বুদ্ধপূর্ণিমায় কল্যাণের প্রার্থনা

আপডেট : ২৬ মে ২০২১, ১২:০৫ এএম

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধপূর্ণিমা। আজকের দিনটি বৌদ্ধদের জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন। কারণ এ তিথি ঘিরে রয়েছে তথাগত বুদ্ধের তিনটি স্মরণীয় ঘটনা। ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত এ তিথির তাৎপর্য অত্যন্ত বিশাল। সব পূর্ণিমা তিথি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য কোনো না কোনো গুরুত্ব বহন করে। তবে, এবার করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সরকার ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবারের শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা তথা বৈশাখী পূর্ণিমা উদ্যাপিত হবে অত্যন্ত সীমিত আকারে। মানবজাতির এই ক্রান্তিকালে বুদ্ধনির্দেশিত বাণীগুলোর অপরিহার্যতা আজ আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। জীবন ও জীবিকার সংগ্রামে আমরা সবাই আজ অত্যন্ত অসহায়। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসতে পারাই হলো একজন মানুষের আসল বৈশিষ্ট্য। তথাগত বুদ্ধ মানবজাতিকে এই শিক্ষাই দিয়েছেন।

গভীর রাত, পুণ্যবতী মায়াদেবী রাজপালঙ্কে অঘোর নিদ্রায় মগ্ন। ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি স্বপ্ন দেখলেন। সেদিন ছিল কপিলাবস্তু নগরীতে আষাঢ়ী পূর্ণিমার উৎসব। রানী সারা দিন উৎসবে মেতে ক্লান্ত শরীরে শেষ রাতে স্বপ্নে দেখলেন, চারদিক থেকে চার দিকপাল এসে তাকে শয্যাসহ তুলে নিলেন। চাঁদের জ্যোৎস্না ছড়ানো রমণীয় এক হ্রদে রানী দেখলেন সহস্রদল পদ্ম। লাবণ্য আর লালিমায় রক্তিম। এক সাদা হস্তী সেই হ্রদে জলকেলি করছে। হস্তীটি মায়াদেবীর আগমনে সামনে এগিয়ে এলো। একটি বর্ণময় পদ্ম মায়াদেবীকে দিল হস্তীটি। এতে রানীর দেহমনে এক অপূর্ব শিহরণ জাগ্রত হলো। মায়াদেবীর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি পালঙ্কে উঠে বসলেন। শাক্যরাজ্যের প্রাণপুরুষ রাজা শুদ্ধোধনের রাজমহিষী তিনি। একি আমি দেখলাম! পরদিন রানী রাজা শুদ্ধোধনের কাছে স্বপ্নের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন। রাজা কালবিলম্ব না করে জ্যোতিষীদের ডেকে পাঠালেন এবং জ্যোতিষীদের কাছ থেকে রানীর স্বপ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইলেন। জ্যোতিষীরা বললেন মহারাজ, রানী মায়াদেবীর পুত্রসন্তান হবে। এই পুত্র মহাতেজস্বী ও যশস্বী মহাপুরুষ হবেন। শান্ত, গভীর, জগতে দুর্লভ, জীবের দুঃখহারী ও মহাজ্ঞানী পুত্রের জনক হবেন আপনি। তবে এখানে নৈরাশ্য এবং বেদনার সংবাদও জড়িয়ে রয়েছে। আছে কিছু বিয়োগ-বিচ্ছেদের অশনিসংকেত। রাজা শুদ্ধোধন অতলায়িত বিস্ময়ে তাকিয়ে জ্যোতিষীদের নির্দেশ করলেন ঘটনা খুলে বলার জন্য। তারা বললেন, পুত্রসন্তান লাভের সাত দিন পর মায়াদেবীর অকালমৃত্যু ঘটবে। এ মৃত্যু অমোঘ, অনিবার্য। একদিকে রাজপ্রাসাদে মহাপুরুষের আগমন সংবাদ, অন্যদিকে মায়াদেবীর আসন্ন মৃত্যুসংবাদে রাজা শুদ্ধোধন বিচলিত। আসন্ন প্রসবা মায়াদেবীর রূপ যেন বাঁধ মানছে না। যেন লাবণ্য বারিধি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। ভূকৈলাসের রাজা আসবেন এ মর্ত্যভূমিতে। জ্যোতি রূপোজ্জ্বলা। প্রাণময়ী পরামার্থা। যথাসময়ে মায়াদেবী পিত্রালয় দেবদহনগরে যাওয়ার জন্য রাজার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। মায়াদেবী দেবদহনগরের রাজা সুত্রবুদ্ধের জ্যেষ্ঠ কন্যা। রাজা রানীর বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে রেখেছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে সন্তানসম্ভবা মায়াদেবী সখী দলসহ রথে চড়ে বাপের বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করলেন। মুখে তার অপরূপ লাবণ্য, বেদনা, করুণা আর ধৃতির স্নিগ্ধতা। তিনি হবেন আলোকসুন্দর দিব্য পুরুষের জন্মদাত্রী। সৃষ্টির পূর্ণতা ও অনুপম সৌন্দর্যে সমুজ্জ্বল।

এলো বৈশাখী পূর্ণিমার তিথি। বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে লুম্বিনী কাননে পৌঁছানোমাত্রই মায়াদেবীর প্রসববেদনা শুরু হলো। এক পদ্ম-পলাশ-লোচন ব্রহ্মযোগযুক্ত আত্মভোলা শিশু জগতের ভাবী বুদ্ধের জন্ম হলো। লুম্বিনী উদ্যান হয়ে উঠল সৃষ্টির উৎসারিত আলোকসমুদ্র। পূর্ণতার পরমতম আকর্ষণ। মায়াদেবী উদাসীন অথচ আনন্দময়ী, জগজ্জননী জ্যোর্তিময়ী। মহাসমারোহে শোভাযাত্রা সহকারে মাতা ও তেজস্বী নবজাতককে লুম্বিনীকানন থেকে কপিলাবস্তু নগরের রাজপ্রাসাদে ফিরিয়ে আনা হলো। এই দিনে গয়ার বোধিগাছ, রাহুলমাতা গোপাদেবী, চার নিধিকুম্ভ, চার মঙ্গল হস্তী, সারথি ছন্দক এবং অমাত্যপুত্র উদায়ীও জন্মগ্রহণ করেন। মহাপুরুষ গৌতমের সঙ্গে তারা প্রত্যেকে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই দিনটি ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমার তিথি। দিব্যজ্ঞানস্বরূপ সাধনা সম্ভুত জ্যোতির্ময় পুরুষের জন্মের সাত দিন পর মায়াদেবীর অকালমৃত্যু হয়। মায়াদেবীর মৃত্যুতে রাজ্যময় শোক নেমে এলো। রাজপ্রাসাদের অঙ্গন-প্রাঙ্গণের সব বাতি নিভিয়ে দেওয়া হলো। কুমারী কন্যাদের বিঙ্কিনীর রোল আর বাজল না। কাদম্বিনীরূপী কবরী আর খোলা হলো না। মৃদুমলয়ে বসন্ত সখার সুরধ্বনি বন্ধ হয়ে গেল। শাক্যরাজ্যব্যাপী শোক পালনের মধ্য দিয়ে মায়াদেবীর মৃত্যুদিবস পালন করা হলো।

সেই প্রাচীনকালে রাজাদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা চালু ছিল বিধায় রাজা শুদ্ধোধনেরও একাধিক মহিষী ছিলেন। এর মধ্যে মনোমাধুরী মায়াদেবীই ছিলেন রাজার প্রধান পতœী। রাজা তার অপর স্ত্রী গৌতমীকে সিদ্ধার্থের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ জানালেন। গৌতমীও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে সিদ্ধার্থের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। ফলে বিমাতা গৌতমীর অশেষ স্নেহপরশে সিদ্ধার্থের শৈশব কাটতে লাগল। রাজকুমার সিদ্ধার্থ এখন পূর্ণ কিশোর, শান্ত মূর্তি। রাজা শুদ্ধোধন পুত্রের শিক্ষার কথা ভাবতে লাগলেন। সর্বোচ্চ এবং সর্বপ্রকার শিক্ষার জন্য শাক্যরাজের প-িতপ্রধান বিশ্বামিত্রকে নিযুক্ত করলেন। পরে এক শুভদিনে প-িতপ্রধান বিশ্বামিত্র রাজকুমারকে রাজা শুদ্ধোধনের কাছে এনে বললেন রাজমহাশয়, রাজকুমারের শিক্ষা শেষ। আমার কাছে তাকে দেওয়ার মতো কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। রাজকুমার দৈনিক শিক্ষায়তনেও মেধার বিকাশ ঘটালেন খুব অল্পসময়ে। তার আর কোনো শিক্ষা বাকি নেই। সব বিদ্যায় পারদর্শী রাজকুমার। এত কিছু রপ্ত করার পরও রাজকুমার চিন্তিত, নিঃসঙ্গ কিন্তু নিঃশঙ্ক। এ খবর খুব অল্প সময়ে চারদিকে প্রচার হয়ে গেল। রাজা শুদ্ধোধনও পুত্রের চিন্তায় বিভোর। তিনি জানতেন এমন কিছু ঘটবে। এ তার ভবিতব্য, কপাল লেখন। রাজা দেখলেন সিদ্ধার্থের বয়স যতই বাড়ছে তার শরীর ততই হয়ে উঠছে তেজস্বান। কোনো একটা বিষয়ে বিশ্বাস আর ব্যাকুলতা তার বাড়ছে। কীসের বিশ্বাস, কীসের ব্যাকুলতা! রাজা শুদ্ধোধন কিছুই অনুমান করতে পারছেন না। রাজপুত্রের উদাসীনতা কাটাতে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েও রাজা সফলকাম হতে পারলেন না।

এরপরের ঘটনাও আমাদের সবারই জানা। রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম হয়েছিল বৈশাখী পূর্ণিমার তিথিতে। আবার কুমার সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করে কঠোর সাধনা এবং তপস্যার মাধ্যমে যে-দিন বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন সে-দিনও ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমার তিথি। বুদ্ধত্ব লাভের পর বৌদ্ধধর্ম প্রচার করে যে-দিন তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন সে-দিনও ছিল বৈশাখী পূর্ণিমার তিথি। এই ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বৈশাখী পূর্ণিমাই আজকের বুদ্ধপূর্ণিমা। পরিশেষে, মহামারীকালের এই বুদ্ধপূর্ণিমায় শুধু একটি কথাই বলতে চাই আসুন, সবাই জাতিভেদ ভুলে গিয়ে এক কাতারে শামিল হয়ে অশান্ত এই বিশ্বে মানবকল্যাণের শপথ নিই।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত