অর্থ ও অর্থনীতি দুটোই আমার কাছে জটিল মনে হয়। তাই বাজেটের মারপ্যাঁচ বোঝা আমার কম্ম নয়। রাজনীতির অঙ্গনে বিএনপির মতো সরকারবিরোধী দল আর আমার মধ্যে একটি মিল আছে। আমাদের দেশের বিরোধী দলের বাজেট না বুঝলেও চলে। বাজেট পেশের পরপরই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘এটি সরকারের মানুষ মারার বাজেট’ বলে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবে। বাজেট পড়া বা বোঝার দরকার পড়ে না এ ধারার রাজনীতিকদের। শুনে মনে হয় বাজেট পেশের আগেই গৎবাঁধা প্রতিক্রিয়া লেখা থাকে। আমার দশা অনেকটা এ রকমই। তবে প্রকৃতিতে পার্থক্য রয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। বাজেট ঘোষণার পর হয়তো বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়বে। এসব গা সওয়া। হয়তো আয় না বাড়লেও আমাকে ইনকাম ট্যাক্স আরও ১০ বা ১৫ হাজার টাকা বেশি দিতে হবে। এসব গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি সব সময় থাকে। বিরোধী দল যেমন বাজেট না পড়েই (আমার বিশ্বাস) প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, আমি বুঝব না বলে না পড়েই নিশ্চিন্তে থাকার চেষ্টা করি।
তবে পেশার কারণে শিক্ষাঙ্গনের ভালো-মন্দ তো আর চোখ এড়ায় না। বাজেট না পড়লে বা না জানলেও এর প্রভাব শিক্ষাঙ্গনে অনুভব করতে পারি। বছরের পর বছর বাজেটের পর শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষক-ছাত্রদের অ্যাকাডেমিক এবং জাগতিক উন্নতি অবনতি দেখে বাজেটের প্রভাব বোঝা সম্ভব। এ কারণে বাজেটে কত হাজার কোটি টাকা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হলো তা জানার কৌতূহল কখনো তৈরি হয় না। প্রায় প্রতি বাজেটেই শুনি শিক্ষা খাতে অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাজেটের পর কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত কিছু উন্নতি চোখে পড়লেও শিক্ষা সরঞ্জাম এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর তেমন উন্নতি বড় দাগে চোখে পড়ে না। তাই প্রশ্ন জাগে, কোথায় গেল শিক্ষা বাজেটের এত এত বরাদ্দ?
গত বছরের বাজেটে শুভংকরের ফাঁকির একটি দৃশ্যপট উন্মোচিত হয়েছে। এবারও মুক্তি মেলেনি। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের বিশাল বাজেটও নাকি শিক্ষা বাজেটের মধ্যে যুক্ত করে আকারটি বড় করে দেখানো হয়েছে। কারণ, সুচতুরভাবে শিরোনামটি রাখা হয় ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ বাজেট। আর তাই বাজেটের মুড়োটাই খেয়ে ফেলে ‘প্রযুক্তি’। এ নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করেছেন। আমি তা করি না। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। আমাদের দেশের জন্য তো নতুন অভিজ্ঞতা। অনেককে নানা প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আমাদেরও অনেক ‘শেখা’র আছে। তাই শিক্ষা বাজেটে যুক্ত হতে বাধা কোথায়! অভিনব হলেও মেনে নিতেই পারি!
শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বাজেটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বরাবরই বলি প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে গোটা স্কুলশিক্ষা শিক্ষা-জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে শিক্ষার্থীর অ্যাকাডেমিক ভিত্তি তৈরি হয়। তাই পূর্ণ মনোযোগ দিতে হয় স্কুলশিক্ষা অঞ্চলের প্রতি। এখানে থাকা উচিত অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণসমৃদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাস্তবসম্মত এবং জ্ঞান উদ্দীপক আনন্দময় পাঠ উপযোগী কারিকুলাম তৈরি। আর এসব যথার্থভাবে পরিচালনার জন্য দক্ষ যোগ্য মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তেমন মেধাবীরা এখানে আকৃষ্ট হবে কেন! পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর কথা বাদ দিলাম। পশ্চিমবঙ্গের দিকেও যদি তাকাই তাহলে বাস্তবতা অনুভব করব। শুধু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী গ্র্যাজুয়েট নন অনেক পিএইচডি ডিগ্রি নেওয়া ব্যক্তিও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হয়ে সন্তুষ্ট। তাদের বেতন কাঠামো যথেষ্ট সম্মানজনক। বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামাজিক মর্যাদারও অলিখিত সম্পর্ক থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক সমাজের ব্রাত্যজন। শহরাঞ্চল বাদ দিলে মফস্বল আর গ্রামের স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণের জায়গাটি এখনো দুর্বল। শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি
আত্মতৃপ্তি রয়েছে। সব সরকারি চাকুরের বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যেখানে বেতন থাকার কথা ছিল ১০ টাকা, তা বেড়ে ২০ টাকা হলে বলার কিছু ছিল না। কিন্তু বরাবর শিক্ষকের বেতন ১০-এর বদলে যখন ২ টাকা থাকে তা বেড়ে ৪ টাকা হলে এই বাজারে বা সমাজে তার অবস্থার কী এমন রূপান্তর ঘটল!
একটি উদাহরণ দিই। আমার নিকটাত্মীয় ছেলেটি বিসিএস দিয়ে ২য় গ্রেডের সরকারি চাকরির জন্য মনোনীত হয়েছে। কিন্তু পদের অভাবে সরকার চাকরি দিতে পারছে না। অতঃপর এক আদেশ বলে শিক্ষকতায় আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক এদের ধরে বেঁধে প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার বানিয়ে দিয়েছে। আমাদের এই স্নেহভাজন হেডমাস্টার সাহেব বিক্রমপুরের এক গ্রামের স্কুলে নিয়োগ পেয়েছে। নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার অপর পাড়ে তার পরিবারের বাস। ছোট দুই ভাই-বোন স্কুলে পড়ে। সুতরাং দুই জায়গায় সংসার পাতা সম্ভব নয়। সে কাকডাকা ভোরে রওনা দিয়ে স্কুলে যায়। স্কুল শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে পড়ে। মাস গেলে সাকুল্যে বেতন পায় ২০ হাজার টাকার মতো। বাবা বেঁচে নেই। সংসারের পুরো দায়িত্ব ওর ওপর। রক্ষা সে অবিবাহিত। নারায়ণগঞ্জ থেকে বিক্রমপুর যাতায়াত, বাসাভাড়া, ভাই-বোনের পড়ার খরচ চালাতে প্রায় ১৪ হাজার টাকা বেরিয়ে যায়। জীবন নির্বাহে বাকি ৬ হাজার টাকা অবশিষ্ট থাকে। তাহলে এমন হেডমাস্টার ও সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে কী ফলাফল আমরা আশা করব! তখনই মনে হয় এ দেশে শিক্ষা বাজেটের দর্শন কি! অধিকাংশ বেসরকারি স্কুল-কলেজের অবস্থা তো আরও করুণ।
এমন বাস্তবতায় একজন মেধাবী গ্র্যাজুয়েট কেন প্রাইমারি বা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখবে! এই ধারার একটি বড় অংশের শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে বিসিএস দিয়ে সরকারি আমলা হবে। পুলিশে চাকরি করবে। অথবা কেউ কেউ সুযোগ পেলে আগেই ঢুকে যাবে সামরিক বাহিনীতে। কারণ এসব জায়গায় সম্মান ও জীবন নির্বাহে নানা স্বাচ্ছন্দ্যের হাতছানি আছে। পৈতৃক বাড়ি ছাড়া কজন শিক্ষক বাড়ি করা বা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখে। তাদের জন্য সহজ শর্তে প্লট বা ফ্ল্যাট পাওয়ার সুবিধা রাখেনি বাজেট। অথচ একজন তরুণ শিক্ষক যখন দেখে তার সম্পর্কের বড় ভাই সরকারি বড় আমলা। বিভিন্ন মিটিংয়ের সিটিং অ্যালাউন্সেই সংসার চলে যায়, সহজ ঋণে গাড়ি কিনতে পারে আর জ¦ালানি, ড্রাইভার ও ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা সরকারি ভাতাতেই হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নানা পথ তো খোলাই থাকছে। ফলে এসব বৈষম্য এই তরুণদের হতাশ করবেই।
এই করোনাকালে সংসদ টিভিতে স্কুলশিক্ষকদের ক্লাসগুলো সুযোগ পেলেই আমি দেখি। কী চমৎকার পড়ান তারা। এদের অধিকাংশই ঢাকার নামি স্কুলের শিক্ষক। তাদের কেউ কেউ আমার ছাত্রছাত্রীও। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উজ্জ্বল ফলাফল করে বেরিয়েছেন। পিএইচডিও করেছেন কেউ কেউ। তখন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবি আহা এই মানের শিক্ষক যদি আমাদের প্রাইমারি আর মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে নিয়োগ দেওয়া যেত! ভালো শিক্ষক যে এখনো স্কুলগুলোতে নেই তা নয় কিন্তু জ্ঞানচর্চা ও বিতরণে যে মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি ও প্রণোদনা থাকা দরকার আমরা শিক্ষা বাজেট তৈরির সময় তা বিবেচনা করি না।
সরকারি বাজেট থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাজেট বরাদ্দ দেয় ইউজিসি। সাধারণ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা থাকতেই পারে। বিশেষ করে যখন সংবাদমাধ্যমে জানতে পারে এশিয়ার বা বিশ্বের হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো উল্লেখ করার মতো স্থান নেই। অনেকেই হয়তো জানেন না এই তালিকায় নাম থাকার সঙ্গে শিক্ষা কারিকুলাম ও পাঠদানের পয়েন্ট খুবই অল্প। প্রধান ভূমিকা পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান সৃষ্টি কতটা করল এর ওপর। অর্থাৎ গবেষণা ও গবেষণালব্ধ ফলাফল। বিজ্ঞানের বিষয় ছাড়াও আরও অনেক বিষয়ের গবেষণার জন্য ল্যাব বা গবেষণাগার প্রয়োজন। প্রতœতত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, ভূগোল প্রভৃতি বিষয়ের গবেষণার জন্য গবেষণাগার ও ফিল্ড ওয়ার্কের প্রয়োজন পড়ে। এসব গবেষণায় প্রচুর অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন আছে। বাজেট প্রণয়নকারী মহাজনদের সামনে কি এ হিসাব থাকে! অল্প তেলে মুচমুচে ভাজা কতটা সম্ভব?
আমাদের শিক্ষকরা তো অযোগ্য নন। গবেষণার প্রয়োজনে যারা বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পান সেখানে অনেকেই মেধাবী ফলাফল অর্জন করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন। কিন্তু দেশে ফিরে তারা এই জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সুযোগ পান না। সুযোগ পেয়েও অনেক শিক্ষক অর্থাভাবে গবেষণার জন্য বিদেশে যেতে পারেন না। অথচ সরকারি অর্থ ব্যয় করে অথবা বিদেশি বৃত্তি নিজেরাই করায়ত্ত করে সরকারি চাকুরে, যারা পরবর্তী সময় গবেষণায় যুক্ত থাকবেন না সেই ক্ষমতাবানরা হরদম বিদেশে পড়াশোনা করে আসছেন। এসে আবার তার অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করার সুযোগ থাকবে না, তেমন প্রতিষ্ঠানে বা মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে যাবেন।
বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতি অনুষদে একটি গবেষণা ফান্ড থাকে। সেখানে প্রতি বছর শিক্ষকরা গবেষণা প্রকল্প জমা দেন। তাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পান তা দিয়ে গভীর গবেষণা সম্ভব নয়। দায়সারা গোছের গবেষণাই করতে হয়। আমার একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে। পনেরো-ষোলো বছর আগের কথা। শরীয়তপুরের একটি প্রতœগুরুত্বপূর্ণ বাড়ির ইতিহাস নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছিলাম। শরীয়তপুরে বারবার মাঠপর্যায়ে কাজ করা, বিভিন্ন লাইব্রেরিতে যাওয়া, তথ্যানুসন্ধানে কলকাতার লাইব্রেরিতে যাওয়া এসব করে আমার লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি বরাদ্দ পেয়েছিলাম ১২ হাজার টাকা। আবার এই টাকার নানা রকম হিসাবনিকাশ তৈরি করে জমা দিতে হয়েছিল। বুঝলাম এসব গবেষকের কম্ম নয়। অভিজ্ঞতার কারণে এটিই আমার প্রথম ও শেষ গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেওয়া ছিল। এরপরে যা করেছি তা ব্যক্তিগত অর্থে নিজের দায়বোধ থেকে।
ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে অবকাঠামো উন্নয়নে বাড়তি খরচ হবে। বাড়তি ছাত্রছাত্রীর জন্য ব্যয় বাড়বে। বাজেটে যেটুকু বাড়তি বরাদ্দের কথা শোনা যাচ্ছে তা দিয়ে এসব দৃশ্যমান খরচ মেটানো কঠিন হবে। আবার অনেকেই হয়তো জানি না বছরের মাঝামাঝি সরকার নানা সংকটের কথা বলে ঘোষিত বাজেটের একটি অংশ কেটে নেয়। হরদমই এটি হয়। সুতরাং শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত পরিবর্তনের জন্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বাজেট থেকে তেমন কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
তাই প্রায়োগিক ক্ষেত্রে শিক্ষা বাজেটকে গতানুগতিকই বলতে হবে। আধো অন্ধকার থেকে বেরোতে পারছে না। এই বাজেটের ওপর ভর করে শিক্ষা গবেষণায় বড় রকমের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে আমরা তা মনে করি না। এসব বাস্তবতায় আমাদের মনে হয় না আমাদের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে শিক্ষাঞ্চল তেমন একটি গুরুত্ব পায়।