সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৮ পিএম

এক. আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে নোয়াখালীর মাইজদীতে। মাস্টারপাড়ায় আমার বড় হওয়া। আমাদের সেই পাড়ায় থাকত পাভেল, তার বোন স্বাতীদি। তাদের মা আমাদের মাসি। পাভেল আমার সঙ্গে পড়ত। ওর বাবা মানে আমাদের মেসো ছিলেন বাম-প্রগতিশীল চেতনার মানুষ। মাত্র তখন তার কাছে মার্কস, লেনিনের কথা শুনছি। হঠাৎ করে তিনি প্রয়াত হলেন। মাসি একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। সারা দিন পাভেল, স্বাতীদির সঙ্গে কাটত। ভাই-বোনের মতো। একসঙ্গে আমরা বড় হয়েছি। একসঙ্গে আমরা খেলেছি। একসঙ্গে গানও গেয়েছি। খেলাঘর করেছি। জীবনে প্রথম আমি একটি গান লিখেছি, সেই গানটি সুর করেছিলেন স্বাতীদি।

অন্য বন্ধুরা বলত বলে পাভেলকে ‘ড্যাডা’ বলতাম। নোয়াখালী অঞ্চলে হিন্দুদের ‘ড্যাডা’ বলে। কেন বলে জানতাম না। পরে জেনেছি এটি একটি গালি। এক দিন পাভেলকে দেখলাম কেন যেন সে দৌড়াচ্ছে। তার চোখে-মুখে ভয়। মাসিও আর সেদিন অফিসে যাননি। তাদের সবাইকে আম্মু আমাদের বাসায় নিয়ে এলো। তখন বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে সারা দেশে হইচই হয়েছে। কিন্তু আমাদের ওখানে মানুষে-মানুষে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি থাকার ফলে কিছু হয়নি।

দুই. আমাদের আশপাশে যারা প্রতিবেশী ছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন ধর্মের দিক দিয়ে হিন্দু, কিন্তু আঁতুড়ঘরের এ মানুষগুলো চিরকালই আমার প্রণম্য মানুষ; তারাই আমারই মাসি, আমারই মামা, আমারই ঠাকুমা, আমারই দিদি, আমরা খেলতাম আমাদের এই মামা, মাসিদের সঙ্গে, দিদিদের সঙ্গে; তারা তাদের বাচ্চাদের যেভাবে আগলে রাখতেন, ঠিক একইভাবে আমাদেরও আগলে রাখতেন। আদর করতেন, ভুল করলে আদর করেই বকা দিতেন, স্কুলে যাওয়ার আগে আমাদের সময় কাটত তাদের বাসায়; স্কুল থেকে এসে খেলতাম তাদের বাসায়। দুপুর বেলায় গোল হয়ে ভিসিআরে সিনেমা দেখতাম, এর মধ্যে খাওয়ার সময় হলে খাওয়া-দাওয়া করে নিতাম তাদের বাসায়, শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলতাম সন্ধ্যায় তাদের বাসায়।

পূজায় আমাদের জন্য সন্দেশ তোলা থাকত। আমাদের বাসায় ভাড়া থাকতেন চন্দন নামে একজন ভদ্রলোক। আমরা তাকে মামা বলতাম। যখন বাজি-পটকা কিনতেন, মামা আমাদের জন্যও কিনতেন। কত রকমের বাজি! পুজোর সময় আমরা সেগুলো ফুটাতাম। পাড়া দাপিয়ে বেড়িয়েছি। লক্ষ্মীপূজা অথবা সরস্বতী পূজায় এ বাড়ি, ও বাড়ি ঘুরতাম। আর পূজাম-পগুলোর আশপাশেই থাকতাম। চেয়ে থাকতাম মুগ্ধ চোখে প্রতিমার রূপ, দুর্গা মায়ের ঐশ্বর্য। কীর্তন, শ্যামাসংগীত শুনতাম। প্রাণ ছুঁয়ে যেত। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ দল আসত পাড়ায়, রং-বেরঙের পোশাকে তারা নাচ-গান করত, অভিনয়ের কসরত দেখাত। মনের ভেতরে বাংলা সংস্কৃতির শেকড় সংহত হতো।

তিন. ঈদ উপলক্ষে চাঁদ রাতে পাড়ায় কনসার্ট হতো। সেখানে এই মামারা কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে আয়োজন করত। ঈদের সময় সব বাচ্চা একসঙ্গে দল বেঁধে বাসায় এসে সেমাই, জর্দা খেয়ে যেত। ছোটবেলায় আমার মা-বাবাকে চিন্তা করা লাগেনি আমাদের নিয়ে, কারণ জানতেন, আমাদের এই মামা-মাসিরাই দেখে রাখবেন। কখনো কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তো নাই! রাস্তায় হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গে গল্প করতে করতে বাজার করতে গিয়েছেন। আমাদের কাছে আলাদা কেউ ছিল না। ছিল সবসময়কার আত্মীয়। ধর্মের কোনো ঘেরাটোপ কখনো আমাদের মধ্যে ছিল না।

চার. ধর্মীয় আয়োজন এখন আর নিছক ধর্মে নির্দিষ্ট নয়। এর প্রকাশ আর ভঙ্গি বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের সমষ্টিগত উৎসবের আকৃতি। এ কথা সত্য, বাঙালিরা চিরায়তভাবে উৎসবে আচ্ছন্ন। ধর্মীয় উৎসব ব্যক্তির জীবনাচারণে যতটা আনন্দের, তার চেয়ে সামাজিক বন্ধন প্রভাবিত করে চলে অনেক বেশি। এখানে কোনো ভেদাভেদ-বৈষম্য ছুঁয়ে যায় না। হিন্দুদের পূজা কিংবা মুসলমানদের ঈদ, তাতে সবাইকে অংশগ্রহণ করতে দেখেছি। আমি নিজেও অনেক সময় পূজার সময় চাঁদা তুলেছি। কে হিন্দু, কে মুসলমান, তার কোনো প্রশ্ন ছিল না। আজ বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, ওই যে পূজা দর্শন, দুর্গা দর্শন, বিসর্জনের কোনো আয়োজন বা অংশে পুলিশ বা আনসারকেও দেখা যেত না। ভাঙচুর জাতীয় কোনো ঘটনাও ঘটত না। এখন ঈদের জামাতেও ব্যাপক পুলিশের ব্যবস্থা নিতে হয়, যা আগে ছিল না।

পাঁচ. ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর, হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে নির্বিচারে আক্রমণ করা হলো, দক্ষিণ সমতট অঞ্চলের ২০০ বছরের আগেকার এক কিংবদন্তি আখ্যান, ‘কমলাসুন্দরীর গল্প’ গড়ে ওঠা নোয়াখালীর রাজগঞ্জকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হলো, সেই যে চলল মন্দির ভাঙার মহোৎসব, তা এখনো চলছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে হত্যার উৎসব।

১৯৪৬ সালে নোয়াখালী চলে এসেছিল সর্বভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। দাঙ্গা-বিধ্বস্ত নোয়াখালীতে এসে শান্তি ও মৈত্রী স্থাপনার্থে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, ‘নোয়াখালীর মাটিতে ভারতের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।’ এককালের শিল্পের প্রাণময় বিকাশে সেই অঞ্চলের মানুষগুলো আজ কেমন আছে? যারা লালসালুর মজিদের নোয়াখালী বলে বিদ্রƒপ করেন, এটাও এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ, তাদের জানার জন্য বলা যেতে পারে, কালের পরিক্রমার নানা পর্বে এ অঞ্চলের প্রগতিশীল আন্দোলনের ইতিহাসও ঐতিহ্যময়। এ জেলার মানুষ অনুশীলন সমিতি, গুপ্ত সমিতি, যুগান্তর পার্টি করেছে, তারা অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য ও লবণ সত্যাগ্রহসহ বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকা-ে অগ্রসর ছিলেন। বহু হিন্দু, বহু মুসলমান কারাগারে গেল। বরিশাল, ফরিদপুরের বিপ্লবীদের সঙ্গে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের যোগাযোগের একমাত্র ঘাঁটি ছিল নোয়াখালী।

ছয়. ম্যালা বছর পর, সবার সঙ্গে যা একটু যোগাযোগ, তা এখন সামাজিক গণমাধ্যমে। যখন মেসেঞ্জারে মাসি বা মামা বলে একটা ছোট মেসেজ দিয়ে বসি, তারা যেন ঠিক সেই ছোটবেলার মামা হয়ে যান, আঙুল ধরে হাঁটা সেই মাসি হয়ে যান। স্নেহসুলভ বকা দিয়ে বলেন, ‘বেঁচে থাকতে একবার এসে দেখে যা!’ ঠিক এ মুহূর্তে নোয়াখালীর অবস্থা ভালো না, আমি জানি না আমার খোকা মামা, বিক্রম মামা, সঞ্জয় মামা বা শম্পা মাসি, মিঠু মাসি, অপু মামা, ইলা মাসি বা পাভেল, মিতুরাসহ অন্যরা ভালো আছেন কি না, আমার সাহসও নেই এই খোঁজ নেওয়ার, এ রকম দম বন্ধ করা অবস্থা এর আগে কখনো দেখি নাই! কলকাতা থেকে সঞ্জয় দাস আমাকে বলে, ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, বাবা-মায়ের দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত খুব সঠিক।’ এটা আমার জন্য লজ্জার ও গ্লানির। একসময় শুনতাম, ‘মসজিদ ভাঙা, মন্দির ভাঙা আর মন ভাঙা একই কথা’। আজ আমাদের মনটা সত্যি ভেঙে গেছে।

সাত. আজ আমার বুকে কাঁপন তৈরি হয়, আর ভাবি, কতভাবেই না আমরা মাথার ভেতর ঘৃণার চাষ করি, সাম্প্রদায়িকতার ছুরি ঘোরাই। অথচ মননে আমরা বলতে চাই হিন্দু বুঝি না, মুসলমান বুঝি না, আমরা বুঝি মানুষ। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই’ এ আপ্তবাক্যের অনুশীলন কি আমরা করতে পারব না? মনে রাখতে হবে কেবল ধর্ম-বর্ণ দিয়ে মানুষ হয় না। মানুষ হয়েই মানুষ হতে হয়।

লেখক সহকারী সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত