আফগানিস্তান কি শান্তির সুযোগ পাবে

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১০:৩১ পিএম

তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানে তাদের দ্রুতগতির সামরিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখলেও দেশটিতে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সুযোগ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। কাতারের রাজধানী দোহায় এ মাসের গোড়ার দিকে আফগান পক্ষগুলোর মধ্যে দুদিনের জ্যেষ্ঠপর্যায়ের আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো একটি যৌথ ঘোষণা এসেছিল। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে দুটি পক্ষ মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এমনকি, শুরু করার পর্যায়েও পৌঁছেছিল। এ কারণে দোহার বৈঠকটি হতাশারই জন্ম দিয়েছে। তবে তাদের যৌথ বিবৃতিটিকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি নীতিমালার রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সামনে এগোনো বলা যেতে পারে। ওই বিবৃতিতে একটি আলোচনাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ফয়সালার লক্ষ্য নির্ধারণ করার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষা, সাধারণ মানুষের প্রাণহানি রোধ ও মানবিক সহায়তায় সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ ছাড়া চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত জ্যেষ্ঠপর্যায়ে আলোচনায় যুক্ত থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে উভয় পক্ষই।

তবে আসল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা না হওয়াটা কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল ব্যবধানের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে। তারা সবচেয়ে বেশি দাবি করার জায়গায়ই থেকে গেছে। আপসেও আগ্রহ খুব কম। তালেবান দৃশ্যত তাদের বন্দিদের মুক্তি এবং বাহিনীর নেতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে প্রত্যাহারের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনার সঙ্গে শর্তযুক্ত করেছে। এগুলোই তাদের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের বিষয়। দোহার ওই বৈঠকে সরকার পক্ষের আলোচক প্রতিনিধিদের যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে তালেবান প্রত্যাখ্যান করে। তেমনি নাকচ করে দেয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব, যার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। পরে তালেবান মুখপাত্র এবং আলোচনাকারী দলের সদস্য সুহেল শাহীন বলেন, ‘আলোচনার মাধ্যমে নতুন সরকার’ গঠিত হলেই শুধু তারা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হবেন। সে প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির অপসারণ ছাড়া আর কী কী থাকবে সে সম্পর্কে তিনিও বিস্তারিত কিছু বলেননি। দোহায় খণ্ডিত আলোচনা নতুন করে এ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে, তালেবানরা যখন যুদ্ধের ময়দানে উত্তুঙ্গ অবস্থানে আর সরকারি প্রতিনিধিরা তাদের অবস্থানে অনড়, তখন শান্তি প্রক্রিয়া কি কোনো অর্থবহ অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে? তার ওপর প্রেসিডেন্ট গনিকে যখন তার নিজের সরকারের অভ্যন্তরেই ক্রমবর্ধমানভাবে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে? তালেবান এখন আরও অনেক শক্তিশালী অবস্থানে। তারা তাদের সামরিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ক্রমেই আরও বেশি অঞ্চল দখল করছে। তাই একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কেবল সময়ক্ষেপণের জন্যই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে কি না? পাকিস্তানে এ সম্পর্কে দুটি মতামত রয়েছে বলে মনে হয়। সম্ভবত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতামতও একইভাবে দ্বিধাবিভক্ত। প্রথম মতটি হলো দেশের পুরো নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত তালেবান গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় আগ্রহী নয়। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হাতে এলেই কেবল তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান থেকে তাদের নিজেদের স্থির করা শর্তের ভিত্তিতে আলোচনার প্রস্তাব দেবে। অন্য মতটি হলো, তালেবান সামরিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের ঝুঁকি সম্পর্কে ভালোই অবগত। তারা জানে এতে আন্তর্জাতিক বৈধতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দোহার চুক্তির পর অর্জিত স্বীকৃতি হারাবে। সুতরাং সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে আলোচনার মাধ্যমেই নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করা যায় কি না তালেবান তা চলমান আলোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খতিয়ে দেখতে চাইবে।

তালেবানের বিবৃতিগুলো খেয়াল করলে দ্বিতীয় মতটি বিশ্বাসযোগ্যই মনে হয়। তবে সামনের সপ্তাহগুলোতেই দোহায় এ মতের পরীক্ষা হয়ে যাবে। তবে ঈদের আগে দেওয়া বার্তায় তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা ঘোষণা করেছিলেন, সামরিক সাফল্য পাওয়া সত্ত্বেও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গেই রাজনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করছেন। অনুরূপভাবে একজন তালেবান মুখপাত্রও সম্প্রতি সিএনএনকে বলেন, ‘সামরিক কায়দায় দখলের’ বিষয়টি তাদের বিবেচনায় নেই। তালেবানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবারই এ মর্মে সতর্ক করেছে যে, তারা যেন সামরিক সমাধান না চাপিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক মহল এ জাতীয় সমাধানের বিরোধী। প্রতিবেশী পাকিস্তানের মতও তাই। যাই হোক না কেন, তালেবান দেশের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ না পাওয়া পর্যন্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দরজাটি সামান্য হলেও খোলা থাকবে। বস্তুত, আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনী তালেবান সামরিক হামলার মুখে ধসে না পড়া পর্যন্ত কূটনীতির সুযোগ রয়ে যাবে। তো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কীভাবে এই সুযোগটি নেওয়া উচিত? দোহার আলোচনাকে কীভাবে কৌশলের মারপ্যাঁচ থেকে বস্তুনিষ্ঠ ফলাফলের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে? স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সময় শেষ হয়ে গিয়ে পুরোদমে গৃহযুদ্ধ বেধে যাওয়ার আগেই উভয় পক্ষকে গুরুত্বসহকারে আলোচনায় বসার জন্য সমন্বিত চেষ্টা চালানো। এখন পর্যন্ত এই উদ্দেশ্যে যেসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলেছে তা হয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে। বিভিন্ন দেশ এই লক্ষ্যে পৃথক পৃথক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সম্প্রতি ইরান এবং তার আগে রাশিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলোচনা এবং ‘ট্রয়কা’ বা ‘ত্রিপক্ষীয়’ আলোচনা দলের সম্প্রসারণের কথা।

একটি জরুরি ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নিয়ে আফগানিস্তানের উভয় পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের সমঝোতায় পৌঁছাতে কিছু আপসে রাজি করানোর এখনই সময়। আর এর জন্য সর্বোত্তম মাধ্যম হবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত সম্প্রসারিত ‘ট্রয়কা’। ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ট্রয়কা তিনটি সভা করেছে, এর মধ্যে একটি ভার্চুয়াল। শেষ বৈঠকটি হয়েছে গত মে মাসে। তখন দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে এ কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয় যে, আফগানিস্তানের সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান নেই। শুধু আফগান নেতৃত্বে ও আফগান নিয়ন্ত্রণে একটি আলোচনাভিত্তিক রাজনৈতিক সমাধানই দেশটিতে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র একটি বৈঠক ডাকার পক্ষে বলে শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদের গত সপ্তাহের ইসলামাবাদ সফরের সময় জানানো হয়। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও আলোচনা করা দরকার। তবে তাদের উচিত সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে অংশ নেওয়া। সম্প্রসারিত ট্রয়কার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের অংশ হিসেবে ইরানকেও এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো উচিত। তবে, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিলে দৃশ্যত ইরান এতে আসতে অনিচ্ছুক। তাই প্রতিবেশী পাকিস্তানেরই উচিত এই ক্রান্তিকালে নেতৃত্ব দিয়ে বৈঠকটির আয়োজন করা ও ইরানকে আমন্ত্রণ জানানো। ইরানকে আনার জন্য প্রয়োজন হলে পাকিস্তান জাতিসংঘকে সহ-আয়োজক করার চেষ্টা করতে পারে। বৈঠকটি করা সম্ভব হলে এই সম্প্রসারিত ট্রয়কা ও ইরান মিলে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা জোরদার করতে আফগান পক্ষগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কূটনৈতিক সমাধানের বিকল্প হবে খুবই গোলমেলে এক অবস্থা। অনেক সাবেক যুদ্ধবাজ নেতা মিলিশিয়াদের সংগঠিত করছেন তালেবানকে ঠেকানোর জন্য। ওদিকে তালেবানও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এর ফলাফল হবে ব্যাপক সংঘাত যা দেশটিকে পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধের পথে ঠেলে দিতে পারে। আঞ্চলিক প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেউই এখন তা চাইবে না। দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহানো আফগান জনগণেরও তা প্রাপ্য নয়।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত। পাকিস্তানের দ্য ডন অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত