স্বাধীনতার পর অর্ধ শতক অতিক্রম করেছি। অথচ আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি কোনো পর্বেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে পারেনি। ফলে সব দলই গণতন্ত্র চর্চার বদলে দলবৃত্তে আটকে পড়েছে। তাই দুর্নীতিগ্রস্ততা থেকে দল, সরকার, প্রশাসন কোনো কিছুকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। করোনাক্রান্ত এই দুঃসময়েও যার যেদিকে দুর্নীতি করার সুযোগ রয়েছে তারা সেখান থেকেই দু পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দুর্নীতিই হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ এদেশের হাজার বছরের ইতিহাস বলে প্রাচীন ও মধ্যযুগ পর্বের অধিকাংশ রাজবংশের শাসকরা জনগণের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কর্তব্যজ্ঞান করতেন শাসকরা।
প্রাচীন বাংলায় তিন ধরনের লিপি বা লেখমালা পাওয়া গেছে। যেমন তাম্রশাসন, মূর্তিলিপি এবং শিলালিপি। ধারাবাহিক বিদেশি শাসনের অবসানের পর আট শতকের মাঝ পর্বে প্রতিষ্ঠিত পাল শাসনের ৪০০ বছর জনজীবনে স্থিতিশীলতা এসেছিল। এই সময়কালে বাংলার রাজারা বিভিন্ন সময়ে তাদের বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারি করতেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জমি দান করতে রাজাজ্ঞা তামার পাতে লিখে প্রচার করতেন। এসব তাম্রশাসন অধ্যয়ন করে সমকালের রাজ্যশাসন পদ্ধতি ও জনজীবনের সঙ্গে রাজাদের সম্পর্ক আঁচ করা সহজ। ধর্মবাণী প্রচার, বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের সময় শিলালিপি খোদাই করা হতো। এসব লিপি উত্তরকালে ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত হয়েছে।
নগর সভ্যতা বিকাশের সূত্রে বাংলাদেশের প্রাচীন কালপর্বের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব চার শতকের দিকে। এ সময় ভারতের মৌর্য সম্রাট অশোকের ‘ভুক্তি’ বা প্রদেশে পরিণত হয় উত্তর বাংলা। এই প্রদেশের নাম হয় পুন্ডুবর্ধন ভুক্তি। প্রত্নস্থলটির সর্ব নিম্নস্তরে পাওয়া ব্রাহ্মী অক্ষরে লেখা প্রাচীনতম শিলালিপিতে পুন্ড্রনগর সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। লিপিভাষ্য থেকে জানা যায় সে সময় পুন্ডুবর্ধন ভুক্তির রাজধানী ছিল আজকের মহাস্থানগড় আর তখনকার পুন্ড্রনগর। লিপি থেকে জানা যায় এর কিছুকাল আগে জনসাধারণের ওপর প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো দুর্যোগ নেমে এসেছিল। তাই মৌর্য সম্রাট অশোক পুন্ড্রনগরের প্রশাসককে আদেশ দিয়েছিলেন তিনি যাতে দ্রুত অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ান। তাদের মধ্যে খাদ্যশস্য ও কড়ি বিতরণ করেন। এতে বোঝা যায় রাষ্ট্রব্যবস্থা সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। ৮ শতক থেকে প্রতিষ্ঠিত পাল রাজাদের অধীনে ছিল বাংলা। এ পর্বে দু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বাংলার সমৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো। পাল রাজারা ধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেছিলেন। এ যুগপর্বে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে শিক্ষা, শিল্পকলা, সাহিত্য সব ক্ষেত্রে বাংলা উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছিল।
কিন্তু ছন্দপতন ঘটে এগারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে। পালদের কাছ থেকে সিংহাসন কেড়ে নেয় দক্ষিণ ভারত থেকে আসা ব্রাহ্মণ সেনরা। বর্ণবৈষম্য ছড়িয়ে দিয়ে এদেশের সাধারণ মানুষকে কোণঠাসা করে রাখতে চেয়েছিলেন সেন রাজারা। এ কারণে সেন শাসন যুগে সুশাসন সুদূর পরাহত ছিল। ফলে সমাজ বিক্ষোভ অশান্ত করে তোলে বাংলাকে। আর এর সুযোগ নিয়ে বহিরাগত মুসলমান শাসকরা বাংলার ক্ষমতা দখল করে। তেরো শতকের শুরুতে মুসলমানরা রাজদ-ই শুধু গ্রহণ করেনিএ দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে নতুন ধর্ম-সংস্কৃতি আর সমাজ জীবনের ধারণা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত দেশীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক কাঠামোও অব্যাহত ছিল। ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ধারণার সঙ্গে মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটতে থাকে। এর মধ্যদিয়ে বাংলার সংস্কৃতি ও সভ্যতায় আসতে থাকে রূপান্তরের ধারা। জীবনের সব ক্ষেত্রে নতুন ঐতিহ্য গড়ে। সুলতানি শাসনের প্রায় পুরো সময়টি জুড়েই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। সমাজচিন্তা, শিক্ষা, শিল্পবোধ, ধর্মভাবনা সব ক্ষেত্রেই আসে আলোড়ন। বাঙালির সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবয়ব এভাবে পরিপুষ্ট হতে থাকে মধ্যযুগব্যাপী।
মুসলমান শাসকরা মধ্যযুগব্যাপী বাংলার শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। একই ধর্মগোষ্ঠী অথবা বলা চলে অভিন্ন সংস্কৃতির ধারক শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে এদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক পরিবর্তনের ধারা সংযোজিত হয়। এ সময় মুসলমান সুলতানদের সহযোগিতায় একদিকে তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গী হয়ে সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার বিকাশ ঘটে, অপরদিকে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অমুসলিম প্রজাদের প্রতি সহনশীল মনোভাব প্রকাশ করেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। এরই পথ ধরে বাংলায় সমাজ ও সংস্কৃতির অঙ্গনে আসে রূপান্তর।
মধ্যযুগে বাঙালির নতুনতর আত্মপরিচয় বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রকে বিশেষায়িত করেছে। বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের (১৩৩৮-১৫৩৮) গুরুত্ব এজন্য যে, এ পর্বের কর্মপ্রবাহ ও প্রতিভার পথ ধরে সেই সমকাল ও পরবর্তী যুগের রাজনৈতিক সংহতি, সমাজ সংগঠন, সাংস্কৃতিক কাঠামোর একটি নিজস্ব ধারা তৈরি হয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিকাশ ঘটে। শাসকদের সুশাসন প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যে উজ্জ্বল ধারা সূচিত হয়েছিল সুলতানি যুগে, মোগল যুগেও এর দীপ্তি কমেনি। বরঞ্চ কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এভাবে মধ্যযুগব্যাপী বাঙালি যে ঐতিহ্য গড়েছে, মনন ও মেধার ক্ষেত্রে তারা যে উৎকর্ষ সাধন করেছে এসব সত্য এখন আমাদের প্রেরণা হতে পারে।
সুলতানদের উদার মনোভাব ও সুশাসনের কারণে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতিমূলক সহাবস্থান নিশ্চিত হয়। এভাবে যে শক্তিশালী সমাজ সংগঠন ত্বরান্বিত হয় এর বহু দৃষ্টান্ত মধ্যযুগের সাহিত্যে পাওয়া যাবে। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে মোগল শাসনপর্ব বাংলার ইতিহাসে একটি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসে। স্বাধীন সার্বভৌম সুলতানি বাংলার যা কিছু বিকাশ তা ঘটেছিল বাংলার ভৌগোলিক সীমাকেই কেন্দ্র করে। স্বাধীন সুলতানদের পিতৃভূমি ভারতের বাইরে হলেও এবং তারা ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক হলেও কর্মভূমিকায় তারা যেন বাঙালি হয়ে গিয়েছিলেন। পিতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার কোনো আকাক্সক্ষা বা উদ্যোগ তাদের ছিল না। তাই বাংলার সব ধরনের সমৃদ্ধি অর্জনের দিকেই তাদের নজর ছিল। কিন্তু মোগল পর্ব থেকে বাংলার স্বাধীন সার্বভৌম চরিত্রটি ভেঙে গেল। দিল্লির মোগল সম্রাটদের অধীনস্ত একটি প্রদেশ বা সুবায় পরিণত হলো বাংলা। মোগল যুগে বাংলার সঙ্গে উত্তর ভারতের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। শুধু ভারত নয় এদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার অনেক দেশের সঙ্গে। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের চিন্তাভাবনা ও আচরণের সঙ্গে বাংলার মানুষের পরিচয় ঘটে। এর প্রতিফলন দেখা যায় তাদের জীবনের নানা ক্ষেত্রে।
সুলতানি যুগের মতো মোগল যুগেও শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। এ সময় বাংলায় নিয়োজিত কর্মচারীরা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। শিক্ষার প্রতি তাদের যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। মোগল যুগে অনেক কবি, শিক্ষক, চিকিৎসক প্রমুখ নানা পেশার লোকও এসেছিলেন বাংলায়। ফলে এদের চেষ্টায় ও প্রভাবে বাংলার সমাজ জীবনে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণা না থাকলেও এসব যুগপর্বে শাসকদের আচরণ প্রায়োগিকভাবে গণতান্ত্রিক ছিল। বর্তমান সময়ের মতো দলবাজ দুর্বৃত্ত রাজনীতি না থাকায় রাজাদর্শেই ছিল সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। অথচ আজকের আধুনিক সময়ে এসে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অধরা হয়ে গেল সুশাসন।
আমাদের ধারণা এখনকার ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন তারা মোটেও ক্ষমতার বাইরে থাকতে চান না। ফলে শক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করে টিকে থাকতে চান বলে নিজেদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে চলে যায়। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় গণশক্তি নয় পেশিশক্তির ওপর ভরসা বেড়ে যায়। এই বাস্তবতায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে না। সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে না বলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় দুর্নীতি। এভাবে দুর্নীতি আর অপশাসন শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে।
এই কথাটি অনেকে বিশ্বাস করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিমুক্ত মানুষ। কিন্তু নিজে আন্তরিক হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রকে দুর্নীতিমুক্ত করা তার জন্যও কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ বর্তমান রাজনীতির কাঠামোতে দলবৃত্তের বাইরে গিয়ে জনগণের দলে পরিণত হওয়া কঠিন। এ কারণে বারবার দলীয় অন্যায় আর সন্ত্রাসকে ছাড় দিতে হয়। দুর্নীতিবাজ নেতানেত্রীরা শেষ পর্যন্ত প্রশ্রয় পান। প্রশাসনিক দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য শক্তি প্রয়োগ শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয় না। ক্ষমতার রাজনীতি বুঝতে দেয় না সাময়িক লাভ বা জয় পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছাতন্ত্র স্থায়ী বিপদ ডেকে আনতে পারে। বর্তমান বিএনপির বিপন্ন দশা এর একটি ভালো উদাহরণ। বিএনপি নেতৃবৃন্দ যদি দলের ভেতরেও সামান্য গণতান্ত্রিক আচরণ বজায় রাখতে পারতেন তবে এতটা অধোগতি দেখতে হতো না।
দৃশ্যত প্রতিপক্ষ না থাকায় লাগাম ছাড়া হয়ে গেলে আওয়ামী লীগের পরিণতিও যে খুব ভালো হবে সেকথা হলফ করে বলা যায় না। বরঞ্চ কিছুটা নির্ভার হওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। এ কথা সত্য করোনা পরিস্থিতি আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ধারা কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। একই সংকট পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের জন্যই সত্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় থাকার মতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন। এবার যদি তিনি দলীয় সন্ত্রাস দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারেন তবে তার পক্ষে সহজ হবে প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হওয়া। এসব ক্ষেত্রে সাফল্য পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে। আমরা প্রতিদিন তেমন ক্ষণের প্রতীক্ষা করছি।
লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়