এক ছেলে কবরে, আরেক ছেলে লাইফ সাপোর্টে

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১২ এএম

চট্টগ্রাম নগরীর হিলভিউ পাবলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নূর মোহাম্মদ আরাফাত। ১৫-২০ দিন আগে জ্বর, বমি ও সর্দি দিয়ে শুরু হওয়া অসুস্থতা দ্রুত জটিল আকার ধারণ করে। সাউদার্ন ও ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত তাকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে গত শুক্রবার ভোরে ডেঙ্গু, হাম ও নিউমোনিয়ার ত্রিমুখী আক্রমণে মারা যায় আরাফাত। সেদিন সন্ধ্যায় মোমেনবাগ এলাকার কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

বড় ছেলেকে হারানোর শোক সামলানোর আগেই ছোট ছেলে ১০ মাসের মোহাম্মদ আবু বক্করকেও চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে। তারও ডেঙ্গু, হাম ও নিউমোনিয়া। চিকিৎসকরা কোনো আশা দিতে পারছেন না। কেবল দোয়া করতে বলছেন।

সন্তানদের এমন অবস্থায় বিপর্যস্ত বাবা মোহাম্মদ কবির। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মালামাল ওঠানামা করার কাজ করেন তিনি। ছেলেদের চিকিৎসায় ইতিমধ্যে ধারদেনা করে ৪ লাখের মতো টাকা খরচ করেছেন।

কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার ছোট ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে, লাইফ সাপোর্টে আছে। বুকটা কেঁপে উঠছে ভাই। এক ছেলেকে কবরে শুইয়ে এসেছি, আরেক ছেলেও যদি চলে যায়, আমি কী নিয়ে থাকব? ছেলেটার জন্য সবাই দোয়া করুন।

বড় ছেলের বিষয়ে বলেন, বৃহস্পতিবার রাতেও ডাকে সাড়া দিয়েছিল আরাফাত। আইসিইউতে শুয়ে জানিয়েছিল, সে ভালো আছে। সেখানে বেশিক্ষণ থাকার অনুমতি ছিল না। তাই ছেলের সঙ্গে বেশি কথা বলতে পারিনি। সেটিই ছিল ছেলের সঙ্গে আমার শেষ কথোপকথন। হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত আরাফাতের ফুসফুসের পাশাপাশি যকৃতেও জটিলতা দেখা দিয়েছিল।

শুধু কবিরের পরিবার নয়; চট্টগ্রামজুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে সরেজমিন দেখা গেছে, ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত ৫০টি শয্যার বিপরীতে গতকাল রবিবার রোগী ভর্তি ছিলেন ১০৫ জন। ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে রোগীরা বাধ্য হয়ে অবস্থান করছেন মেঝেতে, বারান্দায় এবং প্রধান ফটকের পাশের করিডরে। শিশুস্বাস্থ্য বিভাগেও একই শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

ফটিকছড়ির রুবেল দাশ, পটিয়ার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিংবা নগরীর বাকলিয়ার রিক্তা আক্তারের মতো বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা বাধ্য হয়ে মেঝেতেই নিচ্ছেন চিকিৎসা। রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে টয়লেটসহ সামগ্রিক পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে, যা রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ২১৪ জন। চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৫৪১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ৪১ জন। যদিও চিকিৎসকদের আশঙ্কা, বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নেওয়া এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের হিসাব না থাকায় প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি।

চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ জানান, রোগীর চাপ এখনো কমেনি। অনেক রোগী শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে আসায় তাদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. তসলিম উদ্দিন বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১১০ থেকে ১২০ জনের মতো রোগী ভর্তি থাকেন। আমরা রোগীদের জায়গা দিতে পারি না; শয্যা ও মেঝে পেরিয়ে বারান্দায়ও রোগী রাখতে হয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ডেঙ্গুর এই প্রকোপ নভেম্বর মাসেও থাকবে। আমরা কোনো রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছি না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত