ধর্ষণের পেছনে রাজনীতি

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৩৩ পিএম

নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো একটা জঘন্য কাজের পেছনেও কি রাষ্ট্রব্যবস্থা দায়ী নয়? এই পাশবিক ঘটনার সঙ্গে কি ক্ষমতার রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই? ক্ষমতালিপ্সু উচ্ছৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত রাজনীতির বাই প্রোডাক্ট হিসেবে যে ধর্ষণ বাড়ছে, সেটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ আছে কি?

আজ থেকে দেড় যুগ আগে যেমন নৌকায় ভোট দেওয়ার ‘অপরাধে’ সিরাজগঞ্জে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এক কিশোরী, দেড় যুগ পরে আবার নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার ‘অপরাধে’ ১০-১২ জন মিলে ধর্ষণ করে চার সন্তানের জননীকে। এই ধর্ষণ কি ‘রাজনীতি’র ঊর্ধ্বে?

যদিও ‘ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণেই আমার ওপর নির্যাতন হয়’ মর্মে ধর্ষিতার বক্তব্যের (ডয়েচে ভেলে, ১৪ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত অডিও) পরও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তাদের ‘তদন্ত’ প্রতিবেদনে বলে দিয়েছে, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়া বা ভোট দেওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বা আসামিরা আওয়ামী লীগের কর্মী হওয়া বা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীর মাধ্যমে ওই নারীকে মারপিট ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না।’

অর্থাৎ এই সার্টিফিকেটের মাধ্যমে কমিশন সুবর্ণচরের ধর্ষণের ঘটনা থেকে আওয়ামী রাজনীতিকে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কমিশনের এই সার্টিফিকেট কে বিশ্বাস করবে!

কয়েক দিন আগেই তো এই কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। এবার নির্বাচনে ভোটাররা পছন্দের প্রার্থীকেই ভোট দিতে পেরেছেন। তাই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। পাশাপাশি বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।’ (এসএটিভি, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮)।

জালিয়াতিপূর্ণ যে নির্বাচনে সিংহভাগ প্রার্থী ও ভোটারের কোনো অধিকারই ছিল না, সে নির্বাচনের পরে যে কমিশন আগ বাড়িয়ে সার্টিফিকেট দিয়ে দিতে পারে যে এই নির্বাচনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি, তারা যে সুবর্ণচরে কোনো নারী ধর্ষিত হয়নি বলে রিপোর্ট দেয়নি সেটাই তো সাংঘাতিক আশ্চর্যের ব্যাপার।

‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি’ এবং ‘সুবর্ণচরের ধর্ষণের সঙ্গে ভোটের সম্পর্ক নেই’Ñ এই দুটি সার্টিফিকেটের মাধ্যমে মূলত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি মানুষের ন্যূনতম যে আস্থাটুকু ছিল, সেটাকেও নষ্ট করে দিল কমিশনটি।

গত দশ বছরে ধর্ষণের হারই শুধু বাড়েনি, তার উগ্র রাজনৈতিক রংটাও লেগেছে আগের থেকে অনেক বেশি। দেশের শীর্ষ দুই মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং অধিকারের পরিসংখ্যান দেশে ধর্ষণের যে ধারাবাহিক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, তা কোনোভাবেই একটি সভ্য দেশের পরিচয় বহন করে না।

গত দশ বছরে এ দুটি সংস্থার দেওয়া হিসাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন সাত হাজারের বেশি নারী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন। ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার ৬৩ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাতজন। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন। আর ২০১৬ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭২৪।

এ পরিসংখ্যানের বাইরে অপ্রকাশিত ধর্ষণের সংখ্যা যে কত বড়, তা বলাই বাহুল্য। কারণ হরেক রকম পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কারণে এ দেশে ধর্ষণের বিষয়টি এখনো চেপে রাখেন অনেকেই।

প্রশ্ন হলো এই ধর্ষণের মধ্যেও রাজনীতি, ক্ষমতা আর সরকারকে দায়ী করা সংগত কি না? অন্তত দুটি কারণে ধর্ষণের সঙ্গে এই অনুষঙ্গগুলো জড়িয়ে গেছে।

এক. আলোচিত কিছু ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষক রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী। বিশেষ করে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বহুসংখ্যক ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত হওয়ার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।

দুই. ধর্ষণরোধে ও ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার ছিল বরাবরই নিষ্ক্রিয়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের ভূমিকা ছিল ধর্ষকের জন্য সহায়ক।

সেঞ্চুরিয়ান ধর্ষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন মানিকের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? যে শততম ধর্ষণ শেষে কেক কেটে সেলিব্রেট করেছিল বন্ধুদের নিয়ে। সেই সাইকোপ্যাথ ধর্ষকের কি কোনো শাস্তি এই রাষ্ট্র দিয়েছিল?

কেন দেয়নি? তার পেছনেও রাজনীতি(!)। কারণ সে ছিল তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের নেতা। কথিত আছে, সেঞ্চুরিয়ান ধর্ষক মানিককে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আমাদের সংবাদমাধ্যম বা নারীবাদীরা কি কেউ এ বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান করে দেখেছে কোথায় আজ সেই মানিক? এ তুফান রুখবে কে? বগুড়ার বহুল আলোচিত শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকার এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেই ক্ষ্যামা দেয়নি। তার বিচার চাইতে গেলে ধর্ষিত মেয়ে ও তার মাকে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছিল।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা আরিফ হোসেন হাওলাদারও ছয় নারীকে ধর্ষণ করেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সে ধর্ষণের ভিডিও চিত্র ছেড়ে দিয়েছিল ভার্চুয়াল মিডিয়ায়। পটুয়াখালীর বাউফলে সংখ্যালঘু পরিবারের মা ও মেয়েকে ঘুরতে নেওয়ার নাম করে ট্রলারে তুলে চরে নিয়ে নুরে আলমসহ যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ছয় নেতাকর্মী মিলে ধর্ষণ করেছিল। মা ও মেয়েকে একই সঙ্গে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছিল তারা।

নিজ দলের নেত্রীও রেহাই পায়নি এই নরপশুগুলোর হাত থেকে। সিরাজগঞ্জে ছাত্রলীগ নেতা রিয়াদ হোসেনের ধর্ষণ থেকে বাঁচেননি তার দলীয় নেত্রীও। বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ‘অভিজাত’ ধর্ষণের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগের নাম।

এমন অসংখ্য রিপোর্ট দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে, যা এখনো গুগলে ভাসছে। দলের নাম ও ধর্ষণ লিখে সার্চ দিলে এমন জঘন্য ঘটনার বহু রিপোর্ট ভেসে ওঠে। এদের প্রথম পরিচয় এরা ধর্ষক। কিন্তু তারপরও আলোচিত ধর্ষণগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যাপক হারে জড়িয়ে যাচ্ছে। দল ও সরকার এই জঘন্য ধর্ষকদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে ধর্ষকের কোনো দল নেই বলে সরকার ও দল কি এ দায় এড়াতে পারে?

লক্ষণীয় হলো, মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও চাপ তৈরির আগে এই ধর্ষকদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। বরং তাদের ওপর অনেক সময়ই প্রশ্রয়ের হাত রেখেছে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসন।

নারীবাদী সংগঠনগুলোর নড়াচড়ার ক্ষেত্রেও অনেক সময় রাজনীতির প্রভাব প্রকটভাবে ধরা পড়ে। ধর্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় রেখে তৈরি করা হয় প্রতিবাদের ডিজাইন। যেসব ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হলে নারীবাদী ব্যক্তি বা সংগঠন সমর্থিত রাজনৈতিক দলটি বা সরকার বিব্রত হতে পারে, সেখানে তারা থাকে নীরব। বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়ে প্রতিবাদ করতে বাধ্য হলেও তা হয় নিতান্তই লোক দেখানো, দায়সারা।

রাজনৈতিক ক্ষমতা এ দেশে অহরহ পয়দা করছে ধর্ষক তুফান সরকারদের। এ তুফান রুখতে হলেও চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসন। কত দূরে সেই সুশাসন?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত