গত বুধবারের ঘটনা। ঘটনাস্থল সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রাম। ইসলাম অবমাননার মিথ্যে এবং চিরাচরিত অভিযোগে এলাকার এবং আশপাশের গ্রামের হেফাজত সমর্থক উগ্রপন্থিরা ওই গ্রামে প্রকাশ্য দিবালোকে তা-ব চালিয়ে হিন্দুদের শতাধিক বাড়ি ও বেশ কয়েকটি মন্দির ভাঙচুর, লুটপাট করে বাধা-বিপত্তিহীনভাবে চলে যায়। তারা একটি মন্দির থেকে একটি কষ্টিপাথরের মূর্তিও নিয়ে যায়। কারণ? আগের দিন ঐ গ্রামে হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হক ওয়াজ করেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রোতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াজ করার সময় তিনি ‘উসকানিমূলক সাম্প্রদায়িক’ বক্তব্য দেন। জানা যায়, ঐ গ্রামের ঝুমন দাস আপন নামের এক যুবক ফেইসবুকে মামুনুল হকের ঐ বক্তব্য ‘সাম্প্রদায়িক ও আপত্তিকর’ হিসেবে উল্লেখ করে তার ফেইসবুক ওয়ালে একটি পোস্ট দেন। সঙ্গে সঙ্গে পোস্টটি ভাইরাল হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ঘটনা জানা মাত্রই কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা জানিয়ে পোস্ট দেন। বাকি ঘটনা সবারই জানা।
পরদিন, ১৮ মার্চ সকালে ৭১ টেলিভিশন ও অপর কোনো কোনো চ্যানেলে খবরটি সচিত্র প্রচার করা হয়। বেশির ভাগ জাতীয় দৈনিকে সবিস্তারে ঐ ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই ঘটনা নিয়ে আজকের এই নিবন্ধ। এ জাতীয় বহু ঘটনা দশকজুড়ে ঘটে আসছে সবগুলো নিয়েই লিখেছি। কিন্তু এ ঘটনাটি এমনই, হৃদয়ে আঘাত করেছে এতটাই যে, লিখতে বসলেও কলম আর চলতে চাইছে না। কতই বা লেখা যায় একই জাতীয় ঘটনা নিয়ে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত পত্রিকাগুলোর বর্ণনা পড়ে বাধ্য হয়েই না লিখে পারছি না।
কক্সবাজারের রামু হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, পাবনার বনগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুরের পীরগাছার ঘটনা দশকব্যাপী ঘটার পর সর্বশেষ সুনামগঞ্জের নোয়াগাঁও গ্রামে তা-ব সবটাই একই সূত্রে গাঁথা। একই অভিযোগ ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার ১৬ মার্চ দিরাইয়ে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে আসেন মামুনুল হকসহ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতারা। মামুনুল হক ঐ সমাবেশে নানা উসকানিমূলক কথাবার্তা বলেন। এরই প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে পরদিন শাল্লা উপজেলার হাবিবপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস আপন তার ফেইসবুক পোস্টে মামুনুল হকের সমালোচনা করেন। এই পোস্ট দেওয়াকে ‘ধর্মীয় উসকানি’ আখ্যা দিয়ে হেফাজত নেতার অনুসারীরা উত্তেজনাকর স্লোগান দিয়ে রাতের বেলায় বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় গ্রামবাসীরাই ঝুমনকে ধরে পুলিশে হস্তান্তর করেন। ঝুমন পুলিশ হেফাজতেই আছেন। গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন মঙ্গলবার বিকেল থেকেই তারা শুনছিলেন তাদের গ্রামে হামলা হতে পারে। কাশিপুর, চ-ীপুর ও নাচনী গ্রামে মাইকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিষোদগার হচ্ছিল। এতে ঘরে ঘরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঐ দিন রাত ৮টার দিকে হাবিবপুর নোয়াগাঁওয়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বৈঠকে বসেন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া ঝুমন দাসকে গ্রামের লোকজনদেরই আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। এরপর ঝুমনকে ধরার জন্য প্রত্যেকটি সম্ভাব্য স্থানে মোটরসাইকেলে লোক পাঠানো হয়। রাতে উপজেলার স্বাখাই বাজার থেকে ঝুমনকে গ্রামের লোকজনই আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এরপর গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জড়ো হয়ে পুলিশ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতাদের ফোন করেন। তারা সবাই আশ্বাস দেন, এখন আর কিছু হবে না সবাই যার যার বাড়িতে অবস্থান করেন।
কিন্তু পরদিন সকাল ৭টা থেকে দিরাইয়ের নাচনী, চন্ডীপুর ও শাল্লা উপজেলার কাশিপুর গ্রামের মসজিদের মাইকে সবাইকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরেই সকাল ৮টার দিকে কয়েকশ মানুষ দেশি অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে একযোগে হামলা করে। তার আগে মানুষ জমায়েত হওয়ার ব্যাপারে প্রচারিত সংবাদ নোয়াগাঁও গ্রামে পৌঁছালে গ্রাম থেকে থানায় ফোন করে জানানো হয়। হামলাকারীরা হিন্দুদের বাড়ি খুঁজে খুঁজে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ভাঙচুর করা হয় গ্রামের চন্ডী মন্দির, দুর্গামন্দির, কালী মন্দির, শিব মন্দির ও বিষ্ণু মন্দিরে। এর আগেই এসব মন্দিরের পুরোহিতরাও প্রাণভয়ে গ্রাম ছেড়ে হাওরের দিকে চলে যান। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলে তা-ব। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাশের ছেলে লিটন দাস বলেন, আমাদের বাড়িতে নাচনী গ্রামের ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়া ও পক্কন মিয়া বলছিল ‘এটি জগদীশের বাবার বাড়ি। ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও’। লিটন বলেন, এ কথা আমি ওপর থেকে শুনছিলাম। তবে দরজা ভাঙতে না পেরে আমাদের মাঝের হাটির অন্য বাড়িতে চলে যায়। পরে আবারও ফিরে এসে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবীণ হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করে। বাবা পরে তার শো-কেসের ড্রয়ার থেকে দশ হাজার টাকা এনে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলে তারা টাকা নিয়ে চলে যায়।
গ্রামের অসীম চক্রবর্তী বলেন, তার বাড়ির বিষ্ণু মন্দির ভাঙচুর করে শত বছরের পুরনো কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। স্থানীয় হাবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ দাস জানিয়েছেন, হামলাকারীরা তার নিজের ঘরসহ ৯০টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেছেন। শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আল আমিন চৌধুরী বলেন, ৮৮টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। বিত্তশালীদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট হয়েছে বেশি। শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক বলেন, আমরা পৌঁছার আগেই নদী পার হয়ে কিছু মানুষ সেখানে গিয়ে হামলা করে। তবে বেশির ভাগ মানুষকে আটকাতে পেরেছে পুলিশ।
এমন ঘটনা আমাদের, দেশবাসীকে বছর বছরই প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। নোয়াগাঁও বর্বরতা নিয়ে এই লেখাটিই সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা নিয়ে শেষ লেখা হোক এমন কামনা করি। তবে এই ঘটনা কতিপয় গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। তা হলো:
এক. মামুনুল হক যখন উত্তেজনাকর বক্তব্য দিলেন তখনই বা এ যাবৎ তাকে গ্রেপ্তার করা হলো না কেন?
দুই. যারা আগের রাতে হিন্দুদের হামলা করার সেøাগান দিয়ে মিছিল করল তৎক্ষণাৎ বা তারপরে আজতক গ্রেপ্তার করা হলো না কেন?
তিন. হিন্দুরা যখন থানাকে জানাল তৎক্ষণাৎ পুলিশ এসে আতঙ্কিত হিন্দুদের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা করল না কেন?
চার. ঘটনা ঘটল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে? আওয়ামী লীগ কেন প্রতিরোধ করল না?
পাঁচ. স্পষ্টত থানার পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের কর্তব্য পালনে গুরুতর অবহেলা প্রদর্শন করে এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটার সুযোগ করে দিয়েছেন অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধেই বা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে না কেন?
ছয়. একটি ফেইসবুক পোস্ট দিয়ে মামুনুল হকের উসকানিমূলক বক্তব্যের সমালোচনা করা যদি অপরাধ হয়ে থাকে তবে হিন্দুদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া, তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা, মন্দির ও বিগ্রহ ভাঙা কেন ‘ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত বা ধর্মের অমর্যাদা’ করা হয়েছে বলে বিবেচনা করে উপযুক্ত আইনে মামলা দায়ের হচ্ছে না কেন?
সাত. হেফাজতে ইসলাম কি আইনের ঊর্ধ্বে?
লেখক : সাংবাদিক। সভাপতিম-লীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ