সারমেয় সমাচার

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২১, ১০:৩৬ পিএম

ঘটনাটা কোটালীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। অসুস্থ রোগী নিয়ে কোটালীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে গেলে দেখা যায় যে, জরুরি বিভাগের ডিউটি ডাক্তারের টেবিলের ওপর ক্লান্ত হয়ে এক সারমেয় বা কুকুর ঘুমাচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদক তাচ্ছিল্যভরে লিখেছেন, ‘চিকিৎসকের টেবিলের ওপর ঘুমিয়ে আছে এক নেড়ি কুকুর।’

সব ঠিক আছে, কর্তব্যরত ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে তার টেবিলে যে শুয়ে আছে সেই সারমেয়কে ‘নেড়ি কুকুর’ বলাতেই আমার আপত্তি। ওই প্রতিবেদক কি জানেন বিশ্ব চিকিৎসাবিজ্ঞানে, রকেট সায়েন্সে ও সাহিত্যে কুকুরের অবদান?

তা যদি জানতেন তাহলে এই সারমেয়কে তিনি ‘নেড়ি কুকুর’ বলতে পারতেন না। পাঠক মনে রাখবেন চিকিৎসা শাস্ত্রের পিতা বলতে বিশ্বে যার নাম সবাই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, তিনি হচ্ছেন খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ সালের সর্বজনশ্রদ্ধেয় মি. হিপোক্রিট। আজও প্রতিটি চিকিৎসক চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রবেশের আগে ‘হিপোক্রিট ওথ্’ বা ‘হিপোক্রিট শপথ’ পাঠ করেন, তারপর চিকিৎসক হন। এই মি. হিপোক্রিট আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে সারমেয় বা কুকুরের ওপর ব্যবচ্ছেদ করে করেই চিকিৎসাশাস্ত্রে পারদর্শী হন। সেই মানব দরদী সারমেয় যারা মানব চিকিৎসার জন্য ‘জাঁ-নেসার’ মানে জীবন উৎসর্গ করল, আজ আপনি তাকে ‘নেড়ি কুকুর’ বলে হেয় করছেন!! এই সাহস বা ঔদ্ধত্য আপনাকে কে দিল?

ওই প্রতিবেদক কি জানেন রাশিয়ার মনোবিজ্ঞানী ড. আইভান পাবলোভকে কন্ডিশনাল রিফ্লেক্স কারা শিখিয়েছিলেন? আপনার ভাষায় নেড়ি কুকুর, আর আমার ভাষায় শ্রদ্ধেয় বামপন্থি সারমেয়! যিনি বৈজ্ঞানিক ড. আইভান পাবলোভকে কন্ডিশনাল রিফ্লেক্সের তথ্য শিখিয়েছিলেন। এই নেড়ি কুকুর যদি  ড. পাবলোভকে সাহায্য না করত তাহলে আজও আমরা মনোবিজ্ঞানের একটি বিশেষ বিষয় থেকে বঞ্চিত থাকতাম!

ড. পাবলোভ ঐ সারমেয়র সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে, আমরা সবাই কুকুরের মতো আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে আবদ্ধ। আমরা ঘুম থেকে উঠেই পাবলোভস্ ডগের মতো ঘণ্টা শুনলেই দৌড় মারি। কোনো প্রকার চিন্তা ছাড়া বাছবিচার ছাড়াই মার দৌড় ভোঁ-দৌড়। আর কালক্রমে এই কন্ডিশনাল রিফ্লেক্স এমনই তীব্র আকার ধারণ করে যে, কেউ যদি বলে ভাই, তুমি পাবলোভের কুকুরের মতো ঘণ্টা শুনলেই কন্ডিশনাল রিফ্লেক্সের তাড়নায় না দৌড়ে, একটু ভেবে ধীরে ধীরে যাও। দৌড়ালে তো পড়েও যেতে পারো, ব্যথাও পেতে পারো? ব্যস, যেই এই কথা বলা হলো, অমনি কন্ডিশনাল রিফ্লেক্সের তাড়নায় তাকে ধরে দেওয়া হলো মার। এটা কি ‘মানুষের কাজ’ হলো?

তারপর আমরা দেখি আমেরিকার সর্বাধিক পারিশ্রমিক পাওয়া লেখক জ্যাক লন্ডনকে। তাকে লেখক বানিয়েছে কে? ওই আপনার ভাষায় নেড়ি কুকুর বা ‘হোয়াইট ফ্যাং’। এই হোয়াইট ফ্যাং উপন্যাস লিখেই তিনি জ্যাক লন্ডন হলেন, বিশ্বসেরা লেখক হলেন। ফলে অযথাই সারমেয়দের ছোট করা যাবে না। নেড়ি কুকুর বলা যাবে না।

এদিকে ‘রবিনসন ক্রুশো’র, কুকুরটি জাহজডুবির পর রবিনসনকে বাঁচিয়েছিল। ফলে জন্ম নিল বিশ্বসাহিত্যের অমর সৃষ্টি ‘রবিনসন ক্রুশো’র। আর বাংলার এক সাংবাদিক সারমেয়কে নেড়ি কুকুর বলে তাচ্ছিল্য করছেন!

রকেট সায়েন্সের কথায় আসা যাক। মহাশূন্যে রকেট প্রেরণ। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম তার ‘উইংস অব ফায়ার’ বইটিতে রকেট সায়েন্স নিয়ে বহু কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন না যে, ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর, স্পুৎনিক নামে বিশ্বের প্রথম যে মহাশূন্যযানটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল সেটা পরিচালনা করেছিল কে? ‘লাইকা’ নামের এক মহীয়সী নারী সারমেয়! বুঝলেন বিশ্বের রকেট সায়েন্সে প্রথম অবদান আপনার ভাষায় এক নেড়ি কুকুরের। যার নাম লাইকা। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি বিশ্বের এক মহান উৎসর্গিত প্রাণ, সারমেয় এম এস লাইকা। যাকে আপনারা পুড়িয়ে মারলেন। কারণ উৎকোচ গ্রহণকারী প্রকৌশলীরা সঠিক রূপে কুলিং চেম্বার তৈরি করেনি। ফলে আমাদের শ্রদ্ধেয়া সারমেয় এম এস লাইকা পুড়ে মারা যান। তাই কুকুরকে নেড়ি কুকুর বলবেন না, শ্রদ্ধা করতে শিখুন।

জানেন তো ‘জীবে দয়া করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’।

মহাভারতে, একলব্য দ্রোণাচার্যর নিদ্রার যাতে ডিস্টার্ব না হয় তাই সারমেয়র মুখ বন্ধ করার জন্য বাণ মেরেছিল। সেই পাপে অর্জুন ও দ্রোণাচার্য একলব্যের বুড়ো আঙুল কেটে তার জীবন ধ্বংস করল। আর মহাপ্রস্থানের পথে, ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির যখন স্বর্গের পথে রওনা হলো, তখন পথিমধ্যে একে একে দ্রৌপদী, নকুল-সহদেব, অর্জুন, ভীম সব মারা গেল। তখন যুধিষ্ঠিরের একমাত্র সাথী ছিল একজন সারমেয়, আপনার ভাষায় নেড়ি কুকুর। সবাই মারা গেলেও এই সারমেয় যুধিষ্ঠিরকে ত্যাগ করেননি। বরং তিনি নিজে কোলে করে জুজুকে মানে যুধিষ্ঠিরকে স্বর্গে নিয়ে যান। মনে রাখবেন মহাভারতে একমাত্র যুধিষ্ঠির ও সেই সারমেয়টি জীবন্ত অবস্থায় স্বর্গে প্রবেশ করেন।

চিন্তা করুন যেখানে কোটালীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে বেতন দিয়েও কর্তব্য সম্পাদনের জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না! সেখানে এক মহান সারমেয় জরুরি বিভাগে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন করছেন! আর আপনি কিনা তাকেই হেয় করলেন!

বাঙালির চৌদ্দগুষ্টির ভাগ্য যে, স্বয়ং ধর্মরূপী সারমেয় আপনাদের জরুরি বিভাগে ডিউটি করছে। আশা করি আপনি আপনার ভুল বুঝতে পেরেছেন। নেড়ি কুকুর বলার জন্য পুরো সারমেয় জাতির কাছে আপনি নিঃশর্ত ক্ষমা চাইবেন।

লেখক : চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত