লকডাউন, শাটডাউন ও কঠোর বিধিনিষেধ

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২১, ১০:২২ পিএম

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে যখন ‘ববোনিক প্লেগ’ (প্লেগ মানে হচ্ছে সংক্রমণ ব্যাধি) যাকে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা ‘কালো মৃত্যু’ও বলা হয়, মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে তখন প্রথম ইতালির  ভেনিসে ‘লকডাউন’ দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে নজির হিসেবে টেনে কোনো কোনো গবেষকের মতে মহামারীজনিত কারণে মানুষকে ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ইতালিতেই পৃথিবীর সর্বপ্রথম লকডাউনের ধারণা চালু হয়। ইউরোপে এ মহামারী ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল এবং এ রোগের বিস্তারে বিশ্বব্যাপী প্রায় আড়াই কোটি লোকের মৃত্যু হয়েছিল। অন্য কারও কারও মতে, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজা জাস্টিনিয়ানের এক মারণব্যাধি হয়েছিল যা সাম্রাজ্যে মহামারী আকারে ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজার নামে এ মহামারীর নামকরণ করা হয়েছিল ‘জাস্টিনিয়ান প্লেগ’ যা ৫৪১ থেকে ৫৪৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। গবেষকদের মতে, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল এ সংক্রামক ব্যাধিতে। তখন সাময়িক সময়ের জন্য কনস্টান্টিনোপলে মানুষের গমনাগমন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইতিহাসে প্রথম অফিশিয়াল ‘লকডাউন’ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে কোনো কোনো গবেষক মনে করেন। এর অর্থ দাঁড়ায় সংক্রামক ব্যাধির সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য ‘লকডাউন’ পদ্ধতির ব্যবহার করার নজির মানব সমাজের ইতিহাসে প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো রীতি এবং কৌশল। বিংশ শতাব্দীতেও ব্রিটেনে স্প্যানিশ ফ্লুর বিস্তার বেড়ে যাওয়ায়, সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য লকডাউন একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে প্রথম করোনাভাইরাসের সন্ধান মিললে, চীনের হুয়ানে কঠোর লকডাউন দিয়ে সেটাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। এরপর ইউরোপের ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কমানোর জন্য লকডাউন পদ্ধতির ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে করোনা পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ রূপ নেয়, সেখানেও লকডাউন প্রবলভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চের ৮ তারিখ বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলেও লকডাউনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে। সংক্রমণের পরিমাণ যখন বাড়তে শুরু করে তখন মার্চের ১৮ তারিখ থেকে গোটা বাংলাদেশে লকডাউনের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সেটা সরাসরি ‘লকডাউন’ না বলে সাধারণ ছুটি, চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, গণপরিবহন বন্ধ, জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ প্রভৃতি শর্ত ও শব্দ দিয়ে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ‘লকডাউন’ শব্দটা তখনো ব্যবহার করা হয়নি। কেন হয়নি, তা নিয়ে অনেকে গোস্সা করলেও, আমার কাছে এটা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছিল। যা আমি পরে ব্যাখ্যা করছি।

কিন্তু ২০২১ সালের মার্চ মাসে যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়, যাকে অনেকে দ্বিতীয় ঢেউ বলে শনাক্ত করছেন, তখন সরকার নতুন করে লকডাউন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখনো লকডাউনের পরিবর্তে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ আরোপ করা হয়। কিন্তু লকডাউন শব্দটা কেন জানি বাংলাদেশে খুব একটা কার্যকর শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বাংলাদেশে কেন লকডাউন দেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যম, প্রাইভেট টিভি চ্যানেল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নানান মাত্রার হা-হুতাশ এবং সমালোচনা লক্ষ করা যায়। কিন্তু জুনে এসে যখন মৃত্যুর সংখ্যা আবার একশ’র ওপরে উঠে যায় এবং সংক্রমণের সংখ্যা যখন নিয়মিতভাবে ৬/৭/৮ হাজার হতে থাকে তখন সরকার ১ জুলাই থেকে পুনরায় ‘লকডাউন’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরুতে কোনো কোনো মিডিয়ায় এটাকে ‘শাটডাউন’ বা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ হিসেবে প্রচার করেছে। কিন্তু যেটা লক্ষ করার বিষয়, সেটা হচ্ছে ১ জুলাই থেকে যে লকডাউন শুরু হয়েছে সে সময় কী করা যাবে এবং যাবে না, কী কী চলবে এবং কী কী বন্ধ থাকবে এবং কী কী এ লকডাউনের আওতার মধ্যে পড়বে, তা নিয়ে ৩০ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ‘মাঠ প্রশাসন সমন্বয় অধিশাখা’ কর্তৃক দেওয়া সরকারি প্রেস নোটে লকডাউন বা শাটডাউন বলে কোনো শব্দই ব্যবহার করা হয়নি। বলা হয়েছে “করোনা ভাইরাসজনিত রোগের (কভিড-১৯) বিস্তার রোধকল্পে সার্বিক কার্যাবলি/চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ’। এখন একে ‘লকডাউন’ কিংবা ‘শাটডাউন’ বলা হয়নি দেখেই এ লকডাউনের গুরুত্ব এবং কার্যকারিতা বাংলাদেশে কাজ করছে না বলে অনেকে বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমি মনে করি, ‘লকডাউন’ এবং ‘শাটশাউন’-এর মতো ইংরেজি শব্দের জুৎসই বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করা জরুরি এবং রাষ্ট্রের তরফ থেকে সেটা একটা দায় ও দায়িত্বও বটে।

আমরা সবাই কমবেশি জানি যে, করোনাভাইরাস মহামারীতে আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহার্য শব্দ সম্ভারে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু নতুন শব্দ। যেমন: কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, হ্যান্ডওয়াশ, কন্টাক্ট ট্রেসিং, লকডাউন, স্যানিটাইজিং, স্যোশাল ডিসটেন্স, স্টে-এট-হোম প্রভৃতি। এসব শব্দ হয়তো চিকিৎসাশাস্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকজনের পরিচিত, কিন্তু বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের বেশির ভাগ মানুষের কাছে একেবারেই অপরিচিত ছিল। এখানে যে জায়গাটা বোঝা জরুরি সেটা হচ্ছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাসের মতোই সমানতালে সম্প্রসারিত হয়েছে এসব শব্দ। এবং শহুরে শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণি এ ভাইরাস-সম্পর্কিত শব্দাবলিকে খুব দ্রুত গ্রহণ করেছে এবং অর্থ উপলব্ধি করতে পেরেছে, যদিও সেটা যথাযথভাবে মেনেছে কিনা তা প্রশ্নাতীত নয়। কিন্তু সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এখনো এসব শব্দের অর্থ, মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছে কি না সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কেননা, প্রথমত এসব ইংরেজি শব্দ যার অর্থ এবং মর্মার্থ সমাজের একটা বড় সংখ্যক মানুষের কাছে বোধগম্য নয়। দ্বিতীয়ত এসব শব্দ ‘চিকিৎসাশাস্ত্র’ সংক্রান্ত যা চরিত্রগতভাবে ‘টেকনিক্যাল’ যা এমনিতেই সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের মানুষের বোঝাবুঝির সীমানার বাইরে থাকে। ফলে, সরকার যখন ‘লকডাউন’ জারি করে সেটা সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে অধিকতর বোধগম্য করার জন্য এবং প্রান্তের মানুষের বোঝাবুঝির সীমানায় রাখার জন্য যথাযথ প্রতিশব্দ হিসেবে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ বা ‘কার্যাবলিতে/চলাচলে বিধিনিষেধ’ আরোপ প্রভৃতি প্রতিশব্দ ব্যবহার করে।

আরও একটা বিষয় এখানে মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির একটি দেশে যেখানে শ্রমজীবী মানুষের একটা বড় অংশ এখনো ‘দিনে-এনে-দিনে খায়’ জীবিকার বাস্তবতায় আটকে আছে, সেখানে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা ‘কমপ্লিট লকডাউন’ আদৌ একটি বাস্তবসম্মত পন্থা কি না সেটাও বিবেচনার দাবি রাখে। কেননা যাকে বাঁচানোর জন্য আপনি ‘লকডাউন’ চাপিয়ে দিচ্ছেন, তাকে ‘লক’ করে তো আপনি এমনিতেই মেরে ফেলছেন! সুতরাং পাশ্চাত্যের যে কোনো ধারণাকে ‘আক্ষরিকভাবে’ গ্রহণ না-করে সেটাকে আমাদের নিজস্ব সমাজ-বাস্তবাতায় রূপান্তর করে কীভাবে কার্যকর প্রয়োগ করা যায়, সেটাই মূল কথা। আমি পত্রিকান্তরে লিখেছিলাম, ‘লকডাউন হচ্ছে ভাইরাস বাহককে (মানে মানুষকে) লক করে সংক্রমণকে ডাউন করার একটা সামাজিক বিধিবিধান পদ্ধতি’। এখন সেটা বিভিন্ন কার্যক্রমে ‘কঠোর বিধিনিষেধ প্রয়োগ’ করে এবং মানুষের (ভাইরাস বাহক) চলাচলের ওপর ‘কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় রেখে যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ‘লকডাউন’ কিংবা ‘শাটডাউনের’ মতো ইংরেজি ‘মারার’ তো কোনো প্রয়োজন  নেই।

আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমরা কাজের চেয়ে কথা বেশি বলি। এখানে জরুরি হচ্ছে, মানুষের অবাধ চলাচলকে রোধ করা, করোনাভাইরাসের বাহক হিসেবে মানুষের শারীরিক সংযোগ ও সংস্পর্শকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে জমায়েত বন্ধ রাখা। ভাইরাস বাহক চলাচল করতে না পারলে ভাইরাস ছড়াবে না, আর ভাইরাস না ছড়ালে সংক্রমণ হবে না, আর সংক্রমণের হার কমলে মৃত্যুর সংখ্যা কমে যাবে। এভাবে সবকিছু কমতে থাকলে একদিন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসবে। এটাই ‘লকডাউন’, ‘শাটডাউন’ কিংবা ‘কঠোর বিধিনিষেধের’ মূল শানে নুজুুল! তাই, শব্দের প্রয়োগের চেয়ে অধিকতর জরুরি হচ্ছে যার জন্য তা প্রয়োগ করা হচ্ছে সে এটা বুঝতে পারছে কি না সেই বিবেচনা। শব্দ প্রয়োগের চেয়ে অধিকতর জরুরি হচ্ছে, প্রয়োগের প্রতিফল!!

লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত