলাদেশের বর্তমান সেবামূল্য নয়। দেশের কেন্দ্রটির প্রকৃত প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় নির্ধারণে পরিচালন ব্যয়, প্রক্রিয়াজাত পণ্যের পরিমাণ ও সেবার ধরন বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক, উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের কাছে প্রযুক্তিটির ব্যবহার আরও আকর্ষণীয় ও লাভজনক হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে, শুধু একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে চলবে না। আম, কাঁঠাল, আনারস, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন অঞ্চল বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, বাছাই, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, প্রাক-শীতলীকরণ ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থার সঙ্গে ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো জরুরি। কারণ এ প্রযুক্তি পণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়াতে এবং রোগজীবাণু ও পোকামাকড়ের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করলেও নিম্নমানের কাঁচামালকে উন্নত মানের পণ্যে পরিণত করতে পারে না। তাই নিরাপদ উৎপাদন, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ, ভালো কৃষিচর্চা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষ বিজ্ঞানী, কারিগরি কর্মী ও মান নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে।
কৃষক ও রপ্তানিকারকদেরও প্রযুক্তিটির ব্যবহার ও সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ, যৌথ বিনিয়োগ এবং সাশ্রয়ী সেবা প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা অনুযায়ী, সারা বছর বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করা গেলে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা বাড়বে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সনদ ও আমদানিকারক দেশের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে গুণগত মান, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা জরুরি।
গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি দেশের কৃষিকে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। প্রযুক্তিটির সাফল্য নির্ভর করবে যথাযথ প্রয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের উৎপাদনের সঙ্গে বাজারের কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর। কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে না দেখে রপ্তানি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তির যথাযথ সম্প্রসারণ ঘটলে বাংলাদেশের আম, কাঁঠালসহ বহুমুখী কৃষিপণ্য বিশ^বাজারে নতুন পরিচিতি পাবে। কৃষির শক্ত ভিতের ওপরই গড়ে উঠতে পারে রপ্তানিমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতি।
লেখক : কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।