এখন আর ওসব সংখ্যার কচকচানি শুনতে ভালো লাগছে না। কি আর হবে জেনে মিলখা সিং কবে কোথায় কখন কটা মেডেল জিতেছেন। মিলখা সিং মানেই তো একের পর এক ট্র্যাক রেকর্ড ভাঙা-গড়া। মিলখা মানেই ট্র্যাকে এক রঙিন প্রজাপতির ওড়াউড়ি। মিলখা মানেই নতুন নতুন কত কত গল্পের জন্ম নেওয়া।
সেই যে সেই গল্পটা। কাল গভীর রাতে মিলখার চলে যাওয়ার খবরটা শুনেই মনে পড়েছিল সেই চমকপ্রদ কাহিনীটা। ভোর ভোর চণ্ডীগড়ের রাস্তায় কিংবদন্তি প্রবীণ অ্যাথলিটকে দৌড়াতে দেখে প্রতিবেশী মানুষজন একটু অবাক হয়েই জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার আজ এখন এই প্রায় রাত থাকতে কোথায় ছুটছেন! আপনি তো একটু বেলায় ছোটেন। মিলখা সিং ছুটতে ছুটতেই জবাব দিলেন‘আরে ভাই বাড়িতে এক চোর এসেছিল অনেকক্ষণ আগে। আমার বউ বল্লো, তাড়া করতে। আমি ধীরে-সুস্থে রাত-পোশাক পাল্টে যখন ধরব বলে পথে নামলাম ততক্ষণে চোরব্যাটা কিছু না হোক মাইল তিনেক এগিয়ে গেছে।’ প্রতিবেশীরা ধরেই নিলেন চোর পালিয়ে গেছে। মিলখা সিং তাদের আশ্বস্ত করলেন‘আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওকে কিছুক্ষণের মধ্যেই পেছনে ফেলে দিলাম। এখন সে অন্তত চার কিলোমিটার পেছনে পড়ে রয়েছে।’
পড়শিদের অবাক চোখের দিকে তাকিয়ে মিলখা হাসতে হাসতে বললেন‘চোরটা ভাবতেই পারেনি কার সঙ্গে সে পাঙ্গা দিতে এসেছিল!’ আর একটা গল্প তো প্রায় প্রবাদ হয়ে গেছে। অনেকেই তা জানেন। তবু আর একবার শোনাতে ইচ্ছে করছে। মিলখা কোনো এক সমুদ্রতীরে রোদ পোহাচ্ছেন। পড়ন্ত বিকেল। সাগরের নীল জলে ছোট-বড়-মাঝারি অজস্র ঢেউ। একঝাঁক সিগাল উড়ে চলেছে অজানা পথে। বড় নীরব নির্জন এই তটভূমি। আদুল গায়ে শর্টস পরে উপুড় হয়ে রোদ্দুর পোহাচ্ছেন ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অ্যাথলিট উড়ন্ত শিখ মিলখা সিং। বলা নেই কওয়া নেই কোত্থেকে এক সুন্দরী তরুণী এসে জিজ্ঞেস করলেন, আর ইউ মিলখা সিং? একইভাবে নট নড়নচড়ন ভঙ্গিতে নিরাসক্ত গলায় মিলখা জবাব দিলেন‘নো আই অ্যাম রিলাক্সিং।’
আক্ষরিক অর্থেই মিলখা ছিলেন ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অ্যাথলিট। এশিয়ান গেমসে চার চারটি সোনা জিতেছিলেন মিলখা। ১৯৫৮ সালে ২০০ ও ৪০০ মিটার দৌড়ে। ১৯৬২ সালে এশিয়ান গেমসে ৪০০ মিটার ও ৪দ্ধ৪০০ মিটার রিলেতে সোনা জিতেছিলেন মিলখা। প্রথম ভারতীয় অ্যাথলিট হিসেবে কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জেতার রেকর্ডও মিলখার। মাত্র ৪৬.৬ সেকেন্ডে সোনা জিতে সেই প্রথম বিশ্ব ক্রীড়া মঞ্চকে তাক লাগিয়ে রাতারাতি নায়ক হয়ে উঠেছিলেন পাঞ্জাবের এই তরুণ। হারিয়েছিলেন এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সে সময় অ্যাথলিট বিশ্বে যার বিপুল দাপট। দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যালকম স্পেন্সের মতো তারকাকে পেছনে ফেলে মিলখা সিং বার্তা দিয়েছিলেন দুনিয়াকে যে আমি এসে গেছি!
সত্যিই তিনি যেনভিনি ভিসি ভিডি। এলেন দেখলেন ও জয় করলেন। ষাটের দশকে ভারতের খেলার জগতে নক্ষত্রের অভাব ছিল না। হকি তখন মধ্যগগনে। ধ্যানচাঁদের জাদু তখনো লোকের মুখে মুখে। অজিতপাল সিং, লেসলি ক্লডিয়াস গুরুবক্স সিং। ফুটবলে তখন রহিম সাহেবের ছেলেদের প্রবল প্রতাপ। চুনী, পি কে বলরাম তখন তাদের সেরা সময়ে। তবু তার মধ্যেই দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে বড় হয়ে ওঠা এই পাঞ্জাব কেশরী অনন্য। রেকর্ড ভাঙার জন্যই যেন তিনি জন্মেছিলেন। মিলখা দৌড়ালে মনে হতো মাঠে যেন হরিণ ছুটছে। কখনো কখনো আবার ক্ষিপ্র চিতা হয়ে মিলখা সিং ট্র্যাকে ছুটতেন।
অ্যাথলেটিকস কখনো কোনো দিনই এ দেশে গুরুত্ব পায়নি। ভারতীয় ক্রীড়ায় সুয়োরানি চিরকালই ক্রিকেট। তারাই সব সময় গোল্ডেন বয়। প্রচারের যাবতীয় আলো সব সময় তাদের মুখে। মিলখা সিং নিজের কৃতিত্বে ভারতের ক্রীড়ার সোনার ছেলে হয়ে উঠেছিলেন। প্রচারের আলো জোর করে আপন প্রতিভার জোরে নিজের দিকে টেনে এনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে যে কজন অ্যাথলিট আন্তর্জাতিক ট্র্যাকে সাফল্য পেয়েছেন তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে মিলখা প্রভাবিত।
মিলখা নিজে কখনো গুরুগিরি করার স্বভাবের ছিলেন না। কাউকে ধরে ধরে উপদেশ দেওয়ার ধাত ছিল না মিলখার। তিনি এদিক দিয়ে ছিলেন পুরোপুরি মহাত্মা গান্ধীর অনুগামী। গান্ধী যেমন বলেছিলেন যে আমার জীবনই আমার বাণী। তেমনি মিলখার জীবনই ছিল মিলখার বাণী। সে বাণীও ছিল গান্ধীজির মতোই সহজ সরল অনাড়ম্বর। সৎ থাকো। কঠোর পরিশ্রম করো। লোভ করবে না। সাফল্য পাবেই। তবে সেই সঙ্গে এও মনে রেখো সাফল্য যেন কোনো সময় তোমার মাথা না ঘুড়িয়ে দেয়।
অল্প সাফল্য, সামান্য নাম হলেই কত প্রতিভাকে দেখেছি মাথা ঘুরে যেতে। মাও সেতুং বলতেন কিছুদিন বিপ্লবী থাকা যায়। চিরদিন বিপ্লবী থাকা কঠিন, বড্ড কঠিন। জীবনের সবক্ষেত্রেই চিরকাল দম্ভ না করে মাথা উঁচু করে পথ চলা সত্যিই বেশ কঠিন কাজ। মিলখা সেই কঠিন, দুরূহ কাজটি করে গেছেন সারা জীবন। তার জীবন দর্শনই ছিল প্লেন লিভিং হাই থিঙ্কিং। সাদাসিধে জীবন কাটাও আর ভালো চিন্তা করো।
ভারতীয় অ্যাথলেটিকসে অনেক নক্ষত্রকে কোনো না কোনো সময়ে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। পিল্লা ভুল্লা থেকে কান্দে পরমভীল ঊষা অর্থাৎ সংক্ষেপে যিনি পি টি ঊষা ও তার কোচ নাম্বিয়ারের সঙ্গে একসময় সখ্য ছিল। তা ছাড়া আটশো মিটারে সোনা পাওয়া শ্রীরাম সিং ও গুড়গাঁওয়ের এশিয়ান গেমসে সোনা পাওয়া আর এক সোনার মেয়ে গীতা জুৎসীও চমৎকার বন্ধু ছিল। গীতা এ দেশের খেলায় কত রকম পলিটিকস তাও খোলাখুলি বলেছে। কিন্তু প্রত্যেকেই একবারের জন্যও এসব নোংরামি প্রসঙ্গে মিলখা সিং-এর কথা ভুল করেও মুখে আনেননি। সবাই জানেন, কখনো কোনো নোংরা খেলায় নিজের নাম জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে খুব সতর্ক থাকতেন ব্যক্তি মিলখা।
ভারতীয় কেন, পেশার কারণে টানা দুদিন পশ্চিমবঙ্গের সদর মফস্বলে উড়ন্ত চেক, বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের দম্পতি কিংবদন্তি চেকোশ্লোভিয়ার এমিল ও ডানা জ্যাটোপেকের সঙ্গেও অনেকটা সময় কাটিয়েছি। কিন্তু মিলখা অনন্য। কাছ থেকে ওই সুঠাম চেহারার ফর্সা মিলখার চোখের দিকে তাকালে মনটা কেমন শান্ত হয়ে যেত। তার মধ্যে কোথাও এক ধরনের দার্শনিক মিলখা লুকিয়ে ছিল। ভালোভাবে না মিশলে চট করে বাইরে থেকে তা টের পাওয়া যেত না।
দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে বেড়ে ওঠার কারণেই বোধ হয় মিলখা সিং-এর চরিত্রে এক ধরনের নির্লিপ্ত ছিল। সাফল্য বা ব্যর্থতা দুটোই তিনি সহজে নিতে জানতেন। ১৯২৯ সালে আজকের পাকিস্তানের গোবিন্দপুরায় জন্ম নেওয়া ছেলেটি কি কখনো স্বপ্নেও ভেবেছিলেন শৈশবে দেশভাগ আর চোখের সামনে মা-বাবাকে খুন হতে দেখার পরে কোনোরকমে রিফিউজি ক্যাম্পে লাথি ঝাঁটা খেয়ে অনাদরে বড় হওয়ার পরে এক দিন তার মাথাটাই ভিকট্রি স্ট্যান্ডে বড় হয়ে আকাশ ছোঁবে!
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক