পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই রইল না তাদের, সঙ্গী শুধুই ছাই 

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১০ পিএম

চারদিকে পোড়া ঘরের ধ্বংসস্তূপ। কোথাও ছাই, কোথাও পুড়ে যাওয়া কাপড়চোপড় আর সংসারের টুকরো টুকরো স্মৃতি। যে ঘরটিতে একসময় ১১ জনের সংসার ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে আগুনের ক্ষতচিহ্ন। সেই পোড়া ভিটার পাশে বসে আছেন ৮০ বছর বয়সী আবদুস সালাম। পাশে তাঁর স্ত্রী, ছেলের স্ত্রী ও ছোট ছোট নাতিনাতনি। তাদের চোখেমুখে অনিশ্চয়তা। মাথার ওপরের ছাদটুকুও কেড়ে নিয়েছে আগুন। পরনের কাপড় ছাড়া পরিবারটির আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

‘আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে। কামাই-রোজগার করতে পারি না। ছেলের আয়ে কোনোরকমে সংসার চলত। এখন সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কীভাবে চলবে এই সংসার?’—কথাগুলো বলতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে আবদুস সালামের।

আজ শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল সাতটার দিকে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের হারুয়া গ্রামে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যদের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা আগুন স্থানীয় বাসিন্দাদের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে। বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনকে ফোন করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর আগুন নেভানোর কাজ সহজ হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত আবদুস সালাম ও তাঁর বড় ছেলে সিএনজিচালক উজ্জ্বল মিয়া (৪০) জানান, আগুনে তাঁদের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘরের আসবাব, থালাবাসন, কাপড়চোপড়, নগদ টাকা—কিছুই রক্ষা করা যায়নি।

আবদুস সালামের বড় ছেলে উজ্জ্বল মিয়া অন্যের সিএনজি চালিয়ে সংসার চালান। তাঁর স্ত্রী ও সাত সন্তানসহ পরিবারে সদস্য ১১ জন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্বও তাঁর ওপর। ছোট ছেলে চঞ্চল মিয়া (৩০) বিয়ে করে ঢাকায় বসবাস করেন।

উজ্জ্বলের কাছে পুড়ে যাওয়া ঘরটি ছিল বহু কষ্টে গড়ে তোলা স্বপ্নের ঠিকানা। প্রায় এক বছর আগে দেড় লাখ টাকা জমিয়ে ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু মুহূর্তের আগুনে শেষ হয়ে গেছে সেই সঞ্চয়ের ফসল।

উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে দেড় লাখ টাকা জমিয়ে বছরখানেক আগে ঘরটি তৈরি করেছিলাম। ঘরের একটা সুতা পর্যন্ত বাকি নেই, সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। থালাবাসন থেকে শুরু করে নগদ টাকা—কিছুই বের করতে পারিনি। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমার সব শেষ ভাই। এখন সরকার যদি একটু সহযোগিতা করে, তাহলে খুব উপকার হতো।’

আগুনে শুধু একটি ঘরই পুড়েনি, নিঃস্ব হয়েছে একটি পরিবারের ১১ সদস্য। বাড়ির ভিটা ছাড়া তাঁদের আর কোনো জমিজমা নেই। এখন নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য তো দূরের কথা, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে কোথায় থাকবেন, কীভাবে চলবে সংসার—এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

প্রতিবেশী মো. সুলতান উদ্দিন (৬০) বলেন, ‘আগুন লাগার খবর পেয়ে পাড়াপ্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। সবাই মিলে অনেক চেষ্টা করে আগুন নেভাতে সক্ষম হই। কিন্তু ঘরের কোনো জিনিসপত্র বাঁচাতে পারিনি। পরিবারটির এখন রাতে থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। বাড়ির জায়গা ছাড়া তাদের আর কোনো জমিও নেই। আমরা চাই, সরকারিভাবে পরিবারটিকে সহযোগিতা করা হোক।’

ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা রাম প্রসাদ পাল বলেন, সকালে ঘটনাস্থল থেকে ফোন পেয়ে তাঁরা রওনা হয়েছিলেন। তবে মাঝপথে আবার ফোন করে জানানো হয়, আগুন নিভে গেছে। পরে তাঁরা স্টেশনে ফিরে যান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি আবেদন করলে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত