তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আমার সাহিত্য-জীবন’ অশ্রু ও বারুদে ঠাসা। নামেই বইটির পরিচয়, এ প্রসঙ্গে বিস্তারে যাওয়া অপ্রয়োজনীয়, বরং তার অশ্রু আর বারুদ নিয়ে কয়েকটি কথা তোলা যেতে পারে। সব আত্মস্মৃতিতে কিছু অশ্রু থাকেই, সফলতমদের আত্মকথায় খানিক আত্মপ্রসাদও থাকে, এমনকি একদিন কাঁটাবিছানো যে সিঁড়ি তিনি মাড়িয়ে এসেছেন তা নিয়ে থাকে প্রচুর গর্ব আর উচ্ছ্বাস। বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্করের মতন ঔপন্যাসিকের সাহিত্যিক আত্মস্মৃতিতে সে উচ্ছ্বাস এবং তার কর্মবীরপনা কোথাও কোথাও থাকলে তা নিয়ে অবাক হওয়ারও কিছু থাকত না। কিন্তু এই লোকটি তো সজনীকান্তের ভাষায়, ‘বাংলা সাহিত্যে অনেক কথা এ-যুগের লেখকদের সকলের চেয়ে বেশি কথা বলতে এসেছে। এঁর পুুঁজি অনেক। এনেছে অনেক।’ নিয়ে হাজির; যখন সজনীকান্ত তারাশঙ্কর প্রসঙ্গে বলছেন একথা, তখনো তিনি দিশাহীন, কিন্তু কোথাও কারও প্রতি অনুযোগ নেই, নিজের কাজের ক্ষেত্রে পায়ের তলায় একটুখানি মাটি হাতড়ে দাঁড়ানোই তার একমাত্র লক্ষ্য। ফলে, কারও প্রতি অনুযোগী হওয়ার চেয়ে নিজের কাছে ‘বীরের সদ্গতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই’ তার তখনকার একমাত্র ব্রত।
সাহিত্যিক জীবনের সেই সূচনায়, কন্যাবিয়োগের শোক, ক্ষয়িষ্ণু জমিদারবাড়ির সন্তান হয়েও অর্থকষ্ট, নাট্যকার হিসেবে টিকতে না-পারা, কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁইহীন, সংগতিও নেই, আর একইসঙ্গে তিনি যেভাবে লিখতে পারেন, যা লিখতেন সে বিষয়ে সাহিত্যিকসমাজের অমনোযোগিতা সবই তার ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময়ের একটি নিব-বসানো কলমের আগায় নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ। তখন পান্ডব-কৌরব তার দেখার সময় কোথায়? ‘প্রতিটি গল্পই অন্তত দু-বার করে লিখেছি, প্রয়োজন হলে তিনবার চারবারও লিখেছি। শুধু যে রচনা উন্নত করবার জন্যই লিখেছি তা নয়, কোনো পান্ডুলিপিতে হাতের লেখা খারাপ হলে বদলেছি, কাটাকুটি হলেও বদলেছি।’ আর হিসাব করছেন, কলকাতায় থাকতে যদি তিরিশ টাকার মতন লাগে, মাসে তিনটে চারটে গল্প লিখেও সে আয় কোনোভাবেই সম্ভব নয়, আয় হলেও মাসের শেষ সপ্তাহে টানাটানি থেকে যায়, তখন বীরভূমের ট্রেন ধরে বাড়ি চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি থাকে না। দুবার প্রস্তাব এসেছে বোম্বে টকিজে কাহিনী লেখার, বেতন ভালো। যাননি। বিহারের দিকে এক জোড়া ছাত্রকে বাংলা পড়িয়ে কোনো একমাসে যে একশো টাকা পান, তাই দিয়ে কিনেছিলেন জীবনের প্রথম ফাউনটেন পেন। প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকজীবনে তারাশঙ্কর প্রতি বছর একটি ফাউনটেন পেন কিনতেন, কিন্তু সেই প্রথম ফাউনটেন পেনটাকে তিনি সারা জীবন সংরক্ষণ করেছেন। কী হতো না-করলে, তুচ্ছতম উপাদান এবং নিজের কষ্টের অতীতকেও তারাশঙ্কর প্রতিষ্ঠা দিয়ে মোড়ানো দিনগুলোতে কোনোভাবেই ভুলতে চাননি। এমন অতি ক্ষুদ্র প্রসঙ্গ ছাড়াও এই বইয়ে সেই শুরুর দিনগুলোর অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। কোথাও কোথাও নিজেকে সংবরণও করতে পারেননি অথবা করতে চাননি। পুনরাবৃত্তিও আছে।
শুধু নেই, বাংলা ভাষার খ্যাতিমান ও শক্তিশালী ঔপন্যাসিকের আসন লাভের পরেও কোনো উচ্ছ্বাস। হয়তো সেই উচ্ছ্বাসকেও ঢেকে দিতে চেয়েছেন, ‘শরৎচন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠাবান হয়ে উঠব এমন কল্পনাও কোনো দিন মনে উঁকি মারেনি।’ এমন বাক্য লিখে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রবীণ তারাশঙ্করকে নিজেদের লেখাপত্রের কিছু নমুনা দিতে গিয়েছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সে সময়ে তাদের পকেটবুকের প্রতিটির একাধিক কপি দিলে তিনি বাড়িতে জায়গার অভাব তাই প্রত্যেকটির একটি-একটি দিতে বলছেন। ওদিকে সন্দীপন তারসহ বন্ধুরা বাংলা ছোটগল্পে নতুন কী কোনো স্বরের ধারক, সে কথা বলতে গেলে তারাশঙ্কর বলছেন, ‘নিজের লেখা নিয়ে নিজে কিছু বোলো না, যা বলার অন্যরা বলবে!’ সন্দীপন অবিস্মরণীয় বর্ণনায় লিখেছেন, তিনি দেখলেন সেই মুহূর্তে বসা তারাশঙ্কর সন্দীপনের দীর্ঘ দেহের সামনে এতটাই দীর্ঘ হয়ে গেলেন যে তিনি চোখ উঁচুতে তুলেও যেন তারাশঙ্করকে দেখতে পাচ্ছিলেন না, তখন এতটাই মহীরুহ তিনি। শুরু থেকে সংগ্রামী তারাশঙ্কর তার আত্মমযার্দার শিক্ষায় ওটা শিখতে পেরেছিলেন বলে তরুণ সন্দীপনকে ওভাবে বলতে পেরেছিলেন।
‘আমার সাহিত্য জীবন’ তারাশঙ্করের সাহিত্যিক সংগ্রামে নিরন্তর জেদের নিজস্ব কাহনও। সংগ্রাম মানেই সেখানে বিয়োগ ও বারুদ এই দুটো যে কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্রে অনিবার্য। আর, হয়তো সেই লড়াইয়ের বন্ধুর পথ চলতে হতো না যদি তারাশঙ্কর শুরুতেই প্রতিষ্ঠা ও আনুকূল্য পেতেন। সাহিত্যের ইতিহাসে এই ঘটনা সব কালেই চলমান। কেউ কেউ লিখতে এসেই বিপুল সংবর্ধিত ও সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা (অর্থনৈতিক নয়) পেয়ে যান, কখনো তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয় না। যেমন : বিভূতিভূষণ, কাজী নজরুল, সৈয়দ মুজতবা, সতীনাথ, মানিক, ওয়ালীউল্লাহ, রমাপদ চৌধুরী, শামসুর রাহমান, মাহমুদুল হক, দেবেশ রায়, হ হুমায়ূন আহমেদসহ অনেকে। একেবারে শুরু থেকেই তারা ময়দানের মাঝখানে, সাইডলাইন বলে তাদের কিছু নেই। আর উলটো দিকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ; আর তারাশঙ্কর, জীবনানন্দ, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহিরসহ অনেকেই। (জীবনানন্দ আরও ব্যতিক্রম, কোনো ‘সফলতা’ই তিনি দেখেননি।) অনেক দিন লিখবার পরে সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা হয়, কারও হয় না। সেই যাত্রাপথই তারাশঙ্করের প্রকৃত সংগ্রাম। সাতাশ-আটাশ বছর বয়সে রাজনীতিকে ইস্তফা জানিয়ে তিনি সাহিত্য করতে শুরু করলেও কিন্তু সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ বছর বয়সের আগে তারাশঙ্করের পরিচয়বাহী উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো লিখে উঠতে পারেননি। তবে রাজনীতি ও দেশসেবার কাজে বাংলার রাঢ় অঞ্চল পায়ের তলায় উলটেপালটে নেওয়ায় তিনি স্বদেশকে এমনভাবে চিনেছিলেন যে সাহিত্যিক হিসেবে কথাসাহিত্যের প্রয়োজনীয় কৌশলগুলো ওই জীবন থেকেই তার হাতে ধরা দিয়েছে। তার সমকালীন আরও অনেকের মতো কাহিনীর আকর্ষণীয় আরক আর ভাষার কৌশল দিয়ে তিনি সেই জীবনকে ধরতে চাননি। তার ক্ষেত্রে উলটোটাই ঘটেছে। তিনি জীবন-অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যের পৃষ্ঠায় নিয়ে এসেছেন। ফলে অমন দগদগে বাস্তব কলকাতার তৎকালীন সাহিত্যিকজীবনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুপস্থিতই ছিল। বিভূতিভূষণ আর মানিককে বাদ রাখলে, এই বিষয়টা খুবই বোঝা যায়। তারাশঙ্কর নিজেও তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, ‘বাংলা দেশে এই পাঠকদের সঙ্গে লেখকদের মধ্যে একটা দুস্তর ব্যবধান রচিত হয়েছে ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে। আমাদের লেখকরা ইংরেজিতে ভেবেছেন, তারপর বাংলায় তরজমা করেছেন। এবং আমরা যখন লিখেছি তখন ইংরেজি জানা শিক্ষিত জনসাধারণের কথা ভেবেছি। এ-দেশের মাটির সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকে একাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের চিন্তাধারা যেভাবে যে-ভঙ্গিতে মাটির বুক চিরে বয়ে এসেছে, সেই ধারা বা ভঙ্গিতে ভাবিনি। ইংরেজি বা ইউরোপীয় সংস্কৃতির স্রোতধারা থেকে ড্যাম বেঁধে, সোজা লাইন টেনে ক্যানেল কেটে সেই জল ঢেলে দিতে চেয়েছি এদেশের মাটির ওপর। সমতল শহরের বুকে সে-জলের ধারা এসেছে, কিন্তু অসমতল ভূ-প্রকৃতি পল্লীবাংলার মধ্যে তাকে নিয়ে যেতে পারিনি। প্রয়োজনও মনে করিনি।’ মোটা দাগে এই স্বদেশসন্ধান তারাশঙ্করের সাহিত্যিকজীবনের ধ্রুব। হয়তো, সেই জন্যই তার পক্ষে কবি থেকে গণদেবতা-পঞ্চগ্রাম, হাঁসুলি বাঁক থেকে আরোগ্য নিকেতন হয়ে অরণ্যবহ্নিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। উপন্যাসশিল্পের দিক থেকে একেবারেই অনায়াসে, সেখানে অভিজ্ঞতার বাইরে যেন আর কোনো বোঝাবুঝি নেই। (যদিও এরপরে, শেষ পর্বে তারাশঙ্কর অনেকটাই নিজেরই ছায়া)।
তারাশঙ্কর ওই ভাবনার সূত্র হয়তো রবীন্দ্রনাথের কাছে পেয়েছিলেন। তার ‘ডাইনি বাঁশি’ গল্পটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ ভালো লাগার কথা জানিয়েছিলেন। সঙ্গে এও বলেছিলেন, ‘কলকাতার একজন পন্ডিত সাহিত্যিক এই গল্পটির কথা শুনে কী বললেন জান? [...] তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন শুনে। বললেন উইচক্র্যাফট নিয়ে বাংলায় গল্প। এ নিশ্চয় ইউরোপের গল্প। ওদের দেশের গল্প পড়ে লিখেছে।’ তারাশঙ্কর বলেছিলেন, ‘স্বর্ণডাইনি যে আমাদের পাড়ায় থাকে। এখনো আছে। আমাদেরই কাছারি বাড়ির সামনের পুকুরের ঈষাণ কোণে তার বাড়ি।’ রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমি জানি, আমি বুঝতে পারি। তোমাকে আমি বুঝেছি। দেখবার আগেই বুঝেছি। ও কথাটা তোমাকে বললাম কেন জান? বললাম আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের দেশের সঙ্গে পরিচয় কত সংকীর্ণ তাই বোঝাবার জন্য। ডাইনি মানে ওঁদের কাছে উইচক্র্যাফট হলেই সে ইউরোপ ছাড়া এ-দেশে কী করে হবে। আমাদের দেশের ডাইনি এঁরা দেখেননি, জানেন না, বিশ্বাস করেন না। আমি তাই তাঁদের বললুম, বললুম উঁহুঃ উহুঁ! এ তারাশঙ্করের চোখে দেখা।’
এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তারাশঙ্করকে বলেছিলেন, ‘[...] আমি যখন বাংলাদেশের গাঁয়ের ঘাটের কথা লিখি তখন বাংলা সাহিত্যে রাজপুতানার রাজত্ব চলছে।’ এই কথায় রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্র থেকে তার অগ্রজা স্বর্ণকুমারী দেবী পর্যন্ত সবাইকে একেবারে সাহিত্যের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। তারাশঙ্কর হয়তো সেখান থেকে বাংলা দেশের গাঁয়ের ঘাটের কথা লিখবার অকুতোভয় দুঃসাহস পেয়েছিলেন তার পরাক্রমী ‘আধুনিক’ সমাকালীনতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। তাই হয়তো আত্মপ্রতিষ্ঠার গদ্য-আখ্যান যোদ্ধার জেদে ও আগুনে ভরে গেছে তার অজানিতেই।
লেখক কথাসাহিত্যিক