কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার খবরে বড় পরিসরে চিরুনি অভিযান চালিয়েছে যৌথ বাহিনী। গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা ও রঙ্গীখালীর গহিন পাহাড়ে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তল্লাশি চালিয়েও মরদেহগুলোর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে মানব পাচারকারীদের গোপন আস্তানা থেকে রান্নাবান্নার বিভিন্ন সরঞ্জাম, আইডি কার্ড ও আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার একই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৬ অপহৃতকে উদ্ধার এবং ৬ মানব পাচারকারীকে আটক করেছিল যৌথ বাহিনী। উদ্ধার হওয়া ৫০ বাংলাদেশি ও ৬ রোহিঙ্গাকে শুক্রবার রাতে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের অভিযানের পর শুক্রবার সন্ধ্যায় রঙ্গীখালী ও লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরসংলগ্ন গহিন পাহাড়ে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর তল্লাশি শুরু হয়। অভিযানে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), এসআরবি ও পুলিশের দেড় শতাধিক সদস্য অংশ নেন।
অভিযানে সঙ্গে থাকা হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রঙ্গীখালী ও লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের পেছনের দুর্গম পাহাড়ে সকাল থেকে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। কোনো মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়নি, তবে পাচারকারীদের আস্তানা থেকে রান্নার সরঞ্জাম, বিভিন্ন আলামত ও আইডি কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।’
স্থানীয়দের ধারণা, বৃহস্পতিবারের গোলাগুলির পর নিহতদের মরদেহ পাহাড়ে পড়ে থাকলেও যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরুর আগেই শুক্রবার গভীর রাতে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা সেগুলো গুম বা অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলতে পারে।
কাজের প্রলোভনে এনে জিম্মি : পাচারকারীদের হাত থেকে মুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনায় বন্দিশালায় পাচারকারীদের প্রতারণা ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। শুক্রবার রাতে টেকনাফ থানা থেকে পরিবারের কাছে যাদের হস্তান্তর করা হয়েছে তাদের মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী এলাকার আব্দুল কাদেরসহ ছয়জনের একটি দল রয়েছে। আবদুল কাদের জানান, ভালো বেতনে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দালাল চক্র তাদের ছয়জনকে টেকনাফে ডেকে নেয়। কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার বদলে কৌশলে তাদের লেদার গহিন পাহাড়ের বন্দিশালায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাদের মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল।
আরেক বন্দি ইসমাইল জানান, চাকরির প্রলোভনে পড়ে তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে উখিয়া এলে তাকে লেদার একটি ডাকাতদলের কাছে বিক্রি করে দেয় অপরাধী চক্র। তিনি বলেন, ‘টানা ৭ দিন বন্দি ছিলাম। পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। সেখানে ১৪০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল। সশস্ত্র পাহারাদাররা সবার মুঠোফোন ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়ায় বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ ছিল না।’
অন্য এক ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের গোলাগুলিতে কয়েকজন নিহত হয়েছেন বলে শুনেছি। আমি নিজেও বন্দিশালার অদূরে তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। তবে মরদেহগুলো পাচারকারী চক্রের সদস্যদের নাকি বন্দিদশা থেকে পালানোর চেষ্টা করা কারও, তা নিশ্চিত হতে পারিনি।’
স্বজনদের স্বস্তির কান্না : দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনকে জীবিত ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা। শুক্রবার রাতে টেকনাফ থানা চত্বরে অপেক্ষায় ছিলেন ভারুয়াখালী এলাকার অপহৃতের স্বজন ওবায়দুল রহমান। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে ওদের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না। পরে পাচারকারীরা ফোন করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে এবং টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। যৌথ বাহিনীর অভিযানের কারণে ওদের জীবিত ফিরে পেলাম। আমরা এই চক্রের মূল হোতা ও মদদদাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
মানব পাচারের বিশাল নেটওয়ার্ক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় : স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী ও গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, টেকনাফের দুর্গম পাহাড়জুড়ে মানবপাচারকারীদের একটি বিশাল ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। লেদা ও রঙ্গীখালী থেকে শুরু করে বাহারছড়া ইউনিয়নের শিলখালী, মারিশবনিয়া পাড়া, কচ্ছপিয়া এবং নোয়াখালী পাড়ার গহিন পাহাড়ি এলাকাগুলো এই চক্রের নিরাপদ রুট ও বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই পাচারকারী সিন্ডিকেটের পেছনে এলাকার কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ রয়েছে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে পাচারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে নির্বিঘ্নে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাকরি বা বিদেশে পাঠানোর প্রলোভনে লোকজনকে এনে জিম্মি করছে। পরে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় অথবা বাহারছড়া উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের চেষ্টা চালানো হয়।
অভিযান চলবে : কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। লেদা ও রঙ্গীখালীর গহিন পাহাড়ে তল্লাশি চালিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাচারকারী চক্র ও তাদের মদদদাতাদের তৎপরতা সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।’
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার সশস্ত্র পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য মোহাম্মদ তিতাস শেখের (২৭) মৃত্যুর ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আটক ছয় পাচারকারীর বিষয়ে ওসি বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এবং অভিযান চলমান থাকায় আটককৃতদের পরিচয় আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বাকিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’
ওসি আরও জানান, পাচারকারী চক্র দমনে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এর আগে গত অক্টোবর মাসেও মানব পাচারের অভিযোগে টেকনাফ মডেল থানায় তিনটি মামলা হয়েছে, যাতে ১৭ জন আসামির মধ্যে ১৬ জনকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।