রাষ্ট্র যখন নাগরিককে বিব্রত করে

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:২৫ পিএম

রাষ্ট্র যখন তার দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা-যোদ্ধাকে রাজাকার আখ্যা দিয়ে তার নাম সব ধরনের গণমাধ্যমে গৌরবের সঙ্গে প্রচার করে, সাইবার তন্তুজালে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়, তখন ব্যথিত ও বিব্রত নাগরিক যাবেন কোথায়? সর্বশেষ আশ্রয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার বিকল্প তো নেই। প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ অবশ্যই বিব্রত দশা বেশ খানিকটাই লাঘব করবে কিন্তু ক্ষতচিহ্নের দাগ কি মুছবে?

আমাদের নির্লজ্জ রাষ্ট্রব্যবস্থায় দায় নিয়ে পদত্যাগের ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বরখাস্ত করার ক্ষমতা তো কেউ হরণ করেনি। মন্ত্রী জনগণের দোহাই দিয়ে রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে চমক দিয়ে ‘অবিস্মরণীয় কৃতিত্বের অধিকারী’ হতে চেয়েছিলেনÑ নিশ্চয়ই হয়েছেনও; অন্তত যেসব মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আমৃত্যু তারা এবং তাদের স্বজনরা এই মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের নাম স্মরণ রাখবে; যেসব রাজাকার ও রাষ্ট্রদ্রোহীর নাম প্রকাশ করেননি, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তারাও আমৃত্যু তালিকা প্রকাশকদের জন্য দোয়াখায়ের করে যাবেন।

* * *

১৯৮৪-এর ১ জুন বগুড়া কালেক্টরেট থেকে বদলি হয়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত জেলা সিরাজগঞ্জে যোগ দিই। সামরিক শাসন চলছে। একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার স্নেহভাজন হওয়ার কারণে একটি অনানুষ্ঠানিক ব্রিফিংও পাইÑ সিরাজগঞ্জে সবচেয়ে ঝামেলার মানুষটির নাম আবদুল লতিফ মির্জা। সিরাজগঞ্জে যোগ দিয়ে অল্পদিনেই টের পাই বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তার যে গ্রহণযোগ্যতা, নির্ভীক প্রতিবাদের যে ক্ষমতা তা প্রশাসনকে নাস্তানাবুদ করতে পারত। সে সময় দুজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা সিরাজগঞ্জে : একজন মোতাহার হোসেন তালুকদার (জেলা আওয়ামী লীগের প্রধান, পঁচাত্তরের গভর্নর ডেজিগনেট), অন্যজন মির্জা মোরাদুজ্জামান (মওলানা ভাসানীর একনিষ্ঠ সহযোগী এবং বিএনপি নেতা)। ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতা চক্ষুবিশেষজ্ঞ ডাক্তার এম এ মতিন, তিনি মন্ত্রীও। সামরিক শাসনে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলটির আহ্বায়ক আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য, রওশন উল হক, তিনিও মৃদুভাষী সজ্জন, তবে দলবদলের কারণে বিরোধী তরুণরা আড়ালে তাকে বলে নব্য-রাজাকার। জামায়াতের জেলা প্রধান আবু বকর সিদ্দিকীও সুপরিচিত। সরব ও প্রতিবাদী জাসদের প্রধান আবদুল লতিফ মির্জা তাদের মধ্যে বয়ঃকনিষ্ঠ এবং সবাই তাকে সমীহ করেন। আমার কাছে আরও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন লুৎফর রহমান অরুণ, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার।

চাকরির প্রকৃতির কারণে সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়েছিল দুজনের সঙ্গে : লুৎফর রহমান অরুণ এবং আবদুল লতিফ মির্জা। দুজনই মুক্তিযোদ্ধা তাই জেনেছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতন তারা কেবল ধারণই করেননি, ছড়িয়েছেনও। দুজনই আমার বয়োজ্যেষ্ঠ। তখনকার সরকারবিরোধী আন্দোলনে কার্যত প্রধান নেতা ছিলেন আবদুল লতিফ মির্জা। প্রশাসন অচল করে দেওয়ার ডাক তারা দিয়েছেন, ঘেরাও করেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিরাজগঞ্জ সফর প্রতিহত করতে চেষ্টা করেছেন, একবার মন্ত্রীকে বিকল্পপথে জেলা ত্যাগও করতে হয়েছে। অত্যন্ত শক্তিশালী একটি সম্মিলিত ছাত্রসংগ্রাম পরিষদও তখন সক্রিয়। এর মধ্যে আবদুল লতিফ মির্জাকে গ্রেপ্তারের হুকুম হলো বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে। হুকুম পেলেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, আমি আঁচ করলাম এবং তাকে গ্রেপ্তারের পরিণতি বরং প্রশাসনের জন্য আরও বেশি বিব্রতকর হবে মনে করে সংগোপনে তার তখনই জেলা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। তিনিও প্রতিশ্রুতি দিলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে যাবেন। সেদিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমবাগান নামক স্থানে আমার সরকারি আবাসনের দরজায় টোকা। জিজ্ঞেস করি, কে?

যারা আবদুল লতিফ মির্জাকে চেনেন সবাই তার ‘হাস্কি ভয়েস’-এর সঙ্গে পরিচিত। সেই স্বর শুনলাম, ‘খোলেন ভাই, আসামি হাজির।’ আমি তাকে দেখে অবাকই হই, বলি, আপনি কথা রাখেননি। তিনি বললেন, ‘সিরাজগঞ্জ ছেড়ে যেতে মন চায় না। আপনার সঙ্গেই থাকব।’

আমার সেই ব্যাচেলর জীবনের একটিমাত্র খাটে আমি ও আবদুল লতিফ মির্জা রাত কাটালাম। তারই ইচ্ছাতে পরদিন সকালে দরজায় তালা মেরে অফিসে চলে যাই। দুপুরে কখনো বাসায় ফিরিনি, অফিসেই লাঞ্চের কাজটা সেরে নিতাম। কিন্তু সেদিনই প্রথম কিছু খাবার নিয়ে বাসায় ফিরি, তালা খুলি, লতিফ মির্জাকে নিয়ে ভাগাভাগি করে খাই। তিনি আরও একটি রাত আমার সঙ্গে কাটান। প্রথম রাতে স্বদেশি যুগের গণমুখী আমলার মতো কিছুটা উত্তেজনা অনুভব করলেও দ্বিতীয় রাতে আতঙ্কিত হয়ে উঠিÑ আমার বিছানা থেকে লতিফ মির্জা গ্রেপ্তার হলে রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িত থাকার অভিযোগের দায় আমাকেও বহন করতে হবে, চাকরি যাবে, জেলটেলও খাটতে হতে পারে। সুতরাং আমিই বললাম, লতিফ ভাই, এবার আমাকে বাঁচাও।

পরদিন তারই পরামর্শমতো একজনকে খবর দিই। তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে আমার বাসার পাশে অপেক্ষা করেন, পুরনো একটি ভারী চাদরে নিজেকে ভালো করে ঢেকে লতিফ মির্জা তাতে আরোহণ করেন এবং আমাকে ফিসফিস করে বলে যান, পাবনার দিকে যাচ্ছি।

১৯৮৫-এর ১৫ ডিসেম্বর শীতের মধ্যরাতে কজন রংমিস্ত্রি সঙ্গে নিয়ে সিরাজগঞ্জ স্টেডিয়ামের সামনে হাজির হই। পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রুত কাজ হতে থাকে। বাধা আসার সম্ভাবনাও আছে। হঠাৎ কানের কাছে সেই ‘হাস্কি ভয়েস’Ñ চালিয়ে যান ভাই, বাধা এলে আমার ছেলেরা ঠেকাবে, দূর থেকে তারা স্টেডিয়াম ঘিরে রেখেছে। আমিও আছি।

যখন বিজয় দিবসের ভোরের আলো দেখা দেয় আমরা আনন্দিত ও শিহরিত হইÑ স্টেডিয়ামের নাম বদলে গেছে : শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ স্টেডিয়াম। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে আসা অতিথি এবং আমজনতা মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখেন তাদের স্টেডিয়ামের নামকরণ হয়েছে শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ স্টেডিয়াম। এই প্রস্তাবটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের, এটাই চেয়েছিলেন লুৎফর রহমান অরুণ। একাত্তরে সিরাজগঞ্জের এসডিও অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন আহমেদ পরবর্তীকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে নিহত। এখন মুক্তিযোদ্ধার নামে স্টেডিয়ামের নামায়ন সহজ কাজ মনে হতে পারে। সে সময় লতিফ মির্জার মতো সাহসী মানুষের প্রত্যক্ষ সমর্থন না পেলে এ কাজটি করা সম্ভব হতো না। সিরাজগঞ্জ উল্লাপাড়ার আবদুল লতিফ মির্জা পরবর্তী সময় আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সিরাজগঞ্জে  আমার কর্মকালে অন্যদের মুখেও উল্লাপাড়া শাহজাদপুর, তাড়াশ ও রায়গঞ্জ এলাকায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ মির্জার সাহসী কর্মকাণ্ডের কথা শুনেছি।

* * *

বিস্মিত আমিও হয়েছি! রাজাকারের তালিকা পাঠ করে নয়, উল্লাপাড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবাদের সংবাদ পড়ে, তখনই জেনেছি তালিকায় লতিফ মির্জাও আছেন। তালিকাটি স্থগিত হয়েছে। প্রশাসনিক ভাষা ব্যবহারের সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানেন স্থগিত মানে বাতিল নয়। যদি বাতিল না-ই হয়ে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি এখনো তা-ই রয়ে গেছেনÑ যেভাবে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে! অন্তত এক যুগ আগে আবদুল লতিফ মির্জা প্রয়াত হয়েছেন। ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন যে, তিনি প্রয়াত, নতুবা যুদ্ধ অপরাধবিষয়ক মামলার প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর মতো জীবদ্দশায় তাকে যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো।

 

একটি জাতীয় দৈনিকে ১৮ ডিসেম্বরের একটি অমিয় বচন প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর বচন : ‘রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করে মৌচাকে ঢিল মেরেছি।’

ঢিলটি কি তিনি জেনেশুনেই মেরেছেন?

রাষ্ট্র নাগরিককে অবশ্যই বিব্রত করতে পারে না। কিন্তু রাষ্ট্রকে যারা বিব্রত করল আমলা-রাজনীতিবিদÑ যারাই হোন, রাষ্ট্র কি তাদের ‘ইমপিউনিটি’ও দিয়েছে? মুক্তিযোদ্ধা নন কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটধারী এবং বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগীÑ তাদের তালিকাটিও কম জরুরি নয়।

 

 

লেখক

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত