দেশীয় এবং বিশ^বাজারের বিবেচনায় বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বিপুল সম্ভাবনাময়। কিন্তু সুযোগসন্ধানীরা এ শিল্পের সম্ভাবনা নষ্ট করে দিচ্ছে। ঈদুল আজহার সময় দেশের সিংহভাগ চামড়া আহরিত হয়। ঈদুল ফিতরেও কিছুটা। এছাড়াও সারা বছর ঢিমেতালে চামড়া সংগ্রহ হয়। তবু প্রতি বছর চামড়া শিল্পের ব্যবস্থাপনাগত সংকটের কারণে নানামুখী সমস্যায় পড়ে এই শিল্প খাতটি। অনেকেই এজন্য চামড়া শিল্পের নিয়ন্ত্রক সিন্ডিকেটকে দোষারোপ করেন। বলেন, চামড়ার সুদিন আনতে হলে সিন্ডিকেট ভাঙতেই হবে। তবে এক্ষেত্রে সিন্ডিকেট ছাড়া আরও কিছু কারণ আছে। তার মধ্যে অন্যতম মাঠপর্যায়ের ক্রেতা-বিক্রেতাদের চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে দক্ষতার অভাব এবং চামড়ার দাম নির্ধারণের জটিলতা। এই সংকট কাটাতে হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চামড়া সংরক্ষণের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও কৌশলী হতে হবে। একসময় পাটকে সোনালি আঁশ বলা হতো। কিন্তু পাটশিল্প এখন ধুঁকছে, মৃতপ্রায়। পাটের হারানো সেই সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে। এজন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। চামড়ার মতোই পাটের আঁশ সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও তৃণমূল পর্যায়ে দক্ষতার অভাব আছে।
তিন দশক আগে থেকেই দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ছিল স্বল্পসংখ্যক পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। সে সময় রপ্তানি পণ্য তালিকা প্রণয়ন করতে গেলে পাট ও চায়ের পর অনিবার্যভাবে যে পণ্যটির নাম চলে আসত তা হলো চামড়া। এখন তৈরি পোশাক শিল্পের পরই দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত চামড়া। কিন্তু প্রথমটির সঙ্গে এই দ্বিতীয়টির ব্যবধান আকাশ-পাতাল। অর্থাৎ অতিমাত্রায় নির্ভরতার দৃশপট বদলায়নি। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হলো বর্তমানে রপ্তানি বাণিজ্যে যেসব পণ্য সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে সেগুলো পুরোপুরি স্থানীয় কাঁচামাল-নির্ভর নয়। অথচ রপ্তানি বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আমাদের অবশ্যই স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক অধিক মূল্য সংযোজনকারী পণ্য রপ্তানিতে মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সম্ভাবনার জায়গাটি এখানেই। কেননা, স্থানীয়ভাবে আমাদের এই শিল্পের কাঁচামালের অভাব নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বিশ^বাজারে সুবিধা করতে পারছে না, নতুন বাজার ধরতে পারছে না।
পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) মান সনদ অর্জন করতে পারছে না। সারা বিশ্বের ৬৬টি বড় ব্র্যান্ড এই গ্রুপের সদস্য। এলডব্লিউজি মান সনদহীন ট্যানারি থেকে তারা চামড়া কেনে না। পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য পরিশোধন, কাঁচামালের উৎস, জ্বালানি ও পানির ব্যবহার ইত্যাদি বিবেচনা করা হয় এই সনদের ক্ষেত্রে। বিশ্বের ৪৪০টি কারখানা এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে ২৪২টি গোল্ড সনদ। ভারতে এই সনদপ্রাপ্ত ট্যানারি ১০৫টি, চীনে ৭৫টি, ব্রাজিলে ৬৩টি, ইতালিতে ২৬টি, ভিয়েতনামে ১৪টি, পাকিস্তানে ৩টি এবং বাংলাদেশে মাত্র ১টি। ২০১৫ সালে এপেক্স ফুটওয়্যারের ট্যানারি ইউনিট এলডব্লিউজির নিরীক্ষায় সেরা মান অর্থাৎ গোল্ড সনদ বা সেরা মানের কারখানার মর্যাদা পায়।
বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্ববাজারে এই খাতে আমাদের সাম্প্রতিক রপ্তানি বাণিজ্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অপ্রচলিত পণ্য যেমন জুতা, চামড়ার ব্যাগ ইত্যাদির অবদান বৃদ্ধি। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে তা হলো জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে অবশ্যই রপ্তানি বাড়াতে হবে। বর্তমান বিশ্বে রপ্তানিকে উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ বলে মনে করা হয়। তবে আমাদের মতো দেশের রপ্তানি বাড়াতে হলে অবশ্যই স্থানীয় কাঁচামাল-নির্ভর পণ্য রপ্তানির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। চামড়া শিল্প সম্পূর্ণরূপে স্থানীয় কাঁচামাল-নির্ভর এবং অন্য যে কোনো খাতের চেয়ে এ খাতের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এছাড়া বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের চামড়াজাত পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠছে। আর বাংলাদেশের চামড়ার মান যে খুবই ভালো সে কথা এখন সবাই বলছেন। ‘ফরাসিদের ফ্রেঞ্চ কাফে’র পর মানের দিক থেকে বাংলাদেশের চামড়াই বিশ্বের সেরা বলে মনে করেন চামড়া বিশেষজ্ঞরা। এ-রকম স্মুথ গ্রেইনের চামড়া বিশ্বের অন্য কোথাও মেলে না।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য এখনো স্বল্পসংখ্যক দেশ ও সীমিত পরিমাণ পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, জুট গুডস এই ৫টি পণ্য থেকে আসে মোট রপ্তানি আয়ের ৬৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। অন্যদিকে দেড় শতাদিক দেশে পণ্য রপ্তানি করা হলেও আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আসে ৮৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ রপ্তানি আয় এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। অন্য দেশগুলোতেও রপ্তানি বাড়াতে হবে। তার মানে আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা করতে হবে। মান উন্নয়নের পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগী হতে হবে।
কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ চামড়ার জুতা রপ্তানি করছে। বাংলাদেশে আগে জুতা তৈরি হলেও তা কেবল স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করত। এখন জুতা রপ্তানি করা হচ্ছে। আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে পাকা চামড়ার পাশাপাশি এখন ট্রাভেল ব্যাগ, বেল্ট, ওয়ালেট বা মানিব্যাগ ইত্যাদিও বিদেশে রপ্তানি হয়। এছাড়াও চামড়ার তৈরি নানা ফ্যান্সি বা বিলাসবহুল পণ্যেরও চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রচুর হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান আছে, যারা এসব পণ্য তৈরি করে বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে। কাঁচা চামড়া এবং চমড়াজাত দ্রব্যাদি, প্রধানত আধাপাকা ও পাকা চামড়া, চামড়ার তৈরি পোশাক, জুতা, স্যান্ডেল, জ্যাকেট, হাতমোজা, ব্যাগ, মানিব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্ট প্রভৃতি রপ্তানি করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে প্রতি বছর। অধিকাংশ চামড়া ও চামড়াজাত সামগ্রী রপ্তানি করা হয় জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ¯েপন, রাশিয়া, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানে।
বাংলাদেশে জুতা শিল্পের বিকাশের চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে শ্রম সস্তা ও উৎপাদন খরচ অন্য দেশের তুলনায় কম। উন্নত দেশগুলোতে জুতা তৈরির মোট খরচের ৪০-৪৫ শতাংশ ব্যয় হয় শ্রমিকের মজুরি বাবদ। আমাদের দেশে তা মাত্র ৫ শতাংশের মতো। জাপানে একজন জুতা শ্রমিকের প্রতি ঘণ্টায় মজুরি ২৩ দশমিক ৬৫ ডলার। বাংলাদেশে এ হার মাত্র ০ দশমিক ২৩ ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজোড়া চামড়ার জুতা তৈরি করতে খরচ হয় ৩২ ডলার, যা বাংলাদেশে ১৪ ডলার। একটু উদ্যোগী আর ব্যবসায়ীরা আন্তরিক হলেই এ সুযোগ কাজে লাগানো যাবে। অবশ্য এ সুযোগ অন্য শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রায় একই। উৎপাদন খরচ ও আউটপুটের হারের ব্যবধান অনেক বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জুতা প্রস্তুতকারী দেশ চীন এখন বিশ্ববাজার থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে গার্মেন্টসের মতো আমাদের দেশে এখন এ খাতের ব্যবসা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিপুল সম্ভাবনাও আছে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার। চীনে চামড়ার তৈরি জুতা শিল্পের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে বলে সে দেশের পত্রপত্রিকা মারফত জানা যাচ্ছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া বিশ্বের জুতার বাজারে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। মান বাড়িয়ে বাজার ধরতে হবে অন্যান্য দেশে। শিল্পবান্ধব অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।
সরকার এক্ষেত্রে আন্তরিক হলেও বেসরকারি উদ্যোগে আরও চিন্তাশীল হওয়া দরকার। ব্যক্তি-উদ্যোগ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ বাড়াতে হবে। শুধু ট্যানারি নয়, তাদের কেন্দ্র করে করে ছোট ছোট আরও অনেক অপরিকল্পিত কারখানা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। সেসব কারখানায় ট্যানারির কঠিন বর্জ্য, যেমন টুকরো-চামড়া, গরুর হাড়, চর্বি, দাঁত পুড়িয়ে পোল্ট্রি ফিডসহ আরও নানা জিনিস তৈরি করা হয়। এটা ক্রমান্বয়েই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এর পরিবেশগত খারাপ দিক আছে। এসব কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ করছে। এক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থায় ক্ষেত্রমতে আলাদা অঞ্চল তৈরি করা যেতে পারে।
চামড়া খাতকে শক্তিশালী করতে ট্যানারি কারখানার আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে, চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণের উৎপাদন বৃদ্ধি, সঠিক পদ্ধতিতে পশুর শরীর থেকে চামড়া ছাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ এবং পাচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক প্রচার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কোরবানির ঈদের সময় আমরা সিংহভাগ চামড়া পেয়ে থাকি। আর এসব চামড়ার মানও ভালো। তবে পরিবহন ব্যবস্থা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আরও সচেতন হতে হবে। আর এ সময়েই সিন্ডিকেট ও কারসাজি করে বিপুল সম্ভাবনার এ খাতকে অস্থির করতে চায় কেউ কেউ। এ সময়ে সরকার আরও কঠোর ভূমিকা পালন করলে ভালো হবে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিবেক জাগ্রত না হলে এই সম্ভাবনা অধরাই রয়ে যাবে।
লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক
