বাংলাদেশে বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিবিএস জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার, যার মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমান শিশুর সংখ্যা ০৬ কোটিরও বেশি। এই বিশাল সংখ্যক নারী ও শিশু দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং নারী ও শিশুর ওপরই অনেকাংশে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। কিন্তু নারী ও শিশুরাই সমাজে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। নারীর প্রতি সহিংসতার দুই-তৃতীয়াংশই হয় পারিবারিকভাবে। যৌতুক দাবি, দ্বিতীয় বিবাহের অনুমতি না পাওয়া, স্বামী ছাড়া পরিবারের অন্য কোনো পুরুষ সদস্য কর্তৃক কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়া, ছেলেসন্তান লাভের প্রত্যাশা, মাদকাসক্ত স্বামী ইত্যাদি কারণে একজন নারী পারিবারিকভাবে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এসব নির্যাতনের খবর কখনো কখনো সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়, আর অধিকাংশ ঘটনাই ভিকটিম নিজে সহ্য করে নেয়। ফলে অপ্রকাশিত থেকে যায়। অন্যদিকে, শিশুদের প্রতিও পারিবারিকভাবে নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শত্রুপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য নিজের শিশুসন্তানকে গভীর রাতে নৃশংসভাবে হত্যার খবরও সাম্প্রতিককালে পত্রিকায় এবং টেলিভিশনে প্রচার হয়েছে। বর্তমান যুগে পরীক্ষা এবং ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অভিভাবকদের আসক্তিও শিশুর প্রতি মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন বৃদ্ধির কারণ। অভিভাবকরা অনেক সময় সন্তানের ওপর অধিকার চর্চা করতে গিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে সন্তানকে মানসিকভাবে নির্যাতন করেন। স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলেও অনেক সময় সৎ মা অথবা সৎ বাবা কর্তৃক শিশু নির্যাতনের শিকার হয়। কোনো শিশু প্রতিবন্ধী হলে দেখা যায়, সমাজের লোকজনের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের দ্বারা অবহেলার শিকার হয় যা তাকে মানসিকভাবে চরমভাবে হতাশাগ্রস্ত করে। বয়ঃসন্ধিকালে শিশুদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়। এসময় পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের কাছ থেকে সহযোগিতামূলক আচরণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক পরিবারে বয়ঃসন্ধিকালীন শিশুরা তাদের পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার এই বিষয়টি বহু আগেই আন্তর্জাতিক পরিম-লে আলোচিত হয় যার ফলে জাতিসংঘ ১৯৭৯ সালে ঘোষণা করে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ এবং ১৯৮৯ সালে ঘোষণা করে শিশু অধিকার সনদ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে নারী ও শিশুদের সমঅধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু বাংলাদেশে নারী ও শিশু সংক্রান্ত বিভিন্ন ফৌজদারি আইন থাকলেও ২০১০ সালের আগ পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কিত বিশেষ কোনো আইন ছিল না। ২০১০ সালেই সরকার নারী ও শিশু সংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদ এবং সাংবিধানিক অঙ্গীকার বিবেচনায় নিয়ে নারী ও শিশুদের পারিবারিক সহিংসতা থেকে রক্ষার জন্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ প্রণয়ন করে এবং ২০১৩ সালে এই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করে।
কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ খুব একটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আইন প্রয়োগের জন্য সর্বাগ্রে যেটা প্রয়োজন তা হলো উক্ত আইন সম্পর্কে সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতা। প্রথমেই যেটা জানা জরুরি তা হলো যেকোনো বয়সের নারী এবং আঠারো বছর পূর্ণ হয়নি এরকম কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীনে কী সুরক্ষা পাবেন। রক্তের সম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্ক অথবা যৌথ পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে এই আইন প্রযোজ্য। অর্থাৎ রক্তের সম্পর্ক, বৈবাহিক সম্পর্ক অথবা যৌথ পরিবারে একসঙ্গে থাকা হয় এরকম কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার প্রতিকার চেয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এক্ষেত্রে ভিকটিমকে সার্বিক সহায়তার জন্য রয়েছে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা এবং তালিকাভুক্ত এনজিওসহ সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ কর্মকর্তা যারা মামলা দায়েরের পূর্বেই ভিকটিমকে এককভাবে অথবা যৌথভাবে সার্বিক সহায়তা করতে পারবেন। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন তাদের এই ক্ষমতা অর্পণ করেছে। উল্লিখিত তিনটি সংস্থার যেকোনো সংস্থা কোনো ব্যক্তির মৌখিক অথবা লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে ভিকটিমকে মামলা দায়েরসহ সার্বিক আইনি সহায়তা করবেন। আর ভিকটিম যদি অসহায় ও দরিদ্র হয়ে থাকেন তাহলে তার জন্য রয়েছে আইনগত সহায়তা সংস্থা। যা বাংলাদেশ সরকারের আরেকটি জনবান্ধব উদ্যোগ। দেশের প্রত্যেক জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন অফিসে এই সংস্থার কমিটি রয়েছে। এই সংস্থা ভিকটিমের আবেদনের ভিত্তিতে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ অনুসারে প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ করে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য সদাপ্রস্তুত রয়েছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং যৌন নির্যাতন এমনকি স¤পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করলেও পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন অনুসারে প্রতিকার দাবি করা যাবে। আইনে আরও বলা হয়েছে, পারিবারিক সহিংসতার অপরাধের বিচার হবে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। উক্ত আইনের অধীন আদালত ভিকটিমকে সুরক্ষা আদেশ অথবা নিরাপদ হেফাজতে রাখার আদেশ দিতে পারেন। সুরক্ষার আদেশ লঙ্ঘন করলে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান যার ফলে এই আইনকে নারী ও শিশুবান্ধব আইন বলা অযৌক্তিক হবে না। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কেমন হবে তা আইনে নির্দিষ্ট না করে ম্যাজিস্ট্রেটের সুবিবেচনার ওপর অর্পণ করেছে। ম্যাজিস্ট্রেট যা ন্যায়সঙ্গত মনে করবেন সে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ প্রদান করতে পারবেন।
অনেক সময় ধারণা করা হয়, মামলা করলে আদেশ পেতে অনেক সময় লাগতে পারে। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনে আবেদন নিষ্পত্তির সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তার প্রতি নোটিস জারির ৬০ কর্মদিবসের মধ্যে আদালতকে এই মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে এই সময় আরও ১৫ কর্মদিবস পরে আরও সাত কর্মদিবস পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়েছে। ভিকটিমকে দ্রুত ন্যায়বিচার প্রদানের জন্য সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে বিচারের বিধান রাখা হয়েছে। যেহেতু পারিবারিক বিষয় নিয়ে মামলা সেহেতু পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষারও সুযোগ রাখা হয়েছে এই আইনে। উভয় পক্ষ চাইলে নিভৃত কক্ষে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা জরুরি। প্রয়োজন এই আইনের ব্যাপক প্রয়োগ। এই বিষয়ে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে যারা নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে থাকে তারাও বিস্তৃত হারে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে পারে। তাহলে যাদের দ্বারা এই আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনা রয়েছে অর্থাৎ সম্ভাব্য অপরাধীরাও হয়তো সচেতন হবে। তবে ব্যাপকহারে বাস্তবায়ন শুরু হলে পারিবারিক সহিংসতার নতুন নতুন ধরন চিহ্নিত হবে এবং প্রচলিত আইনে প্রতিকার না থাকলে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনকে যুগোপযোগী করা যাবে। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় এই আইনই হতে পারে এক অনন্য মাইলফলক।
লেখক : সিনিয়র আইন গবেষণা কর্মকর্তা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল