প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাসে একদিন হঠাৎ এসেছেন ক্রীড়াশিক্ষক খোন্দকার গিয়াস উদ্দিন। গিয়াস স্যারের চেহারা নিরীহদর্শন, অথচ খেলার মাঠে যাদের উপস্থিতি তারা জানে সেখানে কী কড়া মানুষ তিনি, এমনিতে তার আচরণ সব সময়ে খুবই স্নেহপ্রবণ। সেদিনের আগে শহরের অন্য কোনো দিনের বা সময়ের অনুষ্ঠানে, যেমন বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস ইত্যাদিতে মানবশরীর শরীরচর্চা ও খেলাধুলার গুরুত্ব ইত্যাদি নিয়ে দু-একবার তার কথা শোনার সুযোগ হয়েছে আমাদের কারও। সেখানে অনায়াসে পরিশ্রম বা অধ্যবসায় নিয়ে তিনি ক্রীড়াসহ সাহিত্য-সংস্কৃতি এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও উদাহরণ দিতেন। বলতেন দারুণ গুছিয়ে ধীর ও অনুচ্চ কণ্ঠে, কথায় যুক্তি কখনো প্রসঙ্গ হারাত না। কিন্তু সেই শোনা তো কোনোভাবেই ক্লাসরুমের নয়, সাধারণ বক্তৃতা।
এখন এসেছেন ক্লাসে, নির্ধারিত শিক্ষক মহাশয় আসেননি, সেই সময়ে, হয়তো তপ্ত দুপুরে মাঠেও কোনো কাজ না থাকায়, (কারণ, গ্রীষ্ম-বর্ষা বাদে কলেজ মাঠে ক্রিকেট লেগে থাকত, সারা বছর সকাল ৯টার আগে ফুটবল, বিকেলেও) গিয়াস স্যার এসেছেন একটি অনির্ধারিত ক্লাস নিতে। বিজ্ঞানের ছাত্রদের ক্লাস। দ্বাদশ শ্রেণির চঞ্চলতা প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর চোখেমুখে। সেটি তার লক্ষ না-করার কোনো কারণ নেই। তিনি অধ্যবসায় নিয়ে কথা বললেন। সে সবের আজ আর কিছুই মনে নেই। কিন্তু একটু বাদে শুরু করলেন একেবারেই ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ।
একদিন এই কলেজে এসে হাজির এক সাহেব। তিনি এসে অধ্যক্ষ মহোদয়কে জানিয়েছেন, এই কলেজে এক সময়ে চাকরি করেছেন জীবনানন্দ দাশ। বেশি দিন নয়, মাত্র আড়াই-তিন মাসের মতো। এখন সাহেব সেই ১৯২৯ সালের কাগজপত্র দেখতে চান। গিয়াস স্যার কলেজের প্রবীণতম শিক্ষক, সরকারি হওয়ার আগে পরে মিলিয়ে তিরিশ বছরের বেশি এটাই তার কর্মস্থল। ফলে তার ওপরে ভার পড়েছে কলেজের পুরনো সময়ের কাগজপত্র কিংবা সে সময়ের বিষয়ে কিছু যদি তিনি সাহেবকে জানাতে পারেন।
গিয়াস স্যার বিষয়টা ঘুরিয়ে নিয়েছেন, নিজে যে সেই কাজে অংশগ্রহণ করেছেন, তা আমাদের জানানো তার উদ্দেশ্য নয়। তিনি জানিয়েছেন, এখন যতটা মনে আছে, জীবনানন্দ দাশের মতন একজন কবি, বরিশালের লোক, সেখানকার ব্রজমোহন কলেজ আর কলকাতা ও অন্যান্য জায়গায় কলেজে চাকরি করেছেন, তিনি তার জীবনের খুবই অল্প সময় কাজ করেছেন এই কলেজে, ওই সাহেব গবেষক সেইটুকুও তার কাজের বাইরে রাখতে চাননি, তাই খুঁজতে চলে এসেছেন এখানেও। এই হলো উন্নত জাতির অধ্যবসায়। যে কাজ শুরু করবে একেবারে তার খোলনলচে-সমেত দেখে ছাড়বে। তাই তারা জাতি হিসেবে এত বড়। এগিয়ে আছে। পৃথিবীকে শাসন করছে। সেদিন গিয়াস স্যার তার সঙ্গে স্বল্পকালীন পরিচয়ের সেই বিলেতি গবেষকের নাম বলেননি। বললেও মনে নেই কী বলেছিলেন। ঘটনাটি আজ থেকে অন্তত বছর পঁয়ত্রিশ কি তারও আগের, আমাদের বলেছিল তাও তো বত্রিশ-তেত্রিশ বছর হবে। অনুমান করি ভদ্রলোকের নাম ক্লিন্টন বি সিলি। জীবনানন্দকে নিয়ে প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থটি তার লেখা, আ পোয়েট অ্যাপার্ট, ফারুক মঈনউদ্দীনের অসাধারণ অনুবাদে ‘অনন্য জীবনানন্দ’।
তবে, আমাদের সেই বয়সে এসব কথা তো কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ারই কথা। তাই গিয়েও ছিল। কোথাকার কোন একজন সাহেব এসেছেন, কী পুরনো খাতাপত্তর দেখেছেন, তা জেনে আমাদের কী? তার চেয়ে স্যার যদি এই ক্লাসটা না নিতেন, তাহলে বাইরে ঘুরতে পারতাম। তাই ছিল ভালো। ক্লাস ফাঁকি দেওয়াই তখন আমাদের প্রাত্যহিক অধ্যবসায়ের অংশ। শুধু গিয়াস স্যারের অসাধারণ বাচনিক ক্ষমতার কারণে পেছনের দরজা দিয়ে টুক করে বেরিয়ে যাওয়াও কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। ফলে মনোযোগ দিয়ে শোনা তার এসব ‘অপ্রাসঙ্গিক’ কথার ভেতরে মনে থেকে গেল, জীবনানন্দ, এই কলেজে তার চাকরি, একজন সাহেবের সে সব খুঁজতে আসা ইত্যাদি।
তাহলে, শহর থেকে কলেজে আসার মুখে, এই যে পাতলা আরসিসির রেলিংছাড়া পোল, আমাদের ছোটবেলায় এখানে তা কাঠের ছিল, সেই পোলের ওপর দাঁড়িয়ে, বয়ে আসা খালের জলের দিকে তাকিয়েছেন জীবনানন্দ। দক্ষিণে খালটা সরু, উত্তরে চওড়া, সেদিকে যতদূর চোখ যায় ধান খেত, নিশ্চয়ই তিনি এইখানে দাঁড়িয়ে দেখেছেন সে সব। পরে জেনেছি, জীবনানন্দের পদটি ছিল লিভভ্যাকেন্সি আর বাগেরহাট তার ভালো লাগেনি; এমন কালটে সবুজ গ্রাম্যশহর ভূ-ভারতে দ্বিতীয়টি নেই, তাও ভালো লাগেনি? নিশ্চয়ই এই কলেজ স্টেশন থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ট্রেন ধরে, রূপসা স্টেশনে নেমে, তারপর প্রমত্ত রূপসা পাড়ি দিয়ে, খুলনা থেকে কলকাতার ট্রেন তিনি ধরছেন, কেননা কাছাকাছি সময়েই তো তার লেখা, ‘রূপ্সার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে ডিঙা বায়’। রূপসার জল সত্যি ভীষণ ঘোলা। কিন্তু বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে তিনি স্বল্পকালীন চাকরি করতে না এলে নিশ্চয় এমন পঙ্্ক্তি কখনো লেখা হতো না।
‘আবার আসিব ফিরে’ শিরোনামের একটি কবিতাই জীবনানন্দের, আমাদের পাঠ্য ছিল প্রথম থেকে একাদশের ভেতরে, ক্লাস সেভেনে। আর জীবনানন্দ যখন বাগেরহাটে এসেছিলেন, তখন কলেজটির নাম বাগেরহাট কলেজ, দ্বাদশবর্ষীয় কিশোর প্রতিষ্ঠানটি অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকছে। তখন প্রতিষ্ঠাকালীন কর্তাব্যক্তিরা শরণাপন্ন হন এই জেলা (খুলনা) তথা সারা ভারতের কৃতিসন্তান আচার্য (স্যার) প্রফুল্লচন্দ্রের, বিশ^বিশ্রুত এই রসায়নবিদ তাদের ফেরাননি, সাহায্য করেন, কর্মকর্তারা ফিরে এসে কলেজটি তার নামে নামকরণ করেন। হতে পারে কলেজটির সেই নাজুক অবস্থায় এখানে কাজের সূত্রে এসেছিলেন জীবনানন্দ।
গিয়াস স্যারের মুখে সেই কথা শোনার বেশ পরে, আমরা একে-ওকে জিজ্ঞাসা করেছি, যখন জীবনানন্দ দাশ ছিলেন এই কলেজের শিক্ষক তখনকার কোনো ছাত্র বেঁচে আছেন কি? থাকলেও সে সময়ে তার বয়েস হবে আশির এপাশে ওপাশে। বলতে গেলে পাওয়া যায়নি। শুধু এক বড় ভাই বলেছিলেন, বেশ আগে তাকে পরিচিত এক প্রবীণ বলেছিলেন, একজন ইংরেজি স্যার এসেছিলেন, বাড়ি বরিশালে, বেশিদিন থাকেননি। তিনি যে পরবর্তীকালের বিখ্যাত কবি, সে কথা নিশ্চিত সেই সময়ের কোনো ছাত্রর নিশ্চয়ই জানা বা বোঝার কথা নয়। শুধু আমরা কয়েকজন সে কথা শুনে পরস্পরের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আচ্ছা সেই কাঠের পোলে, দাঁড়িয়েছিলেন তিনি?
দ্বিতীয় জানাটি এর একটু আগের। আমাদের পাড়ার মাথায় থাকতেন এক নিঃসন্তান দম্পতি। একটি বড়সড় বাড়ির ভেতরে দু-কামরার টিনের ঘরে। ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন তাদের। পাড়ায় বন্ধুজন প্রায় কেউ নেই। ভদ্রলোক স্থানীয় একটি স্কুলে ইংরেজি পড়ান, বেশ প্রবীণ বয়সেও। পরিষ্কার ধুতি-পাঞ্জাবি পরনে তার। পোশাকে একেবারে বিংশ শতকের গোড়ার দিকের বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের শেষ প্রতিনিধি। প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের চল্লিশের দশকের গোড়ার দিককার ছাত্র তিনি। ফলে, ইংরেজিজ্ঞান সেকালের ভালো ছাত্রদের মতন। তার কাছে কিছুদিন ইংরেজি পড়তে গিয়েছি। ইস্কুলের শেষ দিক তখন। অজ্ঞাত কারণে ভদ্রলোক আমাকে পছন্দ করতেন, তার স্ত্রীও। অনেকটা নাতিসুলভ আচরণ ছিল তাদের আমার প্রতি। ভদ্রলোকের স্ত্রী একদিন হঠাৎ কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, লাবণ্যদি। তখনো জীবনানন্দ দাশকে চিনলেও লাবণ্য দাশ যে তার স্ত্রী তা জানতাম না। কিন্তু তিনি তার স্বামীকে কথাটা বলেছিলেন। তাদের সেই কথা ছিল ভদ্রমহিলার বাবার বাড়ির দিককার কোনো প্রসঙ্গ। কিন্তু সে কথাটা আমি বুঝতে পারছি না, কিন্তু তার ওই লাবণ্যদি কথাটায় তার দিকে তাকাতেই তিনি জানিয়েছিলেন, লাবণ্যদি জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী। জীবনানন্দ দাশকে আবার আসিব ফিরে কবিতাটার সুবাদে চিনি। অথবা, পরিচিত বড় ভাই কেউ যখন বলেন, সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি কিংবা তোমার হৃদয় আজ ঘাস, তখন এমন অদ্ভুত লাইন শুনে পরস্পরের মুখে তাকিয়ে জানতে পারি এটাও জীবনানন্দের লেখা। শহরের লাশকাটা ঘর চিনি, কিন্তু ‘লাশকাটা ঘর’ তখনো পড়িনি, জীবনানন্দেরটা নয়, কায়েস আহমেদেরটাও নয়।
তারপর ভদ্রমহিলা বললেন, লাবণ্য দাশের কাছে তারা যেতেন। আড্ডা দিতেন। তখন দেখতেন জীবনানন্দকে। ভীষণ চুপচাপ। একা একা থাকতেন। কখনো তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেন। এইটুকু। তিনি জানিয়েছেন, তখনো তারা কেউ জানেন না যে মাস্টারমশাই এত বড় কবি। শুধু দেখতেন একজন নীরব মানুষকে।
ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, তখন তারা ইস্কুলের ওপরের ক্লাসে পড়েন। দেশভাগের ক’বছর আগে। তখনো জানি না যে এমন অনেক তরুণীর সঙ্গে লাবণ্য দাশের যোগাযোগের কারণে একবার পুলিশ এসেছিল বরিশালের বাড়িতে। কর্মকর্তা বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে জীবনানন্দের কিছু বইপত্র দেখে, কার বই সেটা জানতে চেয়েছিলেন, তারপর চলে গিয়েছিলেন।
এরও অনেকদিন পরে, যখন মনে হয়েছিল এই কথাগুলো আবারও শুনতে পারলে হতো, বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুবৃত্তের আড্ডায় এক আধবার মনে এসেছে সে কথা। বন্ধুরা বলেছে, শহরে গেলে যেন তার কাছে যাই আবার। কিন্তু তাও আর যাওয়া হয়নি। আর ততদিন তারাও আর বেঁচে নেই। ভদ্রমহিলার বলা সেই লাবণ্যদি আর মাস্টারমশাই শব্দ দুটো মনে আছে।
লেখক কথাসাহিত্যিক